মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, এডভোকেট
আপিলের অনুষ্ঠানে বিরল অভিজ্ঞতা সম্পর্কে লিখতে গেলে আগে আপিল কি তা বলতে হবে। আপিল মানে কোন রায়ের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ পক্ষ উচ্চ আদালতে যে আপিল দায়ের করেন সে আপিল নয়। আপিল অর্থ মামলা-মোকদ্দমায় জড়িতদের আইন ও অধিকার বিষয়ক সংগঠন, Association of People Involved in Litigations (APIL )।
গত ১ অক্টোবর সংগঠনের এডুকেটিভ প্রোগ্রামের আওতায় আইন ও অভিজ্ঞতা শীর্ষক লেকচার সিরিজের প্রথম পর্ব জামিন সংক্রান্ত আইন ও অভিজ্ঞতা নিয়ে এক ঘন্টার একটি বক্তৃতা পর্ব কক্সবাজার পৌরসভা সম্মেলন কক্ষে বিশিষ্ট আইনবিদ,আইন,বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক যুগ্ন সচিব এবং সচিব মর্যাদার আইন কমিশনের পরামর্শক এ,কে মোহাম্মদ হোসেন এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আপিলের আয়োজক-নেতারা আমাকে জামিনের বিষয়ে প্রচলিত আইন ও আমার অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি লেকচার দেওয়ার অনুরোধ করলে আমি রাজি হই নাই। বার বার অনুরোধ করার পর সম্মত হলাম এই ভেবে যে উকালতি জীবন ৪৫ বছর হয়েছে, বয়সও ৭৩ বছর হয়েছে। এখন মৃত্যু হলে সব অভিজ্ঞতা সাথে নিয়ে কবরে যেতে হবে। আমার অভিজ্ঞতার কথা শুনে কেউ যদি উপকৃত হন, তা তো ভালো। ঠিক আছে অভিজ্ঞতার কথা বলে যাই মনে করে সম্মত হলাম। জামিনের আইন সংক্রান্তে বলতে গেলে তা ১০ মিনিটে সমাপ্ত হবে, বাকী ৫০ মিনিট কি বলবো। যথা সময়ে জামিনের আইন ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে এক ঘন্টা বিশ মিনিট বলার পর মগরিবের আজান হয়ে গেছে। খেয়াল করলাম পিনপতন নিরবতার মধ্যে হলভর্তি শ্রোতারা আমার বাস্তব অভিজ্ঞতালব্ধ বক্তব্য মনোযোগ সহকারে শুনেছেন। ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাসায় এসে চিন্তা করে দেখলাম আমার অভিজ্ঞতার মাত্র ৩০% বলা হয়েছে, প্রায় ৭০% কক্সবাজারের চাঞ্চল্যকর মামলার আমার দেখা প্রকৃত সত্য ও অভিজ্ঞতার কথা এখনো তো না-বলা রয়ে গেছে।
থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাও উপযুক্ত ক্ষেত্রে গ্রেপ্তারকৃত আসামীকে বন্ড সম্পাদন করে জামিনে মুক্তি দিতে পারেন। ফৌজদারী কার্যবিধির ৪৯৬ ধারা অনুযায়ী জামিনযোগ্য অপরাধে অভিযুক্ত কোন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে আনা হলে বা পূর্ব থেকে হাজতে আটক থাকলে বা আদালতে আত্মসমর্পণ করলে তাকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হবে। জামিনযোগ্য অপরাধে জামিন পাওয়া আসামীর অবিচ্ছেদ্য অধিকার। ফৌজদারী কার্যবিধির ৪৯৭ ধারা অনুযায়ী অজামিনযোগ্য অপরাধের ধারার মামলায় যদি আসামীকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপার্দ্দ করা হয় বা আগে থেকেই হাজতে আটক থাকে বা স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেন তবে আদালত আসামীকে জামিনে মুক্তি দিতে পারেন। তবে যদি আসামীকে মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডনীয় অপরাধে দোষী মর্মে বিশ্বাস করার যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকে তবে আদালত আসামীকে জামিনে মুক্তি দিবেন না। তারপরও শর্ত আছে যে, আসামীর বয়স ১৬ বৎসরের কম হলে, মহিলা হলে, অসুস্থ হলে বা অক্ষম হলে আদালত আসামীকে জামিনে মুক্তি দিতে পারেন। ফৌজদারী কার্যবিধির ৪৯৮ ধারা অনুযায়ী দায়রা জজ আদালত বা মহামান্য হাইকোট বিভাগ নিম্নআদালতে জামিন লাভে ব্যর্থ আসামীকে উল্লেখিত শর্তে জামিনে মুক্তি দিবার নির্দেশ দিতে পারেন। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে সেই আইন মান্য করা হয়নি যদিও তিনি মহিলা ও অসুস্থ,অক্ষম হওয়ায় তাঁকে সাহায্য করার জন্য কারাগারে ফাতেমাকে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। দলীয়করণকৃত বা আওয়ামীকরণকৃত আদালতের বিচারপতিরা তা করছেন প্রতীয়মান হয়। নিজেকে দলীয়করণের কারণেই সাবেক প্রধান বিচারপতি খাইরুল হক অনেক মামলায় হাজতে ও বিচারপতি শামশুদ্দিন চৌধুরী মানিক দেশত্যাগ করে পালিয়ে যাওয়ার সময় গ্রেপ্তার হয়ে হাজতে। সাবেক প্রধান বিচারপতি এস,কে সিনহা দেশত্যাগে বাধ্য হয়ে পরে দুর্নীতি মামলায় দন্ডিত হয়েছেন। যা আইনজীবীদের জন্য, দেশবাসীর জন্য খুবই লজ্জার ব্যাপার। কারণ দেশবাসী আদালত ও বিচারপতিদের সর্বোচ্চ সম্মানিত আসনে দেখতে চান। নজিরবিহীনভাবে দলীয়করণ কারণেই এ অসম্ভব সম্ভব হয়েছে। আমরা জনগণ পবিত্র আদালত প্রাঙ্গণকে আবার রাজনীতিমুক্ত, দলীয়করণমুক্ত দেখতে চাই। সব দলের সব নেতারা মিলে তা করে নিজেদের আইনের শাসনের প্রতি বিশ্বাস, দেশপ্রেম ও গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার প্রতি প্রকৃত আস্থার প্রমাণ দিন।
মামলার বিচার দীর্ঘায়িত হওয়ার প্রধান কারণ মিথ্যা মামলা বা সত্য মামলায় মিথ্যাভাবে নির্দোষ অনেক মানুষকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বা হয়রানী করার কুমানসে আসামী করা। খাইরুল আমিন হত্যা মামলা নিস্পত্তি হতে ৩০ বছর কেন লেগেছে,কেন মাত্র ৪জনের যাবজ্জীবন কারাদন্ড হল,কেন ২৯জনকে আসামী করা হয়েছিল। বর্তমানে বিচারাধীন এসটি ৮৪/১৯৯৮ নম্বর হত্যা মামলাটি ৩০ বছরেও নিস্পত্তি হলো না। এ মামলায় মোট ৩৬জন আসামীর মধ্যে ইতিমধ্যেই ২০জন আসামীর মৃত্যু হয়েছে। তারা ন্যায় বিচার দেখে যেতে পারলেন না। অভিযোগপত্রের ৩১জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ১১জনের সাক্ষ্যজেরা হয়েছে। তিন জন আসামী ঘটনা করলে তাদের দ্রুত বিচার ও শাস্তি চেয়ে মামলা না করে ৩৩জনকে আসামী করে হয়রানী বা প্রতিপক্ষকে কষ্ট দেওয়ার হীন মানসিকতা ও প্রবণতা থেকে বের হয়ে আসার জন্য ন্যায় বিচারের স্বার্থে, মামলা দ্রুত নিস্পত্তির স্বার্থে ও জনস্বার্থে নবগঠিত আপিল সভা-সমাবেশ করে জনমত গঠন করতে পারে। আগামী পর্বে নাকি নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্তে এক ঘন্টা অভিজ্ঞতালব্ধ বক্তব্য দেওয়ার জন্য একজন