আবু সাঈদ নিশান
মধ্যরাতে হাঁটতে হাঁটতে গেলাম গরুর হাটে। হাটে গিয়েই দেখি চারপাশে অসংখ্য গরু। আমি মাঝখানে আর চারপাশে কালা গরু, সাদা গরু, লম্বা গরু, বাইট্টা গরু। এখন কথা হইলো গরুর হাটে তো গরুই থাকবে, বাঘ-ভাল্লুক তো আর থাকবে না। এটা ভাইবা এতো অবাক হওয়ার কি আছে?এক এক করে শুরু করলাম গরু দেখা। সুন্দর সুন্দর সব গরু। মনে মনে ভাবলাম, লাক্স সুপার স্টারের মতো ‘সেরা সুন্দরি’ নির্বাচন করার মতো এই গরুগুলো নিয়ে 'সেরা সুন্দর গরু'র কম্পিটিশন করা গেলে মন্দ হতো না। গাবতলীর হাটের সেরা সুন্দর গরু কিংবা আফতাবনগর হাটের সবচেয়ে দামি গরু। এমন টাইপ কম্পিটিশন। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসতো সেরা গরুর সেই শো দেখতে।
এসব ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ খেয়াল করলাম পুরো হাটে আমি শুধু একা। আর কেউ নাই। এবং গরুগুলা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। এতোক্ষণ যে গরুগুলাকে সেরা সুন্দরির তকমা দিতে চাইলাম সেই গরুগুলাকেই এখন সবচেয়ে ভয়ংকর দেখাচ্ছে। আমি এদিক-সেদিক তাকাতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পরেই দেখলাম আচমকা সব গরুর বাঁধন খুলে যাচ্ছে। কী আজব! হুদাই গরুর বাঁধন খুলে যাচ্ছে কেন?
হঠাৎ দেখি আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই গরুগুলা আমার দিকে তেড়ে আসছে। কী মসিবত! এ কী হচ্ছে? সব গরু আমার দিকে আসছে কেন?
সঙ্গে সঙ্গে কোনো কিছু না ভেবে দিলাম ভৌ দৌড়! আমি দৌড়াই, গরু দৌড়ায়, আমি দৌড়াই, গরুও দৌড়ায়। এইভাবে দৌড়াইতে দৌড়াইতে যখন গাবতলী থেকে মিরপুর আসলাম তখন দেখি কিছু মানুষ মোবাইল, ক্যামেরা, ডিএসএলআর নিয়ে এক পাল গরুসহ আমাকে ভিডিও করছে।
আরেকটু দূরে দেখলাম টিভিতে আমাদের এই দৌড়ানোকে লাইভ দেখাচ্ছে। শুধু তাই না লাইভে এক সুন্দরি রিপোর্টার বলছে, 'প্রিয় দর্শক, আপনারা দেখছেন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো একজন যুবক এক পাল গরু নিয়ে শহরের থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। সে এক অসাধারণ দৃশ্য। আমার কাছে মনে হচ্ছে আমি বোধহয় হলিউডের কোনো অ্যাকশন মুভি দেখছি। যেখানে গরু নিয়ে নায়ক ছুটছে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে।'
হায় খোদা! এই রিপোর্টার কী বলে? আমি চিল্লায়ে চিল্লায়ে বললাম, 'ওরে ভাইরে। আমারে বাঁচান। আমি হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা না, আমি এক পাল গরুর দৌড়ানি খাওয়া হতভাগা যুবক। আমারে বাঁচান।'
ওমা! এ তো দেখি উল্টা কাহিনী। রিপোর্টার আমার কথা শুনে বলতেছে, 'দর্শক এইমাত্র আপনারা দেখলেন হ্যামিলনের গরুওয়ালা এই শহরের মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। আপনারা দ্রুত সরে যান। বিপদ সন্নিকটে। গরু সমাজ তাদের অধিকার আদায়ে আন্দোলনে নেমেছে।'
তারপর সঙ্গে সঙ্গে সবাই পালিয়ে গেলো। আমি আবার একা হয়ে গেলাম। শরীর কাঁপছে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। এদিকে আমি তো আর উসাইন বোল্ট না, গরুর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পার পেয়ে যাবো। ধরা খেয়ে গেলাম। কিন্তু একি! গরুগুলা আমাকে গুতা না দিয়ে সামনে এগিয়ে গেল। আমি থেমে গেলাম। দেখলাম আমার দুই পাশ দিয়ে অসংখ্য গরু ছুটে যাচ্ছে।
দূর থেকে ভেসে আসছে অদ্ভুত এক বাঁশির সুর। এই প্রথম আমি সেই সুর শুনতে পেলাম। বিমোহিত হওয়ার মতো সে বাঁশির সুর।
কিন্তু কে এই বাঁশি বাজাচ্ছে? আর কেনই বা গরুগুলো ছুটছে? তবে কি হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালাই নতুন রূপে ফিরে এসেছে?