কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীতে সেন্টমার্টিনগামী একটি জাহাজে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। জাহাজটির নাম ‘এমভি আটলান্টিক ক্রুজ’। এ ঘটনায় জাহাজের এক কর্মচারীর নিহত হয়েছেন। এছাড়াও জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ক্রুসহ ১৫ জনকে।
শনিবার সকাল ৬টা ৩০ মিনিটের দিকে কক্সবাজার সদরের নুনিয়াছটার বিআইডব্লিউটিএ জেটি ঘাটে আগুনের এ ঘটনা ঘটে। পরে ফায়ার সার্ভিসের ৪টি ইউনিট বেলা ১১টা ৩০ মিনিটের দিকে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনে।
জাহাজমালিকদের সংগঠন ‘সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের’ সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর আগুনের ঘটনা নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, এমভি আটলান্টিক ক্রুজ প্রতিদিন প্রায় দুই শতাধিক পর্যটক পরিবহন করে আসছে। সকালেও সেন্টমার্টিনে যাত্রী নেওয়ার উদ্দেশ্যে জেটিঘাটে ভেড়ার চেষ্টা করছিল জাহাজটি। এ সময় জাহাজটিতে আগুন ধরে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো জাহাজে আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
হোসাইন ইসলাম বাহাদুর আরও বলেন, সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে যাত্রার মাত্র ১৫ মিনিট আগে জাহাজটিতে আগুন লেগেছে। এই দুর্ঘটনা আর কিছুক্ষণ পরে ঘটলে ভয়াবহ বিপদ হতে পারত।
কক্সবাজার ফায়ারসার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, জাহাজের কর্মচারী নুর কামালের (৩৫) পুড়ে যাওয়া মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, যিনি একটি কক্ষে ঘুমাচ্ছিলেন। আর কেউ আছেন কিনা খোঁজা হচ্ছে, আগুন লাগার কারণ এখনো নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না। তবে জাহাজের দায়িত্বরত জানিয়েছে ইঞ্জিন রুমে শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত।
জাহাজে আগুন ধরার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নানসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। জেলা প্রশাসক বলেন, বড় বিপদ থেকে পর্যটকেরা রক্ষা পেলেন। জাহাজে আগুন লাগার কারণ অনুসন্ধান করা হচ্ছে। এ ঘটনায় ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে সকল জাহাজের কর্তৃপক্ষকে নিয়ে বিকেলে বৈঠক করা হবে।
জাহাজ পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক ও কক্সবাজার সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা তানজিলা তাসনিম বলেন, ‘জাহাজটির পুরোটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আগুন লাগার সময় জাহাজে কোনো পর্যটক ছিলেন না। ওই জাহাজের পর্যটকদের অন্য জাহাজে করে সেন্টমার্টিন পাঠানো হয়েছে।’
আটলান্টিক ক্রুজে আগুন লাগায় জেটিঘাটে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক দেখা দেয়। ঢাকার যাত্রাবাড়ীর ব্যবসায়ী ও জাহাজটির যাত্রী মীর আসলাম বলেন, চার দিন আগে তিনি আটলান্টিক ক্রুজের টিকিট কেটেছেন। স্ত্রী ও এক মেয়েকে নিয়ে জাহাজে ওঠার জন্য জেটিঘাটে অপেক্ষায় ছিলেন। এ সময় দেখতে পান ঘাটের দিকে ভিড়তে থাকা জাহাজটিতে আগুন লেগেছে। তিনি বলেন, ‘আল্লাহ আমাদের বড় বিপদ থেকে রক্ষা করেছেন। একটু পর এই দুর্ঘটনা হলে সবাই বিপদে পড়তাম।’
জানা গেছে, সকাল ৭টায় শহরের নুনিয়াছটা বিআইডব্লিউটিএ জেটিঘাট থেকে প্রায় দুই হাজার পর্যটক নিয়ে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে যাত্রা করেছে এমভি কর্ণফুলী এক্সপ্রেস, এমভি বার আউলিয়া, কেয়ারি সিন্দাবাদ, এমভি আটলান্টিকসহ ছয়টি জাহাজ। ১২০ কিলোমিটারের গভীর সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে জাহাজগুলো সেন্ট মার্টিন জেটিঘাটে পৌঁছাবে বেলা দেড়টা নাগাদ। বেলা তিনটার দিকে আগের দিনে যাওয়া পর্যটকদের তুলে জাহাজগুলো আবার কক্সবাজার ফিরে আসবে। এভাবে আগামী ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত টানা দুই মাস পর্যটকদের জন্য সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ ও রাত যাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে। প্রতিদিন দুই হাজার করে পর্যটক সেন্টমার্টিন যেতে পারছেন।
‘সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের’ সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর বলেন, ‘আজ ১ হাজার ৯৯৩ জন যাত্রী নিয়ে পাঁচটি জাহাজ সেন্টমার্টিন গেছে।’
সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, গত ১ নভেম্বর থেকে সেন্ট মার্টিন পর্যটকদের ভ্রমণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। কিন্তু রাত যাপনের ব্যবস্থা না থাকায় এবং জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় নভেম্বর মাসে একজন পর্যটকও দ্বীপ ভ্রমণে যেতে পারেননি।
গত নভেম্বর মাসে পর্যটকদের শুধু দিনের বেলায় দ্বীপ ভ্রমণের সুযোগ রাখা হয়েছিল, রাত যাপন করার সুযোগ ছিল না। তবে ডিসেম্বর ও জানুয়ারি দুই মাস রাত যাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে। সরকারি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বিআইডব্লিউটিএ এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া সেন্ট মার্টিন দ্বীপে কোনো নৌযান চলাচল করতে পারবে না। পর্যটকদের অবশ্যই বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের স্বীকৃত ওয়েব পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইনে টিকিট কিনতে হবে। সেখানে প্রতিটি টিকিটে ট্রাভেল পাস এবং কিউআর কোড সংযুক্ত থাকবে। কিউআর কোড ছাড়া টিকিট নকল হিসেবে গণ্য হবে।