তালিকাভুক্তিতে কৌশলী রোহিঙ্গারা

rohingya-1.jpg

রফিকুল ইসলাম :
প্রথম দফায় বাংলাদেশের প্রদত্ত তালিকায় ব্যাপক গরমিল পরিলক্ষিত হওয়ায় ২য় দফায় আরও দশ হাজার রোহিঙ্গার ১টি তালিকা মিয়ানমারের নিকট হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। রাখাইনে ফেরত গিয়ে রোহিঙ্গাদের ঠিকানা কোথায় হবে, জীবন জীবিকা কিভাবে চলবে, জীবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কি হবে তা নিয়ে উদ্বিগ্ন তারা। এসব কিছু মাথায় রেখে পালিয়ে এসে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে তালিকা প্রণয়ন কার্যক্রমে নানা কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে। ফলে ১ম দফায় দেয়া ৮ হাজার ৩২ জন রোহিঙ্গার তালিকা যাচাই বাছাই করে মিয়ানমার ছাড়পত্র দিয়েছে মাত্র ৫৫৬জনের। এ সব তালিকা নিয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন জটিলতা ও অনিশ্চয়তা ক্রমশ বাড়ছে বলে অভিমত সংশ্লিষ্ঠদের।
১৬ ফেব্রুয়ারী বাংলাদেশ ও মিয়ানমার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে ঢাকায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ১৬শ ৩৭ পরিবারের ৮ হাজার ৩২ জন রোহিঙ্গার তালিকা হস্তান্তর করেছিল মিয়ানমারের নিকট। র্দীঘ প্রায় ১মাস পরে কথিত যাচাই বাছাই শেষে গত ১৪ মার্চ ৩৬৩ জন রোহিঙ্গার ছাড়পত্র ঘোষণা করে মিয়ানমার। অধিকতর যাচাই বাচাই করে গত ২১ মার্চ উক্ত তালিকা থেকে আরও ১৯৩জন সহ মোট ৫৫৬ জন রোহিঙ্গাকে তাদের অধিবাসী হিসাবে ছাড়পত্র প্রদান করেছে মিয়ানমার। সাম্প্রতিক সময়ে সম্পাদিত বাংলাদেশ ও মিয়ানমার মধ্যকার প্রর্তাপন চুক্তি অনুযায়ী ২০১৬ সালে আসা প্রায় ৯৮ হাজার ও ২০১৭ সালের ২৫ আগষ্টের পর থেকে আসা ৬লাখ ৯০ হাজার সহ ৮লাখ ২২ হাজার রোহিঙ্গা ফেরত কার্যক্রম নিয়ে মিয়ানমারের আন্তরিকতা ও তাদের সৃষ্ট জঠিলতা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। সে অনুযায়ী বাংলাদেশে চুক্তি অনুযায়ী ৮লাখ ২২ হাজার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন করতে অন্তত অর্ধ শতাধিক বছর সময় লাগতে পারে বলে হিসেবে করে জানা গেছে।
২০টি সংযুক্ত ক্যাম্প নিয়ে গঠিত বিশ্বের সর্ববৃহৎ উদ্ভাস্তু শিবির কুতুপালং- বালুখালী মেঘা ক্যাম্প। কুতুপালং অংশের রোহিঙ্গা ব্যবস্থাপনার কমিটির সেক্রেটারী মোঃ নুর ও বালুখালী অংশের সভাপতি লালু মাঝি বলেন- মিয়ানমারের তালিকা সর্ম্পকিত অভিযোগ কিছু কিছু ক্ষেত্রে সঠিক। আর্ন্তজাতিক চাপের মুখে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়ে মিয়ানমার বাংলাদেশের সাথে প্রর্ত্যাপন চুক্তি করে। লোক দেখানো চুক্তির প্রতি রোহিঙ্গাদের তেমন কোন আস্থা নেই। তবে অধিকাংশ রোহিঙ্গা দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিজ দেশে ফিরে যেতে আগ্রহী। কিন্তু উক্ত চুক্তিতে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বসহ নিরাপত্তা, নিজ নিজ বসতভিটা বা গ্রামে বসবাস, অবাধ চলাফেরা ও আয় রোজগার, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘ, ওআইসি এর ভূমিকাসহ মানবাধিকারের মত গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয়ের নিশ্চয়তা নেই।
