রোহিঙ্গা বিপর্যয়ে স্থানীয়রা সীমাহীন ক্ষতিগ্রস্ত, দ্রুত সহায়তা প্রয়োজন

Bangla-Press-Release_CXB_31-March-18.doc-2.jpg

আজিম নিহাদ :
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় রোহিঙ্গা বিপর্যয়ের কারণে স্থানীয়রা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফসলের মাঠ, বনাঞ্চল, সামাজিক বনায়ন, বেড়িবাঁধ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বসতভিটা, এমনকি শ্রম বাজার হারিয়ে দিনমজুরেরাও বেকার হয়ে পড়েছে। একারণে স্থানীয় লোকজন সীমাহীন দুর্ভোগে আছে। তাই রোহিঙ্গাদের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয়দের সঠিক তালিকা নিরুপন করে দ্রুত সময়ের মধ্যে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সহায়তা প্রয়োজন।
শনিবার দুপুরে কলাতলীর একটি হোটেলে ‘স্থানীয় অধিবাসিদের উপর বাস্তুচ্যূত রোহিঙ্গা আগমনের প্রভাব, বর্ষা মৌসুমে সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবেলায় করণীয়’ শীর্ষক এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। এটি আয়োজন করে কক্সবাজার সিএসও অ্যান্ড এনজিও ফোরাম।
মিয়ানমারের বলপূর্বক বাস্তুচ্যূত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া হয়েছে উখিয়া ও টেকনাফের পাঁচটি ইউনিয়নে। সেগুলো হল, উখিয়া উপজেলার রাজাপালং ও পালংখালী ইউনিয়ন এবং টেকনাফের হোয়াইক্যং, হ্নীলা ও বাহারছড়া ইউনিয়নে। আলোচনা সভায় এ পাঁচটি ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।
পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের ৩নং ওয়ার্ডের সদস্য মোজাফফর আহমেদ বলেন, মিয়ানমারে সহিসংতা শুরু হওয়ার পর রোহিঙ্গারা পালিয়ে এসে তাঁর এলাকার ১৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধে আশ্রয় নেয়। দীর্ঘদিন বেড়িবাঁধের উপর রোহিঙ্গারা বসবাসের কারণে বেড়িবাঁধ নষ্ট হয়ে গেছে। একারণে স্থানীয় ৪০ হাজার মানুষ চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। আগামি বর্ষা মৌসুমের আগে এই বেড়িবাঁধ সংস্কার করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গারা বনভূমি ধ্বংস করে দিয়েছে। নাফনদীতে মাছ ধরায়ও নিষেধাজ্ঞা আছে। সাধারণ মানুষ না খেয়ে মারা যাওয়ার উপক্রমে এখন। সঠিত তথ্য নিরুপন করে এখনই স্থানীয়দের জন্য সহায়তা দেওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নং ওয়ার্ডের সদস্য মীর শাহেদুল ইসলাম রুমান বলেন, কুতুপালং এলাকার লোকজন কর্মহীন হয়ে পড়েছে। সেখানে ভিজিডি (ঝুকিপূর্ণ জনগোষ্ঠি উন্নয়ন) কর্মসূচিও বন্ধ। এলাকায় ডিফথেরিয়া রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। তাদেরকে টিকা দেওয়া হচ্ছে না।
পালংখালী ইউনিয়নের বালুখালী এলাকার ইউপি সদস্য বলেন, পালংখালী এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোতে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক সংকট চলে আসছে। ম্যানেজিং কমিটির উদ্যোগে কিছু প্যারা শিক্ষক নিয়োগ করে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো হতো। কিন্তু রোহিঙ্গারা আসার পর এনজিও গুলো বেশি বেতনে চাকরিতে নিচ্ছে। বেতন বেশি হওয়ায় প্যারা শিক্ষকেরা বিদ্যালয়ের চাকরি ছেড়ে দিয়ে ক্যাম্পে চাকরি করছে। প্যারা শিক্ষকেরা চলে যাওয়ায় বর্তমানে শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়েছে। এসব বিদ্যালয় গুলোতে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ করা প্রয়োজন।
পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নং ওয়ার্ডের সদস্য নুরুল আমিন বলেন, তাঁর এলাকার লোকজন টেকনাফ স্থল বন্দরে গিয়ে শ্রমিকের কাজ করতো। কিন্তু এখন সেখানে স্থানীয়দের বঞ্চিত করে কম বেতনে রোহিঙ্গা শ্রমিক দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে। এরফলে স্থানীয়দের সেখানে কাজ দেওয়া হচ্ছে না। এসব দিনমজুরেরা মারাত্মক কষ্টে আছে।
পালংখালী ইউপি চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গা শিবিরে নির্বিচারে পাহাড় কাটা হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ের এসব মাটি এসে এলাকা প্লাবিত হয়ে যাবে। পালংখালীতে পাঁচটি খাল রয়েছে। সেই খাল গুলো বর্ষা মৌসুমের আগেই খনন করতে হবে।
