৩ বছর বন্ধ রাখতে হবে সেন্টমার্টিন ভ্রমণ!

Saint-Martin-Island.jpg

কক্সবাজার রিপোর্ট :
প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন বাংলাদেশের গৌরব। কিন্তু নানা কারণে এটি এখন নিশ্চিন্ন হয়ে যাওয়ার পথে। এর জন্য সরকারি কয়েকটি দপ্তর ও কতিপয় অর্থলোভীরা দায়ী। অথচ সেন্ট মার্টিনের পরিবেশ রক্ষায় আইন হয়েছে, কিন্তু যথাযথ প্রয়োগ হয়নি। দ্বীপ রক্ষা করতে হলে আগামী তিন বছর সেখানে পর্যটক যেতে দেয়া যাবে না।

রোববার কক্সবাজার হিল ডাউন সার্কিট হাউজ মিলনায়তনে ‘সেন্ট মার্টিন দ্বীপের বিরল জীববৈচিত্র এবং প্রতিবেশ সংরক্ষণ কল্পে পরামর্শ’ শীর্ষক এক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বক্তারা এসব কথা বলেন। এটি আয়োজন করে পরিবেশ অধিদপ্তর।

কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. সুলতান আহমেদ। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান লে. কর্ণেল (অব.) ফোরকান আহমেদ, ট্যুরিষ্ট পুলিশ কক্সবাজার জোনের পুলিশ সুপার জিললুর রহমান, জেলা জাসদের সভাপতি ও সী বীচ ম্যানেজম্যান্ট কমিটির সদস্য নইমুল হক চৌধুরী টুটুল, কক্সবাজার সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আবু তাহের। বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার শাখার সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী, সাংবাদিক মুহাম্মদ আলী জিন্নাত, কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা দীপু, ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের নেতা এমএ হাসিব বাদল, জেলা কটেজ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি কাজী রাসেল আহমেদ নোবেল।

কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক ড. সোলাইমান হায়দার। স্বাগত বক্তব্য রাখেন পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের সহকারি পরিচালক সাইফুল আশ্রাব।

দীপক শর্মা দীপু বলেন, অন্তত তিন বছরের জন্য পর্যটকদের সেন্ট মার্টিন যাওয়া আসা বন্ধ করে দিতে হবে। এই তিন বছরের মধ্যে সেন্ট মার্টিনকে সরকারের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিতে হবে। প্রয়োজনে এই দ্বীপের জন্য আলাদা নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। যে ভাবেই হউক আইন শতভাগ প্রয়োগ করতে পারলে, সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা যাবে।

মোহাম্মদ আলী জিন্নাত বলেন, সেন্ট মার্টিন ধ্বংস হয়ে যাওয়ার জন্য দায়ী স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা প্রশাসন, জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর। সরকারের এই চারটি প্রতিষ্ঠান আইন প্রয়োগে চরম অবহেলা করেছে।

তিনি আরও বলেন, সেন্ট মার্টিন রক্ষার জন্য একটি নির্দিষ্ট টাস্কফোর্স কমিটি গঠন করতে হবে। এই কমিটির মাধ্যমে দ্বীপে যাবতীয় কাজ হতে হবে। ডে-ট্যুরিজমের ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে রাতে কোন পর্যটক দ্বীপে অবস্থান করতে না পারে।

জেলা জাসদের সভাপতি নইমুল হক চৌধুরী টুটুল বলেন, সব সময় আলোচনা হয় ব্যক্তি মালিকাধীন হোটেল গুলো নিয়ে। কিন্তু সেখানে সরকারি অনেক দপ্তর এমনকি পরিবেশ অধিদপ্তরও বহুতল ভবন করেছে। যারা আইন প্রয়োগ করে, তারাই যদি অনিয়ম করে তাহলে দ্বীপ কিভাবে রক্ষা পাবে ?
তিনি বলেন, ‘আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও সমান হতে হবে। আগে নিজেদের (সরকারি দপ্তরের ভবন) ভবন গুলো ভাঙতে হবে। তারপর অন্য গুলো ধরবেন। সরকারি সংশ্লিষ্ট দপ্তর গুলোর কারণে আজ দ্বীপের এই অবস্থা’।