তাদের মতে সম্ভবত বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের করা তালিকার সাথে সমন্নয় করে প্রত্যাবাসনের জন্য তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে। যদি তা হয়ে থাকে তাহলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ তালিকার সাথে মিয়ানমারের সংরক্ষিত তালিকার মধ্যে গরমিল থাকতে পারে কারণ ঐ তালিকা প্রণয়নকারীদের সাথে রোহিঙ্গাদের ভাষাগত বিস্তর অমিল রয়েছে। হয়ত কোন রোহিঙ্গা তার নাম কলিমুল্লাহ বলেছে অথচ নিবন্ধনের সময় লেখা হয়েছে ঐ রোহিঙ্গার নাম করিমুল্লাহ। তাছাড়া রোহিঙ্গাদের মাঝে মিয়ানমার ভাষার টান বিদ্যমান থাকায় ঠিকানার ক্ষেত্রে ও প্রচুর ভূল হয়েছে। তাদের দাবী তালিকা প্রণয়ন বা নিবন্ধনের কাজে উখিয়া ও টেকনাফের স্থানীয় লোকের পাশাপাশি শিক্ষিত, সচেতন রোহিঙ্গাদের নিয়োজিত করলে হয়ত এ ধরনের ভূল বা গরমিল তেমন হত না। এছাড়াও নানা ভয় ভীতির মূখে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা ঐ সময় তাদেরকে জোর পূর্বক ফেরৎ যাওয়ার ভয়ে হয়ত অনেকে ইচ্ছে করে প্রকৃত নাম ঠিকানা না দিয়ে ভূয়া নাম ঠিকানা দিয়ে থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে এ ধরণের তালিকার নাম ঠিকানা মিয়ানমার রাখাইন অঞ্চলে খুজে পাওয়া যাবে না বলে ও রোহিঙ্গাদের অভিমত।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক পালংখালী ইউপি চেয়ারম্যান গফুর উদ্দীন চৌধুরী রোহিঙ্গা নেতাদের বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করেন। তারা বলেন রোহিঙ্গাদের মাঝে এক শ্রেণীর প্রত্যাবাসন বিরোধী রোহিঙ্গারা কতিপয় এনজিওদের ইন্ধনে রাখাইনে ফেরত যেতে ইচ্ছুক সাধারণ রোহিঙ্গাদের নানা ধরনের ভয় ভীতি দেখিয়ে প্রত্যাবাসনের জন্য প্রণীত তালিকায় নানা কৌশল ও ষড়যন্ত্র অবলম্বন করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তারা বলেন নির্ভূল ও গ্রহণ যোগ্য তালিকা প্রণয়ণ করা না হলে বিপুল সংখ্যক পালিয়ে এসে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ফেরৎ পাঠানো কার্যক্রমে জটিলতা ও অনিশ্চয়তা থেকে যেতে পারে। সরকারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন- কি কারণে প্রথম দফায় প্রদত্ত তালিকার অধিকাংশ ছাড়পত্র পায়নি তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। রোহিঙ্গা নেতাদের উল্লেখিত অভিমত উড়িয়ে না দিয়ে তিনি বিষয় গুলো আরও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ ও নির্ভূল তালিকা প্রণয়ণে অর্থবহ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়ে বলেন- ২য় পর্যায়ে ৫ থেকে ১০ হাজার রোহিঙ্গার নতুন তালিকা প্রণয়নের কাজ চলছে। আশা করা হচ্ছে ২য় তালিকা অধিকতর গ্রহণযোগ্য হবে।

Top