অতিথি কলাম : বন্ধ হলে দুর্নীতি, উন্নয়নে আসবে গতি

1.jpg

মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, এডভোকেট :
দুর্নীতি প্রতিরোধ সপ্তাহ-২০১৮ দেশব্যাপী পালিত হয়েছে ’বন্ধ হলে দুর্নীতি,উন্নয়নে আসবে গতি’ শ্লোগানটি সামনে রেখে। বাংলাদেশের সর্বত্র যেমন পালিত হয়েছে কক্সবাজার জেলা সদরেও কক্সবাজার জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি উদ্যোগে ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সহায়তায় গুরুত্ব সহকারে দুর্নীতি প্রতিরোধ সপ্তাহ পালিত হয়েছে। ২৬ মার্চ সকালে কক্সবাজার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির পক্ষে পুস্পস্তবক প্রদানের মাধ্যমে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদনের মধ্য দিয়ে দুর্নীতি প্রতিরোধ সপ্তাহ পালন শুরু হয়। ২৮ মার্চ র‌্যালী, মানববন্ধন ও দুর্নীতিবিরোধী আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। র‌্যালী ও মানববন্ধনে অংশ গ্রহন করেন কক্সবাজার কে,জি ও কক্সবাজার মডেল হাইস্কুলের  ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক মন্ডলী,স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সদস্যরা। কক্সবাজার মডেল হাইস্কুলের হলরূমে জেলা প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি এডভোকেট মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উক্ত দুর্নীতি বিরোধী আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন। বক্তব্য রাখেন দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক অজিত দাশ,কমিটির সহসভাপতি ও সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোঃ শাহজাহান, কক্সবাজার মডেল হাইস্কুলের সিনিয়ার শিক্ষক সাইদুল আলম ও দশম শ্রেণীর ছাত্র মোঃ গোলাম কিবরিয়া। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন কক্সবাজার মডেল হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মোঃ রমজান আলী ও সুজন জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক মাহবুবুর রহমান। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনায় ছিলেন কক্সবাজার সিটি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক শারমিন ছিদ্দিকা লিমা। এতে আরো উপস্থিত ছিলেন কক্সবাজার জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সহ-সভাপতি বাহাদুর শাহ,সদস্য অধ্যাপক রোমেনা আক্তার, শিক্ষক ও ছড়াকার এইচ এম জহিরুল ইসলাম,শিক্ষক প্রদীপ চন্দ্র শীল, শিক্ষক মিসেস মাউন টিন ও মজ্ঞুর আলম প্রমুখ।
প্রধান অতিথির ভাষণে জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন বলেন, অতীতে নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে না দেওয়া ছিল সব চেয়ে বড় দুর্নীতি। কারণ বাঙ্গালী জাতির মূল চালিকা শক্তিই হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। আগামী প্রজন্মই গড়বে জাতিরপিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সত্যিকার সোনার বাংলাদেশ যেখানে থাকবে না দুঃখ,দারিদ্র,অন্যায়,অনাচার। তিনি প্রতিটি স্তরে সততা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে সবার জন্য নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আহ্বান জানান।
দুর্নীতি প্রতিরোধ সপ্তাহ-২০১৮ উদ্ভোধন উপলক্ষে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেছেন, দুর্নীতিবাজরা অনেক বেশী ধুর্ত ও শক্তিশালী,অনেক প্রভাবশালীও বটে। একটি সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তাদের ধরা সম্ভব নয়। তাদের ধরতে সবার সম্মিলিত সহযোগিতা চাই। সবাই মিলে সাহায্য-সহযোগিতা না করলে এটি অসম্ভব ব্যাপার। দুর্নীতির রাহুগ্রাস থেকে দেশকে মুক্ত করতে,দুর্নীতির লাগাম টানতে সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধ শক্ত অবস্থান নিতে হবে। তিনি আরো বলেন,দুর্নীতি দমন কমিশনের ১০৭৩ জন লোক নিয়ে ১৬ কোটি মানুষের দেশ থেকে দুর্নীতি প্রতিরোধ অসম্ভব। এটি কেউ যদি