সাংবাদিক ইউয়িনের সভাপতি আবু তাহের বলেন, সরকারি দপ্তর গুলোর মধ্যে সমন্বয় নেই। সরকারের একটি দপ্তর আইন প্রয়োগ করতে যায়। আর অন্যদিকে অপর একটি দপ্তর অনুমতি দিয়ে দেয়। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘সেন্ট মার্টিন দ্বীপে একটি জাহাজ চলাচলের অনুমতি চেয়ে আবেদন করলে, জেলা প্রশাসন সবকিছু বিবেচনা করে অনুমতি না দেয়ার জন্য সুপারিশ করে। কিন্তু তারপরও পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে অনুমতি দিয়ে দেওয়া হয়। আগে সরকারি দপ্তর গুলোর মধ্যে সমন্বয় আনতে হবে। তাদের ওয়াদাবদ্ধ হতে হবে যে, দেশের অমূল্য সম্পদ সেন্ট মার্টিন রক্ষায় যেন অন্তত সরকারি দপ্তর গুলোর সমন্বয় থাকে’।

বাপা’র কক্সবাজারের সাধারণ সম্পাদক ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ রক্ষার ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের নিদের্শনা মানা হচ্ছে না। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সংগঠন (বেলার) পক্ষ থেকে ১০৬ টি অবৈধ হোটেলের তালিকা করা হয়। কিন্তু সেগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সচেতনতা দিয়ে কিছুই হবে না। কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ ছাড়া সেন্ট মার্টিন দ্বীপ রক্ষা যাবে না।

পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক ড. সোলাইমান হায়দার বলেন, ২০০০ সালের দিকে দ্বীপে প্রচুর গাছপালা ও প্যারাবন ছিল। কিন্তু এখন সেগুলো বিরানভূমি। ছেরা দ্বীপের অবস্থা আরও ভয়াবহ। এখনই পর্যটক যাওয়া আসার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ আনতে না পারলে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। আর যেসব ভবনের ছাড়পত্র নেই, সেগুলোর বিরুদ্ধে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে।

কউক চেয়ারম্যান লে. কর্ণেল (অব.) ফোরকান আহমেদ বলেন, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ ডুবে যেতে বেশি সময় নেই। ২০১১ সালে পরিবেশের আইন হয়েছে, কিন্তু সেই আইন প্রয়োগ হয়নি। আইনের প্রয়োগ হলে, দ্বীপের আজ এই অবস্থা সৃষ্টি হতো না। কিন্তু এখন থেকে দ্বীপকে রক্ষার স্বার্থে আইন প্রয়োগ করতে কউক বদ্ধ পরিকর।

তিনি বলেন, সম্প্রতি তিনি সেন্ট মার্টিন ঘুরে ৭৭ টি হোটেলকে নোটিশ করেছেন। এই সব হোটেলকে পর পর আরও দুইবার নোটিশ করা হবে। এরপর সেগুলো উচ্ছেদ করা হবে। যত চাপই আসুক, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে কউক।

পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. সুলতান আহমেদ বলেন, যেটার (কোরাল) উপর সেন্ট মার্টিন দাঁড়িয়ে আছে, সেই কোরাল প্রতিদিন পর্যটকেরা আসার সময় নিয়ে আসে। এতে দ্বীপের চরম ক্ষতি হচ্ছে। আর ময়লা আবর্জনার কারণে দ্বীপ চরমভাবে দূষিত হচ্ছে। একারণে সেখানে জীববৈচিত্র হারিয়ে যাচ্ছে। পুরো দ্বীপটি রক্ষায় আমাদের প্রত্যেককে সচেতনভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

Top