শীতের বিকেলে ভাপা পিঠার ধোঁয়া, খেজুর গুড়ের মিষ্টি ঘ্রাণ আর শিশুদের হাসিতে মুখর হয়ে উঠেছিল কক্সবাজারের সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র। নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে সমাজের একসময়কার সুবিধাবঞ্চিত, ঝুঁকিতে থাকা ও পথশিশুদের নিয়ে বর্ণিল আয়োজনে এখানে অনুষ্ঠিত হয়েছে বাঙালিয়ানার পিঠাপুলি উৎসব।
সোমবার (৫ জানুয়ারি) বিকাল ৪টায় কেন্দ্র প্রাঙ্গণে দিনব্যাপী এই আয়োজন শুরু হয়। শিশু বরণ থেকে শুরু করে পিঠাপুলি উৎসব, বই বিতরণ, শীতবস্ত্র ও কম্বল প্রদান, কৃতি শিক্ষার্থীদের পুরস্কার, সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা, তাঁবু জলসা ও বিশেষ নৈশভোজ—সব মিলিয়ে ছিল আনন্দ ও আবেগে ভরপুর এক ব্যতিক্রমী আয়োজন।
উৎসবের শুরুতেই কেন্দ্রের নিবাসী শিশুদের ফুল দিয়ে বরণ করেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ইমরান হোসাইন সজীব। শিশুদের উচ্ছ্বাস আর হাসিমুখে মুহূর্তেই প্রাণ ফিরে পায় পুরো কেন্দ্র প্রাঙ্গণ।
কক্সবাজার জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক হাসান মাসুদের সভাপতিত্বে এবং সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রের উপপ্রকল্প পরিচালক জেসমিন আকতারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করেন নিবাসী শিশু মো. তাসিন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটবৃন্দ, জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফা, জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আব্দুল আওয়াল, শহর সমাজসেবা কর্মকর্তা সাজিয়া আফরিন, মুক্তি কক্সবাজারের প্রধান নির্বাহী বিমল চন্দ্র দে সরকার, বিশিষ্ট সমাজসেবক আবুল কালাম চৌধুরীসহ বিভিন্ন সামাজিক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা।
পিঠাপুলিতে ফিরল গ্রামবাংলার ঐতিহ্য
উৎসবের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল পিঠাপুলি উৎসব। শীতের আমেজে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য তুলে ধরতে কেন্দ্র প্রাঙ্গণে স্থাপন করা হয় পাঁচটি পিঠাশালা-‘হিমছড়ি’, ‘দরিয়ানগর’, ‘সোনাদিয়া দ্বীপ’, ‘কুতুবদিয়া বাতিঘর’ ও ‘পাটুয়ারটেক’। এসব পিঠাশালায় ছিল ৮৭ প্রকারের বাহারি পিঠাপুলির সমাহার।
কলা পুলি, ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা, পাটিসাপটা, দুধ পুলি, লবঙ্গ লতিকা, জামাই পিঠা, খেজুর গুড়ের ভাজা পুলি, নকশা পিঠাসহ ঝাল-মিষ্টি নানা ধরনের পিঠার পাশাপাশি পরিবেশন করা হয় দেশীয় খাবার, ভর্তা, পায়েস ও সন্দেশ। শিশুদের সঙ্গে সঙ্গে অতিথিরাও পিঠাপুলির স্বাদে মুগ্ধ হন।
প্রধান অতিথিসহ অন্যান্য অতিথিরা পিঠাশালা পরিদর্শন করেন এবং শিশুদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করেন। পরে প্রধান অতিথি শিশুদের হাতে তৈরি দেয়ালিকা ‘আলোর পথযাত্রী’-এর ত্রয়োবিংশ সংখ্যা উন্মোচন করেন।
বই, শীতবস্ত্র আর সম্মাননায় উজ্জ্বল শিশুদের দিন
আলোচনা সভা শেষে উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় সম্পৃক্ত নিবাসী শিশুদের মাঝে নতুন শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই বিতরণ করা হয়। একই সঙ্গে প্রায় দুই শতাধিক শিশুর হাতে তুলে দেওয়া হয় শীতবস্ত্র এবং জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কম্বল। কৃতি শিক্ষার্থীদের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেন প্রধান অতিথি।
অনুষ্ঠানের শেষভাগে নিবাসী শিশুদের পরিবেশনায় অনুষ্ঠিত হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যনির্ভর নৃত্য ও গানের পরিবেশনা উপস্থিত অতিথিদের আবেগাপ্লুত করে তোলে।
পরে প্রধান অতিথিসহ সবাই শিশুদের সঙ্গে একত্রে পিঠাপুলি ভোজন করেন। সন্ধ্যার পর আকর্ষণীয় তাঁবু জলসা ও আতশবাজিতে উৎসবের রঙ আরও গাঢ় হয়। বিশেষ নৈশভোজের মধ্য দিয়ে দিনের কর্মসূচির সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
অনুষ্ঠান সম্পর্কে সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রের উপপ্রকল্প পরিচালক জেসমিন আকতার বলেন, “নতুন বছরের শুরুতে শীতের মৌসুমে কেন্দ্রের নিবাসী শিশুদের মুখে হাসি ফোটানো এবং তাদের জন্য এক পশলা আনন্দ উপহার দিতেই আমাদের এই আয়োজন।”
উল্লেখ্য, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন সমাজসেবা অধিদফতর পরিচালিত কক্সবাজার সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র ২০১৫ সাল থেকে ঝুঁকিতে থাকা, বিপন্ন ও পথশিশুদের পুনর্বাসন এবং মূল স্রোতধারায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।