আশা করেন তা হলে ভুল হবে। স্বাধীনতা দিবসে সব সামাজিক,রাজনৈতিক শক্তি ও সংগঠনকে একত্রিত হয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিজ্ঞা করার আহ্বান জানান দুদক চেয়ারম্যান। উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি পাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের আরো শক্ত অবস্থানে যেতে হবে। চলমান উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে অবশ্যই দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে হবে। দুর্নীতি এক জাতীয় লজ্জার নাম এবং দুভাগ্যজনক হলেও সত্য যে সামান্য কিছু মানুষের দুর্নীতির কারণে জাতিকে এ লজ্জা বহন করতে হচ্ছে। দেশের সিংহভাগ মানুষ দুর্নীতির ধারেকাছে না থাকলেও এবং এ নোংরা অবস্থার অবসান চাইলেও তা সম্ভব হচ্ছে না সমাজ,প্রশাসন ও রাজনীতিতে জেকে বসা প্রভাবশালীদের কারণে।
২০০৪ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই এর প্রত্যয় নিয়ে । তবে শুরুতে দুদক নানা সীমাবদ্ধতার শিকার হয়ে লাড়াইয়ে হোঁচট খেয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন আইন তৈরী করেও অজ্ঞাত কারণে দীর্ঘ দিন বিধিমালা তৈরী না করে প্রতিষ্ঠানটিকে অকার্যকর করে রাখা হয়েছিল। কিন্তু শত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মেরুদন্ড সোজা করে দাড়াঁনোর চেষ্টা করছে দুদক। ১৬ কোটি মানুষের দেশে দুদকের অ্যাকটিম তদন্তকারী কর্মকর্তার সংখ্যা মাত্র ২৫০ জন। তাই অভিযোগ খতিয়ে দেখতে সময় লেগে যায়। উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ থাকলে আরো সময় লেগে যায়। তবুও দুদক তার কর্মকান্ডের মাধ্যমে দেশবাসীর মধ্যে কিছুটা হলেও আশা জাগাতে সক্ষম হয়েছে। আইনী প্রক্রিয়ায় যেমন দুর্নীতি দমন করা প্রয়োজন,তেমনি প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করাও প্রয়োজন। মানুষ সচেতন হয়ে নিজে সংযত হত পারে এবং দুর্নীতির বিষয়ে দুদককে তথ্য দিয়ে সহায়তা করতে পারে। তথ্য জানতে হবে এবং জানাতে হবে। দুটি বিষয়েই মানুষকে সচেতন করতে চায় দুদক। মানুষের মধ্যে শুদ্ধাচারের চর্চা বাড়ানো দরকার। মানুষের নৈতিকতার উন্নয়ন দরকার। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে তার সঙ্গে সামান্য সংখ্যক মানুষ জড়িত থাকে। অথচ সবাইকে এর ভিকটিম হতে হয়। সবাইকে এই অনৈতিক কাজের জন্য দায়ী করা উচিত না হলেও সবাইকে এ অনৈতিক কাজের বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ হয়ে সোচ্ছ্বার হতে হবে, প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে হবে।
দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা বা সামাজিক সচেতনতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। দুদকের দেশব্যাপী দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সদস্যরা বিনা বেতনে মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য কাজ করছে। সচেতন হয়ে মানুষ এখন দাবী করছে বিচার বিভাগ যেমন নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথকীকরণ নিশ্চত করার লক্ষে সাংবিধানিক নিশ্চয়তা বাস্তবায়নের জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তেমনি সুস্পষ্টভাবে রাজনীতি থেকে দুর্নীতির পৃথকীকরণ নিশ্চিত করাও একান্ত আবশ্যক। রাজনীতির মোড়কে দুর্নীতিকে জায়েজ করার বা বৈধতা দেওয়ার কোন অবকাশ নাই। যদিও কিছু কিছু ক্ষেত্রে বড় দলের রাজনীতিবিদদের তা করতে দেখে আমজনতা হতাশ হন। দুর্নীতি ও দুর্নীতিবাজরা সব সময় নিন্দনীয় ও বর্জনীয় হওয়া উচিৎ। মানুষ আশা করে ঘুষ-দুর্নীতির দুর্বিপাকে জিম্মি হওয়া দেশবাসীকে স্বস্তির পথ দেখাতে দুদক তার সাহসী ভুমিকা অব্যাহত রাখবে।
লেখকঃ একজন কলামিষ্ট, সাবেক সভাপতি কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতি, সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটার, বহু বইয়ের প্রণেতা এবং কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের একজন সিনিয়ার আইনজীবী।

Top