তিনি বলেন, তাঁর এলাকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি লোকজন আগে পানি সংগ্রহ করতো বনাঞ্চলে গর্ত খুড়ে। কিন্তু রোহিঙ্গারা আসার পর থেকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির খাবার পানির সেই ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে গেছে। নলকূপেও পানি মিলছে না। এখন মারাত্মক পানি সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গাদের কারণে আইনশৃঙ্খলার মারাত্মক বিঘœ ঘটছে। প্রতিরাতে তিন থেকে চারজন রোহিঙ্গা চোর ধরা পড়ে। কিন্তু তাদেরকে পুলিশে দেওয়া যায় না। অতীতে রোহিঙ্গা বিপর্যয়ের সময় তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য একটি ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু এখন কোন ব্যবস্থা নেই। সাধারণ মানুষ আতঙ্কের মধ্যে থাকে।
চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, দেশি-বিদেশি এনজিও গুলো রোহিঙ্গা শিবিরে ঢুকার আগে স্থানীয়দের নানা ধরণের সহায়তা করার বাণী শুনায়। কিন্তু শিবিরে ঢুকে পড়লে স্থানীয়দের আর মনে রাখে না। তাদের বিরুদ্ধে কিছু বলাও যায় না। কিছু বললেই আইনপ্রয়োগকারি সংস্থার লোকজন স্থানীয়দের উপর নির্যাতন চালায়। রোহিঙ্গাদের কারণে স্থানীয়দের যেসব সমস্যা হয়েছে, সেগুলো এক সপ্তাহের মধ্যে সমাধানের উদ্যোগ না নিলে তিনি উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হবেন বলে হুঁশিয়ারি করেন।
হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ৯নং ওয়ার্ডের সদস্য মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘মিয়ানমারে যেসব রোহিঙ্গারা সশস্ত্র হামলা চালিয়েছিল তারা এখন উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা শিবিরে আছে। তাদের সাথে অবৈধ অস্ত্রও আছে। আমরা শঙ্কায় আছি, কখন আবার সেই অস্ত্র গুলো আমাদের (স্থানীয়দের) বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়’।
হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ৪নং ওয়ার্ডের সদস্য হোছাইন আহমদ বলেন, তাঁর এলাকার দরিদ্র লোকজন কৃষি কাজ করে এবং নাফনদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। কিন্তু এখন কৃষি জমি নষ্ট করে ফেলেছে রোহিঙ্গারা। নাফ নদীতেও মাছ ধরা নিষেধ। খেটে খাওয়া লোকজনের জীবন চলবে কিভাবে?
হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আবুল হোছেন বলেন, রোহিঙ্গাদের কারণে স্থানীয়দের ক্ষতি হয়নি এমন কিছু বাকি নেই। তাদের কারণে কমিউনিটি ক্লিনিকে ওষুধ পাওয়া যায় না। তাদের ভীড়ে সেবাও পাওয়া যায় না।
একই ইউনিয়নের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য মর্জিনা আক্তার বলেন, রোহিঙ্গাদের কারণে রাস্তাঘাটে তীব্র যানজট। যানজটের কারণে সঠিক সময়ে বিদ্যালয়ে পৌছতে না পারায় শিক্ষার্থীরা এখন বিদ্যালয়ে ঠিকমত প্রাত্যহিক সমাবেশে অংশগ্রহণ করতে পারে না। পরিবহন ভাড়া বেড়ে গেছে। উদ্বেগজনক হারে সবকিছুর ব্যয় বাড়লেও আয়ে ধস নেমেছে। স্থানীয়দের ধৈয্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে।
হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুর আহমেদ আনোয়ারী বলেন, রোহিঙ্গাদের কারণে পাঁচ ইউনিয়নে সব মিলিয়ে আনুমানিক ৫০ হাজার স্থানীয় লোকজন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা এখন আর সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠার মত সক্ষম নয়। তাই তাদেরকে রেশনিং কার্যক্রমের আওতায় আনতে হবে। এছাড়া দ্রুত বিকল্প জ্বালানী ব্যবস্থা করা দরকার। কারণ বন বাঁচাতে না পারলে আমাদের বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে যাবে।
তিনি আরও বলেন, যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেগুলো দ্রুত সময়ের মধ্যে মেরামত করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে সেগুলো সাইক্লোন শেল্টার আদলে করা হউক। তাহলে বর্ষা মৌসুমে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় সেখানে আশ্রয় নিতে পারবে রোহিঙ্গা ও স্থানীয়রা।
বাহারছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজিজ উদ্দিন বলেন, তাঁর এলাকায় ২০ হাজার রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। সেখানে পাঁচটি সাইক্লোন শেল্টার রয়েছে। সেগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে। বর্ষা মৌসুমের আগে সেগুলো সংস্কার করা এবং নতুন নির্মাণ করা জরুরি।
তিনি বলেন, রাস্তাঘাটের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। মারাত্মক খাবার পানি সংকট সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুত রাস্তাঘাট মেরামত এবং সাগরের পানি শোধনের মাধ্যমে খাবার পানির বিকল্প ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নিতে হবে।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এনজিও ব্যুরো অব বাংলাদেশের মহাপরিচালক কে এম আব্দুস সালাম। বিশেষ অতিথি ছিলেন কক্সবাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী ত্রাণ ও পুর্ণবাসন কমিশনার আবুল কালাম আজাদ, ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. আইনুন নিশাত, দুর্যোগ ব্যবস্থা বিশেষজ্ঞ ড. আতিকুল ইসলাম, ইন্টারসেক্টর কো-অর্ডিনেশন গ্রুপের জ্যেষ্ঠ সমন্বয়ক সুমবুল রিজভী, জাতীসংঘের বাংলাদেশের আবাসিক কার্যালয়ের প্রতিনিধি, আইওএম প্রতিনিধি, ইউসিফে প্রতিনিধি প্রমুখ।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কক্সবাজার সিএসও অ্যান্ড এনজিও ফোরামের কো-চেয়ারম্যান আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা ও রেজাউল করিম চৌধুরী।
ড. আতিকুল ইসলাম বলেন, সমস্যা এখন প্রকট। যেকোন সময় ঘুর্ণিঝড় হতে পারে। এটি হলে রোহিঙ্গা শিবিরে ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরী হবে। শিবির এলাকার নদী-খাল গুলো এখনই খনন করা জরুরি।
ড. আইনুন নিশাত বলেন, মিয়ানমারে ফেরত যাওয়ার ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের মধ্যে একমাত্র ভরসা ইউএনএইচসিআরের উপর। তাই এই সংস্থার মাধ্যমে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে এবং সেখানেও (মিয়ানমার) এই সংস্থাকে দেখভালের জন্য নিয়োগ করতে হবে। তিনি টেকনাফের বেড়িবাঁধ গুলো দ্রুত মেরামত করা প্রয়োজন বলে মত দেন।
রোহিঙ্গা শরণার্থী ত্রাণ ও পুর্ণবাসন কমিশনার আবুল কালাম আজাদ বলেন, এখন পর্যন্ত ১০ লাখ ৯৫ হাজার রোহিঙ্গা নিবন্ধন করা হয়েছে। ৫ হাজার ৮০০ একর জমিতে ১১ টি স্পটে ৩০ টি শিবির করে তাদেরকে রাখা হয়েছে। জ্বালানী কাঠের বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিদিন চারটি ফুটবল স্টেডিয়ামের সমান বনভূমি নষ্ট করছে রোহিঙ্গারা।
তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গাদের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, পরিবেশগত ভারসাম্য, কৃষি ব্যবস্থাসহ যেসব বিষয়ে ক্ষতি হয়েছে সেগুলো কাটিয়ে উঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেই হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় ৩ লাখ ৩৬ হাজার লোকজনকে নানা সহায়তা দেওয়া হবে। তবে একেক জনের ক্ষতি একেক ধরণের, তাই সেটি বিবেচনা করেই সহায়তা কার্যক্রম চালানো হবে।
তিনি আরও বলেন, ইতোমধ্যে কৃষিখাতে সহায়তা কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে। ২৫ হাজার পরিবারকে পাওয়ার টিলারসহ কৃষি উপকরণ সরবরাহ করা হচ্ছে।
আবুল কালাম আজাদ বলেন, পাহাড় কাটার কারণেআগামি বর্ষায় শিবিরে দেড় লাখ রোহিঙ্গা ভূমিধসের ঝুঁকিতে আছে। তাদেরকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে।
কে এম আব্দুস সালাম বলেন, ‘আমরা যখন নি¤œ আয়ের দেশ থেকে উপরের দিকে যাচ্ছি, ঠিক সেই মুহুর্তে রোহিঙ্গারা আমাদের ঘাড়ের উপর চলে আসে। এটি একটি বিশাল আন্তর্জাতিক ইস্যু। তারপরও প্রধানমন্ত্রী এত বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠিকে আশ্রয় দিতে কুণ্ঠবোধ করেননি। তাই তিনি (প্রধানমন্ত্রী) মাদার অব হিউমিনিটি হিসেবে উপাধী পেয়েছেন।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গা শিবিরে যেসব ত্রাণ বা অন্যান্য সামগ্রি দেওয়া হয় সেগুলোতে যেন কোন ধরণের লুকোচুরি করা না হয়।

Top