দেশের পূর্বসীমান্তের ককসবাজার ও বান্দরবানের সীমান্তবর্তী ১০ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এইচএসসি ও আলিম ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ চোরাচালান অপর ৩ কারণ বলে মন্তব্য করেছেন অভিজ্ঞ মহল।
রোববার (১ নভেম্বর) বিভিন্ন শিক্ষক-রাজনীতিবিদ ও সচেতন ব্যক্তিদের সাথে আলাপকালে তারা এ সব কারণে ফল বিপর্যয় হয়েছে বলে দাবী করেন।
বিপর্যয়ে পতিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্য অন্যতম হলো নাইক্ষ্যংছড়ি হাজি এমএ কালাম সরকারী কলেজ,গর্জনিয়া ফইজুল উলুম ফাজিল ডিগ্রি মাদরাসা, গর্জনিয়া ইসলামীয়া আলিম মাদরাসা, বাইশারী স্কুল ও কলেজ ও নাইক্ষ্যংছড়ি টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজ। ইসলামীয়া মাদরাসায় পরীক্ষার্থী ছিল ১ জন। সেও পাস করেনি।
এ সব প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের অতি কাছে। যে সব প্রতিষ্ঠানের আশপাশে চোরাকারবার হয় প্রকাশ্যে। এ সীমান্তে মাদকের হাট বনে শতশত। শিক্ষার্থীরা। এসব মন্দ কাজের ছোয়াঁ থেকে সরে আসতে পারছে না।
নাইক্ষ্যংছড়ি হাজি এম এ কালাম সরকারী কলেজের অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) জাফর আলম বলেন, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে চোরাচালান বৃদ্ধি পেয়েছে আশংকাজনক হারে। এতে চোরাকারবারে জড়িয়ে গেছে শিক্ষার্থীরাও। তারা সারা রাত-দিন সে কাজে লিপ্ত থাকে। স্কুল-কলেজে যায় না। কাড়ি-কাড়ি টাকা পকেটে থাকার কারণে অনেক দামী মোবাইল তাদের হাতে থাকে। আর সেই মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত থাকে বাকী সময়। বই-পুস্তক ছুঁয়েও দেখে না। পাশাপাশি রাজনীতির খাতায় নামও রাখে। তবে বলে বেড়ায় সে ছাত্র। এ ছাড়া অভিভাবকরা অসচেতন। কদাচিৎ তাদের কলেজে আসতে আহবান করলেও অভিভাবক সমাবেশে তারা আসেন না মোটেও। তাই পিছিয়ে পড়ছে ফলাফল। অথচ তার কলেজে অনেক শিক্ষক আছেন যারা খুবই মেধাবী।
নাইক্ষ্যংছড়ির সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান রাজনীতিবিদ কামাল উদ্দিন বলেন, নাইক্ষ্যংছড়ির শিক্ষা ব্যবস্থা শূণ্যের কোটায়। শিক্ষক সংকট, অভিভাবক অসচেতন, অনেক প্রধান শিক্ষক স্কুলে সময় দেন না। সহকারী শিক্ষকরা টেনে-টুনে স্কুল চালান। এ ছাড়া শিক্ষার্থীরা পড়ার টেবিলে বসে না। তারা স্কুল-কলেজ যায় না। মেয়েদের আধিক্য বেশী।
রামু উপজেলার সীমান্তবর্তী ইউনিয়ন কচ্ছপিয়া ইউনিয়নের শিক্ষাবিদ অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, শিক্ষক-ছাত্র-অভিভাবক সমন্বয় নেই দেশের পূর্বসীমান্তের গর্জনিয়া-কচ্ছপিয়া-ঈদগড় ও কাউয়ারখোপ ইউনিয়ন এলাকায়। শিক্ষার্থীদের বুনিয়াদী শিক্ষায় গণিত, ইংরেজি ও আইসিটিতে খুবই দূর্বল। তার উপর বিগত দিনে কেন্দ্র পরিবর্তন। ২০/৩০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে পরীক্ষা দিতে গিয়ে উচ্চমাধ্যমিক ও মাধ্যমিক স্তরে পরীক্ষায় ফলাফল বিপর্যয় ঘটছে সম্প্রতি। এ ছাড়া চোরাকারবারের বিষয় তো আছেই।
গর্জনিয়া ইউনিয়নের শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ ওবাদুল হাকিম বলেন, প্রতিষ্ঠানে রাজনীতি ও এলাকার চোরাচালান বন্ধ করতে হবে। পরীক্ষা কেন্দ্র হতে হবে ছোট বাচ্চাদের পরিচিত স্থানে। অনেক দূরে কেন্দ্র সিস্টেম বাদ দিতে হবে। তখন ফলাফল ভাল হবে। শিক্ষকরা একার পক্ষে ফলাফল ভাল হবে না।
বাইশারী স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ মুহাম্মদ ওমর ফারুখ বলেন, তার প্রতিষ্ঠানে ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ উদঘাটন করতে গিয়ে দেখা গেছে ইংরেজিতে অধিকাংশ শিক্ষার্থী খারাপ করেছে। এ কারণে তিনি জরুরীভাবে আগামী মঙ্গলবার শিক্ষক মিটিং ডেকেছেন। শিক্ষার্থীরা ইংরেজিতে দূর্বল। আর গ্রামাঞ্চলে ইংরেজি-গণিত বিষয়ে
বাড়িতে পড়তে হাউজ টিউটর নেই। এছাড়া চোরাকারবার ও মোবাইল শিক্ষার্থীদের ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
স্খানীয় অভিভাবক ও ব্যবসায়ী শফিকুল আলম বলেন, শিক্ষকদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। এবারের ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ অভিভাবকদের দোষ বেশী। কারণ
তার নিজের ছেলেও ঠিকভাবে কলেজে যায় না। ঘুম থেকে উঠে দিনের ১১ টায়। কিছু বললে চোখ রাঙ্গিয়ে দেখে তার দিকে। সে অসহায়। চোরাকারবারে জড়িয়ে সব শেষ।
চোরাবারবারে জড়িত একছাত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায়, তার পরিবার খুবই গরীব। পরিবারের লাগাম টেনে ধরতে সে চেরাকারবারে জড়িয়ে পড়েছে। শুধু সে নয় শতশত ছাত্র সীমান্ত চোরাকাবারে জড়িয়ে কলেজ ও মাদরাসা ফাঁকি দেয়। পরীক্ষাও দেয়। পড়া- লেখা না করে পরীক্ষা দিলে তো ফেল করবেই।
সাবেক প্রধান শিক্ষক মৌলানা নূরুল হক বলেন, এসএসসি ও এইচএসসির ফলাফল ভাল করতে শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে হবে। চোরাকারবার বন্ধ করে সন্ধ্যার পর শিক্ষার্থীদের বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা করতে হবে। মোবাইলের বিষয়ে অভিভাবক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কঠোর হতে হবে। প্রাথমিক স্তরে গণিত, ইংরেজিতে আরো ভাল না করলে বাচ্চারা উপরে গিয়ে পড়তে চায় না। এ সবের পর ফলাফল বিপর্যয় ঠেকানো যাবে। নচেৎ দেশের এ পূর্বসীমান্তে শিক্ষায় ধস নামবে।