টানা নবম দিনের মতো ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। এর প্রেক্ষিতে কক্সবাজারসহসহ চট্টগ্রামের ৫ টি জেলায় ভূমিধসের সতর্কতা জারি করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। চলতি বর্ষায় পাহাড় ধসের কারণে মাটি চাপায় ২৬ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও তা পাত্তাই দিচ্ছে না পাহাড়ে বসবাসরত পরিবারগুলো। জেলা প্রশাসনের মাইকিং, প্রচারণা, কঠোর নির্দেশনা সত্ত্বেও কিছুতেই পাহাড় থেকে সরানো যাচ্ছে না জেলার শতাধিক পয়েন্টে বসবাসরত ৫ শতাধিক পরিবারকে। প্রতি বছর বর্ষা এলে বাড়ে পাহাড় ধসের ঘটনা। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গৃহিত নিরাপদে সরানোর কোন টনিকই কাজ করছে না তাদের উপর। গেল ৯ দিনের টানা বৃষ্টিতে ইতোমধ্যে প্লাবিত হয়েছে নিম্নাঞ্চলের ৫০টির বেশি ইউনিয়ন। পাহাড়ে বসবাস অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হলেও কিছুতেই থামানো যাচ্ছেনা এই ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস।
জেলা প্রশাসক মোঃ আ: মান্নান বলছেন, পাহাড়ে বসবাসরত পরিবারকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে উপজেলা নির্বাহী অফিসারগণকে নির্দেশনা প্রদান করার পর তারা মাঠে নেমেছেন। প্রশাসনের নির্দেশ অমান্য করে যারা ঝুঁকিপূর্ণভাবে পাহাড়ে জোরপূর্বক বসবাস করবেন তাদের যে কোনভাবেই পাহাড় থেকে সমতলে নিরাপদ আশ্রয় নিয়ে আসার জন্য কাজ করে চলছেন জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। নির্দেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কথা ও বলেছেন তিনি। ইতোমধ্যে শতাধিক পরিবারকে নিরাপদ আশ্রয় নিয়ে আসা হয়েছে বলেও জানান জেলা প্রশাসক।
প্রবল বর্ষণের কারণে সৃষ্ট বন্যায় ইতিমধ্যে জেলার বেশিরভাগ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ফলে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নগদ ৩০ লক্ষ টাকা এবং ৪শ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
শহরে জেলা প্রশাসনের চিহ্নিত ঝুকিপূর্ণ পাহাড় ধস প্রবণ এলাকার মধ্যে অন্যতম হলো সৈকত পাড়া, বাচা মিয়ার ঘোনা, কলাতলি, হিমছড়ি, বৈদ্যঘোনা, পাহাড়তলী, লাইটহাউজ পাড়া, ঝরজরির কুয়া, চন্দ্রিমা, বাস টার্মিনাল, ইসলামাপুর, একান্ন একরের পাহাড়ি এলাকা। শুধু শহরের এসব এলাকার পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করছে অর্ধলক্ষাধিক মানুষ। তারা মানতে চায়না সরকারি নির্দেশনা। মৃত্যু ঝুঁকি থাকলেও পাহাড় ছাড়তে নারাজ তারা।
জেলা তথ্য অফিসার মোঃ আব্দুস সাত্তার জানান -জেলা প্রশাসকের নির্দেশে আমরা বেশ কয়েকদিন পাহাড়ে বসবাসরত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং, লিফলেট এমনকি সচেতনতামূলক নানা কার্যক্রম গ্রহণ করলেও খুব কম সংখ্যক মানুষ পাহাড় থেকে সরে এসেছে। ফলে গত নয় দিন যেভাবে বৃষ্টি হচ্ছে এভাবে চললে বড় পরিসরে পাহাড় ধসের আশঙ্কা রয়েছে। সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করার পরও পাহাড় দখলকারীরা সরে যেতে চায়না। বিশেষ করে শহরের অভ্যন্তরের পাহাড়গুলোতে বসবাসকারীরা কিছুতেই পাহাড় ছাড়তে চায়না। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মত বড় পরিসরে প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে প্রবল বর্ষণের এই মৌসুমে। প্রতিদিনই জেলা তথ্য অফিসের পক্ষ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসরতদের সরে যেতে বলা হচ্ছে কিন্তু কার কথা কে শুনে।
