একদিকে বসন্তের আগমনী হাওয়া, অন্যদিকে শীতের বিদায়-ফাল্গুনের শুরুতেই ভালোবাসা দিবসের আবহে মুখর সৈকত শহর কক্সবাজার। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরও প্রিয়জন ও পরিবার নিয়ে নোনাজল আর বালুচরে ভালোবাসার রঙে রাঙাতে ছুটে এসেছেন ভ্রমণপিপাসুরা।
তবে প্রত্যাশিত পর্যটক সমাগম না হলেও আসন্ন রমজানকে সামনে রেখে ৫’শতাধিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ছাড় দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
পয়লা ফাল্গুন আর বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের রঙ লেগেছে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে। বিশেষ দিবসকে ঘিরে দেশের দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে এসে ভ্রমণপিপাসুরা।
শীতের বিদায়, তাই সূর্যের খরতাপ একটু বেশি। এর মাঝেও সমুদ্রস্নান, জেড স্কী, ঘোড়ায় চড়া বা বালিয়াড়িতে বসে সমুদ্র দেখাসহ মুহূর্তগুলো রঙিন করছে ভ্রমণপিপাসুরা। কেউ প্রিয়জন, মা-বাবা আবার কেউ বন্ধুদের সঙ্গে এসেছেন সাগরতীরে।
ভ্রমণে আসা চিকিৎসক ইতিয়াজ নুর বলেন, “যখন প্রিয় মানুষ পাশে থাকে, তখন যেকোনো মুহূর্তই স্পেশাল হয়ে যায়। কক্সবাজার তো এমনিতেই সুন্দর, কিন্তু প্রিয়জন সাথে থাকলে সেই সৌন্দর্যটা আরও বেশি অনুভব করা যায়। সাধারণত এখানে অনেক বেশি মানুষ থাকে, বিশেষ করে সুগন্ধা বিচ আর লাবণী বিচ সব সময়ই ওভার ক্রাউডেড থাকে। আমরা এই ভিড় দেখতেই অভ্যস্ত। কক্সবাজারের আসল রূপ যেন এই জমজমাট পরিবেশেই। কিন্তু এখন মানুষ একটু কম। তাই সবকিছু খুব শান্তভাবে, চোখ ভরে উপভোগ করা যাচ্ছে। সমুদ্র, আকাশ, বাতাস-সবকিছু যেন আরও পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছে। এই শান্ত পরিবেশটাও সত্যিই খুব ভালো লাগছে।”
আরেক পর্যটক রিয়াজ হায়দার বলেন, “আমি দেশের বাইরে থাকি। অনেকদিন পর দেশে এসে ফ্যামিলি নিয়ে কক্সবাজারে আসার সুযোগ পেলাম। সত্যি বলতে পরিবেশটা দেখে আমি খুব মুগ্ধ। দিনের বেলায় আসার সুযোগ খুব কম হয়, কিন্তু আজকে ফ্যামিলি, বাচ্চা সবাইকে নিয়ে সকালে বিচে আসলাম। সকালের এই সমুদ্রের দৃশ্যটা আসলে অসাধারণ সুন্দর। ”
ভ্রমণে আসা পর্যটক রুবাইয়া রহমান বলেন, “কক্সবাজারে আসতে একটু কষ্টই হয়েছে, পথটা সহজ ছিল না। কিন্তু এখানে এসে এত সুন্দর একটা ভিউ দেখার পর সব কষ্ট ভুলে গেছি। মনটা সত্যিই অনেক ভালো হয়ে গেছে। আজ আবার ১৪ ফেব্রুয়ারি-ভালোবাসা দিবস। তাই পুরো বিষয়টা আরও বেশি স্পেশাল হয়ে গেছে। সমুদ্রের পাশে প্রিয়জনের সাথে এই দিনটা কাটাতে পারছি-এটা সত্যিই অনেক বেশি উপভোগ করার মতো একটি মুহূর্ত। আজকের দিনটা আমার জন্য খুবই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।”
গত ১২ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি দূরপাল্লার যান চলাচল। ফলে কাঙ্ক্ষিত সংখ্যায় পর্যটক না আসায় কিছুটা হতাশ সৈকতপাড়ের ব্যবসায়ীরা। তবে নতুন সরকার গঠনের পর পর্যটক সমাগম বাড়বে-এমন আশায় বুক বেঁধেছেন তারা।
শামুক-ঝিনুক ব্যবসায়ী রহিম উদ্দিন বলেন, “ভালোবাসা দিবসে একটু হলেও হতাশ। কারণ নির্বাচনের সময়টাতে পর্যটকের সংখ্যা স্বাভাবিকভাবেই অনেকটা কমে গেছে। বেশিরভাগ মানুষ নিজ নিজ এলাকায় ফিরে গেছেন, ফলে পর্যটন খাতে কিছুটা স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। তবে এখন নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে, নতুন পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে-এই আশাই করছি।”
আরেক ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম বলেন, “খুব শিগগিরই স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে, মানুষের মধ্যে আবার আনন্দ, স্বস্তি ও ভ্রমণের আগ্রহ বাড়বে। আশাবাদী, ঈদের পর থেকে ব্যবসা আবার ভালো হবে এবং এই পর্যটন মৌসুম মোটামুটি ভালোই যাবে। মানুষ আবার দল বেঁধে ঘুরতে আসবে, সবার মুখে হাসি ফিরে আসবে-এই প্রত্যাশাই রাখছি।”
এদিকে পর্যটক আকর্ষণে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে হোটেল কর্তৃপক্ষ। আসন্ন রমজান উপলক্ষে কক্সবাজারের হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টে থাকছে সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়।
হোটেল প্রাসাদ প্যারাডাইসের সুপারভাইজার মো: নাছির উদ্দিন বলেন, ‘বর্তমানে ভালোবাসা দিবসের পরই সামনে পবিত্র রমজান মাস। পাশাপাশি আমাদের নির্বাচন পর্ব শেষ হয়েছে এবং নতুন সরকার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে-সব মিলিয়ে চারদিকে এক ধরনের ব্যস্ততা চলছে।’
‘রমজান মাসে সাধারণত গেস্ট তুলনামূলক কম থাকে। তবে আমাদের পক্ষ থেকে থাকছে বিশেষ আকর্ষণীয় অফার ৫০% থেকে ৬০% পর্যন্ত বিশেষ ছাড় থাকবে পুরো রমজান মাস জুড়ে। আশা করি, রমজানের পর আবারও ব্যবসা জমে উঠবে, নতুন গেস্ট আসবেন এবং সবাই মিলে আমরা সুন্দর সময় কাটাতে পারবো।’
মেরিন ড্রাইভ হোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, “নির্বাচনের কারণে পর্যটকের আগমন কম। সামনে রমজান, এই রমজানে পর্যটকরা কক্সবাজার আসতে পারবে। তখন খরচ অনেক থাকবে। যেমন হোটেল আকার ভেদে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় থাকবে। ফলে পর্যটকরা চাইলে সর্বনিম্ন ১ হাজার টাকার মধ্যে হোটেল ভাড়া পাবে। আশা করি-আগামীতে পর্যটকের আগমন বাড়বে।”
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত এলাকায় পর্যটকদের নিরাপত্তায় সার্বক্ষনিক দায়িত্ব পালন করছে ট্যুরিস্ট পুলিশ ও লাইফ গার্ড কর্মীরা।