কক্সবাজারের মহেশখালীর প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন (ইসিএ) এলাকা সোনাদিয়া দ্বীপের জীববৈচিত্র্য ও খাসজমি রক্ষায় অবশেষে কঠোর অবস্থানে গেছে প্রশাসন। ম্যানগ্রোভ প্যারাবন ও ঝাউবন উজাড় করে গড়ে তোলা অবৈধ কটেজ ও রিসোর্ট উচ্ছেদে বড় ধরনের অভিযান শুরু করেছে যৌথ বাহিনী। শনিবার (৯ এপ্রিল) সকাল থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২৫টি অবৈধ কটেজ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে দখলদারদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়েরের কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
শনিবার সকাল থেকে মহেশখালীর সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবু জাফর মজুমদারের নেতৃত্বে এই সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়। এতে উপজেলা প্রশাসনের সাথে বাংলাদেশ নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, মহেশখালী থানা পুলিশ, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী, পরিবেশ অধিদপ্তর, বন বিভাগ এবং ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা অংশ নেন।
সোনাদিয়া দ্বীপের জিওপলিটিক্যাল গুরুত্ব এবং উচ্ছেদ অভিযানের আইনি ভিত্তি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিয়ে রাতে মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরান মাহমুদ ডালিম দৈনিক কক্সবাজারকে বলেন, সোনাদিয়া জিওপলিটিক্যালি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি দ্বীপ। গোটা দ্বীপটি আমাদের সরকারি ১ নম্বর খাস খতিয়ানের অন্তর্ভুক্ত এবং পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক গেজেটভুক্ত প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা বা ইসিএ। এখানে যেকোনো ধরনের অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও বেআইনি।
দীর্ঘদিন ধরে দখলদারদের সতর্ক করার বিষয়টি উল্লেখ করে ইউএনও বলেন, "বিগত কয়েক বছর ধরে এখানে অবৈধভাবে রিসোর্ট ও কটেজ নির্মাণ করা হয়েছে। আমরা আগে থেকেই তাদের তথ্য সংগ্রহ করছিলাম। দখলদারদের নোটিশ দিয়েছি, মাইকিং করে সতর্ক করেছি। অবৈধ কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকতে এবং স্থাপনা সরিয়ে নিতে তাদের বারবার সময় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অপরাধীরা আমাদের সতর্কতা ও নোটিশ উপেক্ষা করেছে। সে অনুযায়ী ‘ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন’সহ অন্যান্য সকল আইনের আওতায় সরকারি জমি ও পরিবেশ রক্ষার্থে আমরা এই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেছি।”
শনিবারের অভিযানে ছোট, মাঝারি ও বড় মিলিয়ে প্রায় ২৫টি কটেজ উচ্ছেদ করা হয়েছে জানিয়ে ইমরান মাহমুদ ডালিম বলেন, “কটেজ ও রিসোর্টগুলোর অধিকাংশই ছিল স্থায়ী স্থাপনা- আধা পাকা এবং শক্ত গাঁথুনির। ফলে বোঝাই যাচ্ছিল, অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ কার্যকলাপ চলছিল।”
ইউএনও আরও বলেন, “এই অভিযান এখানেই শেষ নয়, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। আমরা ভেতরে আরও অবৈধ কটেজ থাকার তথ্য পেয়েছি। খুব দ্রুত সেগুলোর তালিকা করে আরও বড় আকারের অভিযান পরিচালনা করা হবে। দখলদারদের বিষয়ে আমাদের বার্তা স্পষ্ট- "আমরা তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলার দিকে অগ্রসর হচ্ছি। যেকোনো মুহূর্তেই উচ্ছেদ অভিযান চলবে।”
এ সময় তিনি স্থানীয় জনসাধারণকে অবৈধ কার্যকলাপে প্রশ্রয় না দেওয়ার এবং প্রশাসনকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান।
মাঠ পর্যায়ে অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবু জাফর মজুমদার বলেন, দ্বীপের পরিবেশ ও সরকারি খাসজমি রক্ষায় আমরা জিরো টলারেন্স নীতিতে এগোচ্ছে প্রশাসন। কোনো অবৈধ কটেজ বা ঘের এখানে রাখা হবে না। দূর থেকে জমি কিনে স্থানীয় দালালের মাধ্যমে কাঠামো তুলে যারা এখানে অবৈধ ব্যবসা করছেন, তাদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, সোনাদিয়া দ্বীপ সামুদ্রিক কাছিমের ডিম পাড়ার অন্যতম প্রধান স্থান। এছাড়া এখানে রয়েছে সমৃদ্ধ উপকূলীয় বনভূমি এবং শীতের মৌসুমে আসা অসংখ্য পরিযায়ী ও বিলুপ্তপ্রায় পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থল। কিন্তু অপরিকল্পিত অবৈধ কটেজ, চিংড়ি ও কাঁকড়া ঘের এবং পর্যটকদের অবাধ বিচরণের কারণে এই জীববৈচিত্র্য চরম হুমকির মুখে পড়ে।
এদিকে প্রশাসনের এই সাঁড়াশি অভিযানের খবরে সোনাদিয়া দ্বীপের অবৈধ কটেজ মালিক ও দখলদারদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। শনিবার সকাল থেকেই অনেককে তড়িঘড়ি করে আসবাবপত্র সরিয়ে নিতে দেখা গেছে। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কটেজ মালিকদের একাংশ দাবি করেছেন, যথাযথ বিকল্প ব্যবস্থা বা পুনর্বাসনের সুযোগ না দিয়েই তাদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে।
অন্যদিকে প্রশাসনের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন স্থানীয় পরিবেশকর্মীরা। তারা বলছেন, উচ্ছেদ করা জায়গাগুলো যেন পুনরায় দখল না হয়, সেজন্য দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি প্রয়োজন। সোনাদিয়াকে প্রকৃতি-নির্ভর টেকসই পর্যটন বা সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবায়নের এখনই উপযুক্ত সময় বলে মনে করছেন সচেতন মহল।