জানা যায় , চলতি বর্ষার আগে পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের চিহ্নিত করা হলেও নিরাপদে সরানো হয়নি। অনেক প্রভাবশালী পাহাড় দখল করে বিক্রি করছে সরকারি পাহাড়ের দখলস্বত্ব। বর্ষা আসার পর থেকে বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়কাটার ধুম চলছ। এর ফলে ঘটছে পাহাড় ধসের ঘটনা। অনেকে জমির বন্দোবস্ত হওয়ার আশায় পাহাড়ে বসবাস ছাড়তে চাচ্ছে না বলে জানান একাধিক সূত্র।
জেলা প্রশাসনের দেয়া তথ্য মতে, বিগত ২ দশকে পাহাড় ধসে ৩২৬ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ পাহাড় ধস হয় ২০১০ সালের ১৫ জুন। এদিন রামু উপজেলার হিমছড়ি এলাকার ১৭ ইসিবি সেনা ক্যাম্পের ৬ সেনাসদস্যসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধসে প্রায় ৬২ জন প্রাণ হারায়। ২০০৮ সালের ৪ ও ৬ জুলাই টেকনাফে ফকিরামুরা ও টুইন্যার পাহাড় ধসে একই পরিবারের চারজনসহ ১৩ জন, ২০১২ সালে ২৬ ও ২৭ জুন পাহাড় ধসের ঘটনায় ২৯ জন। ২০০৯ সালে চকরিয়া, উখিয়া ও রামুতে ৫ জন, ২০১১-১৩ সালে পাহাড় ধসে মারা যায় ১৯ জন। ২০১৫ সালে শহরের রাডারের পাহাড় ধসে ৫ জন। ২০১৬ সালে ১৭ জন ও ২০১৭ সালে ২৬ জন। ২০১৮ সালের ২৫ জুলাই শহরের দক্ষিণ রুমালিয়ারছড়ার বাঁচামিয়ার ঘোনা এলাকায় ২৮ জন, ২০১৯ সালে ২২ জন, ২০২০ সালে ১৫ জন, ২৭, ২৮ জুলাই ২ দিনে মারা যায় ১৪ জন। ২০২২ সালে ২৫ জন। সর্বশেষ গত বছর বর্ষার রামু টেকনাফে পাহাড় ধসে মারা যায় ৫ জন। এ পর্যন্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড় ধসে মারা যায় ২৮ জন।
জেলা প্রশাসনের ত্রাণ ও পূর্ণবাসন কর্মকর্তা মো: আজাদ রহমান জানান- কক্সবাজারে বন্যার চরম অবনতি ঘটেছে। সরকারের পক্ষ থেকে ত্রাণ তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। ইতিমধ্যে নগদ ৩০ লক্ষ টাকা এবং ৪০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য। সংশ্লিষ্ট উপজেলায় বরাদ্দ পৌঁছে দেওয়ার পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং তাদের প্রতিনিধির মাধ্যমে ওই ত্রাণ তৎপরতা চলমান রয়েছে। তিনি বলেন, পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরতদের সরাতে নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে ঝুকিপূর্ণ পাহাড় থেকে বসবাসকারীদের সরাতে। কক্সবাজার পৌরসভার পক্ষ থেকে চলছে মাইকিং ও সরানোর নানা পদক্ষেপ। কিন্তু বাড়ি ছেড়ে বসবাসকারীরা নিরাপদে সরতে চাইনা। ফলে ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। শহরে ১২ স্পটের পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী প্রায় লক্ষাধিক মানুষকে নিরাপদে সরে যেতে নেয়া পদক্ষেপ যে কোন ভাবে বাস্তবায়ন করা হবে বলে তিনি জানান।