কোনো দলের ব্যানারে নয়, কোনো প্রতীক নিয়েও নয়, সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ভোটাধিকার প্রয়োগের আহ্বান নিয়ে এবার পথে নেমেছে ভোটের গাড়ি। জনগণের প্রতি স্বতঃস্ফূর্তভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার এ আহ্বান নিয়ে এই বাহন যাবে দেশের সব জেলা-উপজেলায়। কেননা ভোটাররা যদি তাদের ভোট প্রদানের অধিকার যথাযথভাবে প্রয়োগ করেন, কেবল তাহলেই সম্ভব হবে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন, সম্ভব হবে সংস্কার সাধন ও গণতন্ত্রের পথে অভিযাত্রা। আর সে কারণেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ভোটারদের জন্যে পথে নামিয়েছেন ভোটের গাড়ি।
মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে এই সব সুপার ক্যারাভান পৌঁছে দেবে নির্বাচন ও গণভোট সম্পর্কে নানা তথ্য। সচেতন করবে ভোটাধিকারের গুরুত্ব সম্পর্কে। এজন্য পথে নেমেছে ১০টি ভোটের গাড়ি-এ সময় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সৎ ও যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। দেশবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনি দেশের মালিক। এদেশ আগামী পাঁচ বছর আপনার পক্ষে কে চালাবে- সেটা আপনি ঠিক করুন। আপনার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিন। সৎ ও যোগ্য প্রার্থী বেছে নিন। চিন্তা-ভাবনা করে ভোট দিন। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে দেশের প্রতিটি নাগরিকেরও দায়িত্ব রয়েছে।’
যেগুলো প্রদক্ষিণ করবে দেশের ৬৪টি জেলার ৩০০ উপজেলা। সোমবার রাজধানীতে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা থেকে যাত্রা শুরু হয়েছে এসব ‘ভোটের গাড়ি’ নামের সুপার ক্যারাভানের। ভিডিও বার্তায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই প্রচারাভিযান শুরুর ঘোষণা দেন।
তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ এবং প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব মোহাম্মদ শফিকুল আলম ভোটের গাড়ির ফিতা কেটে যাত্রা উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবা ফারজানা, অতিরিক্ত প্রধান তথ্য অফিসার (প্রেস ও মনিটরিং) ইয়াকুব আলীসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘নিষ্ক্রিয়তা নয়, অংশগ্রহণই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে। সরকার সেই পরিবেশ নিশ্চিত করবে। আপনারা জুলাই সনদের পক্ষে ভোট দিন। গণভোটে হ্যাঁ ভোট জিতলে আগামী বহুদিনের জন্য নির্ধারণ হবে দেশ কোন পথে যাবে।’
নতুন বাংলাদেশ গড়তে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে অধ্যাপক ইউনূস বিশেষভাবে তরুণ সমাজ, নারী ভোটার ও প্রথমবারের মতো হওয়া ভোটারদের এগিয়ে আসতে বলেন। ভয়হীন ও মুক্ত পরিবেশে ভোট দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকারের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি নির্বাচন চাই, যেখানে থাকবে না ভয়, থাকবে না বাধা- থাকবে কেবল জনগণের মুক্ত ও নির্ভীক মতপ্রকাশ। সরকার সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর।’
একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে দেশের প্রতিটি নাগরিকেরও দায়িত্ব রয়েছে উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘ভোটাধিকার কারও দয়া নয়- এটি আমাদের সাংবিধানিক অধিকার। এই অধিকার প্রয়োগের মাধ্যমেই আমরা ঠিক করি, আমাদের ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে। অবাধ, সুষ্ঠ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব।’ তিনি বলেন, ‘চলুন, ভোট দিই নিজের জন্য, দেশের জন্য, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য, নতুন পৃথিবীর জন্য।’
‘ভোটের গাড়ি’ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘এই সুপার ক্যারাভান কেবল একটি গাড়ি নয়, এটি গণতন্ত্রের আনন্দ বাণী বহনকারী বহর। এটি জানিয়ে দেবে, আপনার একটি ভোট কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এটা মনে করিয়ে দেবে নিষ্ক্রিয়তা নয়, অংশগ্রহণই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে।’
তিনি জানান, এবারের নির্বাচনে ভোটারদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি জুলাই জাতীয় সনদের ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। দীর্ঘ ৯ মাস ধরে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে এই সনদ প্রস্তুত করা হয়েছে। জনগণ এই সনদে সমর্থন দিলে দেশের ভবিষ্যৎ দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ ও স্থিতিশীল হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিক্রম করছে। সামনে আমাদের জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের ওপর গণভোট। এই লক্ষ্য সামনে রেখে যাত্রা করেছে ১০টি ভোটের গাড়িÑ সুপার ক্যারাভান। এসব গাড়ি দেশের ৬৪টি জেলা ও ৩০০টি উপজেলায় ঘুরে বেড়াবে। তারা মানুষের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে নির্বাচন ও গণভোট সম্পর্কে তথ্য পৌঁছে দেবে, ভোটাধিকার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করবে এবং গণতন্ত্রের বার্তা ছড়িয়ে দেবে।’ গণতান্ত্রিক এই যাত্রাকে সফল করতে তিনি সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
তথ্য উপদেষ্টা বললেন, মূল লক্ষ্য ভোটারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা : অনুষ্ঠানে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘সরকারের মূল লক্ষ্য গণভোটে বিপুল সংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, যাতে পরিবর্তনের ধারাটি সত্যিকার অর্থেই সূচিত হয়। এবারের গণভোট কেবল কোনো আনুষ্ঠানিক আয়োজনমাত্র নয়; এটি একটি ঐতিহাসিক সুযোগ, যার মাধ্যমে দেশ কীভাবে পরিচালিত ও ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় থাকবে- সে বিষয়ে পরিবর্তনের পথ তৈরি হবে। এ লক্ষ্যেই সরকার দেশব্যাপী ব্যাপক উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।’
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বলেন, ‘এবারের নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। কিছু মহল জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে সরাতে বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছে, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে সংঘটিত সহিংসতায় জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।’ এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সক্রিয়ভাবে কাজ করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, গণভোটের মাধ্যমে সংস্কার কার্যক্রম সফল করতে হলে ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা অপরিহার্য। সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হবে- পরিবর্তন কেন প্রয়োজন এবং এই পরিবর্তন তাদের জীবন ও ভবিষ্যতে কী ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সব জেলা ও উপজেলার জন্য বিস্তারিত প্রচার ক্যালেন্ডার প্রণয়ন করা হবে এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও সমাজের প্রতিনিধিদের সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করা হবে। স্থানীয় সরকার বিভাগ, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে এ প্রচার পরিচালিত হবে।