সিনিয়র দেওয়ানী আইনজীবীকে অনুরোধ করা হবে। আশা করি আমি নিজেও সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য শুনবো ইনশাল্লাহ। শুধু বই পড়ে কোন সিনিয়র আইনজীবীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতালব্ধ ঘটনা পাওয়া যাবে না। এখন আইনজীবী সমিতি থেকে শুরু করে দেশের সর্ব ক্ষেত্রে উগ্র দলীয়করণের প্রতিযোগিতার কারণে সমাজের র্নিদলীয় অভিজ্ঞ আইনজীবী বা র্নিলোভ মানুষগুলো উপেক্ষিত হচ্ছেন। আমি অনুষ্ঠানে গিয়ে দেখলাম আমাকে ফুলের তোড়া দিয়ে গ্রহন করা হয়েছে,বক্তব্য শুরুর আগে অধ্যাপক দিলোয়ার চৌধুরী আমার জীবনী পাঠ করে শ্রোতাদের আমাকে পরিচয় করে দিয়েছেন। অনুষ্ঠান শেষে আমাকে সভার মাননীয় সভাপতি আমার হাতে ক্রেস্ট দিয়ে সম্মানিত করেছেন। যেন প্রবীণ দিবসে আমার মত উপেক্ষিত একজন প্রবীণকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে। সভাপতি আমাকে ক্রেস্ট দেওয়ার সময় বললেন,বইপুস্তকের বাইরে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ যে কথা শুনতে চিয়েছিলাম আজকে কক্সবাজার এসে তা শুনে সন্তোষ্ট হয়েছি। আমাকে সম্মানিত করার জন্য আমি আপিলকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন আপিলের সাধারণ সম্পাদক,বাচিক শিল্পী ও এডভোকেট নুর মোহাম্মদ। উপস্থিত ছিলেন আপিলের সহসভাপতি মোজাহেরুল হক,সহসভাপতি ও সিনিয়র সাংবাদিক মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম,কলাতলী সমাজ কমিটির সভাপতি নুরুল ইসলাম, ফ্যাসিস্ট আমলে ১১টি মিথ্যা মামলায় জর্জরিত ও সর্বশান্ত কবি ও বিএনপি নেতা রুহুল কাদের বাবুল,সাবেক জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ নাছির উদ্দিন,সিনিয়র আইনজীবী আব্দুল কাইয়ুম,আপিলের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আব্দুল মাবুদ রাজন,এডভোকেট তৌহিদুল এহেছানসহ অনেক আইনজীবী, শিক্ষানবিশ আইনজীবী,আইন শিক্ষার্থী,মামলা-মোকদ্দমায় জড়িত ব্যক্তিবর্গ এবং বিভিন্ন পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে সংক্ষিপ্ত স্বাগত বক্তব্যে কক্সবাজারের কৃতি সন্তান ও আপিলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এ কে মোহাম্মদ হোসেন বলেন,আইন ও বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিচারপ্রার্থী,আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনের যথাযথ অনুসরণের মাধ্যমে আইনী প্রতিকার পাওয়ার বিষয়টি সহজ করার লক্ষ্যেই আপিলের এডুকেটিভ প্রোগামের বা শিক্ষামূলক কর্মসুচীর আওতায় এ লেকচার সিরিজের আয়োজন করা হয়েছে। অভিজ্ঞতা বিনিময় পর্বে মামলা পরিচালনার বাস্তব সমস্যা,বিচারপ্রার্থীদের অধিকার,ন্যায় বিচারে প্রবেশাধিকার,বিচারপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসুত্রিতা এবং আইনগত সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে আপিলের কর্মসূচী গ্রহন ও অব্যাহত রাখা হবে। উপস্থিত সকলে আপিলের পথচলা ও উদ্দেশ্যগুলোর সফলতা কামনা করছেন।