দেশে মৃত্যুর শীর্ষ কারণ হৃদরোগ!

heart-disease-750.jpg

কক্সবাজার ডেস্ক ॥

বেসরকারি একটি বিজ্ঞাপনি সংস্থায় চাকুরি করতেন নিমাই চন্দ্র দাস। গেল ডিসেম্বরে বুকে ব্যাথা অনুভব করলে তখনই হাসপাতালে যান। চিকিৎসক তাকে কিছু ওষুধ এবং কয়েকটি পরীক্ষা  দিয়ে পরের দিন রির্পোটসহ আবার যেতে বলেন। কিন্তু সেই রাতেই ঘুমানোর জন্য মশারি খাটাতে গিয়ে পড়ে যান ৩২ বছরের নিমাই। সঙ্গে সঙ্গে বেসরকারি একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসকরা তার মৃত্যুর কারণ হিসেবে হৃদরোগের কথা উল্লেখ করেন।

গেল ৯ মার্চ দুপুরে বুকে ব্যথা অনুভব করেন সাংবাদিক ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা একেএম ফয়সাল রহমান কিশোর। সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ফয়সালের বয়স ছিল ৩৩ বছর।

হৃদরোগীর হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলার বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বলা যায় রাজধানীর আগারগাঁয়ের জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে গিয়ে। প্রতিদিন রোগী বাড়ছে, হাসপাতালটির কোথাও তিল ধারণের জায়গা নেই। কেবিন, ওয়ার্ড ছাড়িয়ে রোগীদের ঠাঁই হয়েছে হাসপাতালের মেঝেতে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, এই হাসপাতারের তিনটি ভবনের কেবিন, ওয়ার্ড মিলিয়ে বেডের সংখ্যা ৪৩৪টি। কিন্তু হাসপাতালে প্রতিদিন ভর্তি থাকেন প্রায় ৯০০ থেকে ১ হাজার রোগী।

সংশ্লিষ্টরা জানালেন, হৃদরোগীর সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে তেমনি বেড়ে চলেছে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর হার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে বর্তমানে শতকরা প্রায় ৫৩ ভাগ মৃত্যুর কারণ অসংক্রামক রোগ। আর যার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে হৃদরোগ। বাংলাদেশে শতকরা ২৭ ভাগ মৃত্যুর কারণ হৃদরোগ। যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, আইসিডিডিআরবি ও জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউট পরিচালিত ব্রেভ স্টাডি (বাংলাদেশ রিস্ক অব একিউট ভাসকুলার ইভেন্টস) নামের এক জরিপ থেকে জানা যায়, দক্ষিণ এশিয়াতে ২০১০ সাল নাগাদ হৃদরোগের আক্রমণ বাড়বে ১০০ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে বাংলাদেশে হৃদরোগের প্রকোপ বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। বিশ্বে বর্তমানে প্রতিবছর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে এক কোটি ৭৩ লাখ মানুষ। যার মধ্যে অপরিণত বয়স এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মারা যাচ্ছে শতকরা ৮০ শতাংশ।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের ২০১৭ সালের হেলথ বুলেটিনে উঠে এসেছে, ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে পরের বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের সরকারি হাসপাতালের ভর্তি হওয়া রোগীর মৃত্যু নিয়ে বিশ্লেষণ । এতে বলা হয়েছে, দেশের ৫১৪টি সরকারি হাসপাতালের মধ্যে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে ৩৭ দশমিক ৭৩, জেলা হাসপাতালে ৩৩ দশমিক ৫৮ ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ৩৩ দশমিক শূণ্য তিন শতাংশ রোগীর মৃত্যুর কারণ হৃদরোগ।

এদিকে, ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে ৫ বছরের বেশি রোগীদের মধ্যে হৃদরোগ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর হার ৩৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এই জরিপ অনুযায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগে ৭ দশমিক ৯ শতাংশ, মস্তিস্কের রক্তনালির রোগে ৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ, সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে ৫ দশমিক ২৭ শতাংশ, বিষক্রিয়ায় ২ দশমিক ৭৪ শতাংশ, গর্ভধারণ ও এ সংক্রান্ত জটিলতায় ১ দশমিক ২ শতাংশ, দুর্ঘটনাজনিত আঘাতে ১ দশমিক ১৩ শতাংশ রোগীর মৃত্যু হয়।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী  সারাবাংলাাকে জানান, উচ্চ রক্তচাপ, কায়িক পরিশ্রম না করা, ধুমপান, অতিরিক্ত ওজন, সুষম খাদ্যের অভাব, অধিক কোলেস্টরেল হৃদরোগের অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে এসব রোগীদের মধ্যে শতকরা ৬০ ভাগ মৃত্যুর কারণ হলো হৃদরোগ।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেন, সামান্য কিছু অভ্যাস যদি পরিবর্তন করতে পারা যায়, তাহলে হৃদরোগ, স্ট্রোকের মত বিষয়গুলো থেকে দূরে থাকা সম্ভব।

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা, ধুমপান বন্ধ করা, ব্লাড সুগার, ওজন, খাদ্যাভাস পরিবর্তন, শাক সবজি এবং কাঁচা ফলমূল খাওয়া হৃদরোগীদের জন্য অবশ্য কর্তব্য। সতর্ক হলে কিন্তু এসব থেকে দূরে থাকা সম্ভব, কেবল হৃদরোগ নয়, অনেক বড় বড় রোগের সম্ভাবনা অনেক কমে যায় এসব পরিবর্তনে।

দেশে বর্তমানে হৃদরোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, খুব বেশি খাদ্যাভাসে পরিবর্তন এসেছে।  প্রসেস ফুডের প্রতি আকর্ষণ বেড়েছে এবং মানুষের হাঁটাচলা কমে গেছে। আর যে কোনও প্রসেস ফুডে লবনের পরিমান বেশি।

হৃদরোগকে ‘ফার্স্ট কিলার ডিজিজ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন প্রিভেনটিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী। তিনি বলেন, বাংলাদেশসহ পৃথিবী জুড়েই এখন হৃদরোগের কারণে মৃত্যুর হার সর্বোচ্চ। রক্তে চর্বি বা কোলেস্টোরেল এর আধিক্য, ‍দুশ্চিন্তা বা মানষিক চাপ, নিয়ন্ত্রণহীন উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কায়িক পরিশ্রম না করা হৃদরোগের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত।

যদি বাঁচতে হয় তাহলে নিয়মিত কায়িক শ্রম হয়-এমন কাজ করতে হবে। খাবার তালিকার বাইরে রাখতে হবে প্রক্রিয়াজাত খাবার, প্রাণীজ আমিষ এবং লবণ। একইসঙ্গে জীবনকে ইতিবাচক হিসেবে নিতে হবে জানিয়ে ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, জীবনে যেমন ভালো দিক রয়েছে-তেমনি খারাপ দিকও থাকবে-এটা আমাদের মনে নিতে হবে এবং মেনে নিতে হবে। জীবনকে সুন্দর করে দেখতে হবে-তাহলে দুশ্চিন্তা থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। মানসিক চাপ কমাতে হবে, হতাশাগ্রস্ত হওয়া যাবে না কোনওভাবেই, তাহলেই হৃদরোগ থেকে দূরে থাকা যাবে- বলেন ডা. লেলিন চৌধুরী।

Top