ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটিতে পর্যটন রাজধানী কক্সবাজারে নেমেছে মানুষের ঢল। বাস, ট্রেন ও বিমানে করে দুর-দুরাত্ন থেকে ছুটে এসেছেন হাজারো পর্যটক। সকাল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সৈকতজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে জনসমুদ্র। কলাতলী, লাবণী, সুগন্ধা ও সি-গাল পয়েন্ট-সবখানেই যেন মানুষের মেলা। সমুদ্রের নোনাজল আর ঢেউয়ের উচ্ছ্বাসে মেতে উঠেছেন লাখো মানুষ। যেন ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকতজুড়ে পা ফেলারও জায়গা নেই।
সোমবার সকালে সরজমিনে দেখা যায়-প্রচণ্ড গরমের মাঝে নোনাজলে প্রশান্তি খুঁজছেন ভ্রমণপিপাসুরা। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর-নোনাজলে সবাই আনন্দে মেতে উঠেছেন সমুদ্রস্নানে। কেউ হাঁটুসমান পানিতে দাঁড়িয়ে ঢেউ উপভোগ করছেন, কেউবা কোমরসমান পানিতে গোসলে ব্যস্ত। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে স্মরণীয় মুহূর্তগুলো ধরে রাখতে মুঠোফোনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করছেন পর্যটকেরা।
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক রাবেয়া রহমান বলেন, “আলহামদুলিল্লাহ, আজকের আবহাওয়া খুবই মনোরম। সকালে বৃষ্টির ভাব থাকায় তাপমাত্রাও তুলনামূলক কম ছিল। প্রচণ্ড রোদ ও গরমের মধ্যে ঘোরাঘুরি করলে অনেক কষ্ট হয়, কিন্তু আজকের শীতল পরিবেশে সমুদ্রসৈকতে ঘুরে বেশ স্বস্তি পেয়েছি। ঠান্ডা আবহাওয়া, সাগরের সৌন্দর্য আর মনোরম পরিবেশ-সব মিলিয়ে সময়টা দারুণ উপভোগ করছি। আলহামদুলিল্লাহ, খুব ভালো লাগছে।”
পর্যটক রোকেয়া বেগম বলেন, “সাগরের টান এতোই ভালো লাগে যে, মন চাই সবসময় যেন কক্সবাজারে ছুটে আসি। এখন ঈদের ছুটিতে এসেছে খুই ভালো লাগছে।”
পর্যটক রফিকুল মাহমুদ বলেন, “কক্সবাজারে এসে সত্যিই দারুণ লাগছে। সমুদ্রের আকর্ষণ অন্য যেকোনো পর্যটনস্থানের চেয়ে আলাদা। আমি প্রায় প্রতি বছরই একাধিকবার এখানে আসার চেষ্টা করি। দেশের বিভিন্ন পাহাড়ি ও দর্শনীয় স্থানে ঘুরেছি, কিন্তু সমুদ্রের টান আমাকে বারবার কক্সবাজারে নিয়ে আসে। মাত্র তিন মাস আগে সহকর্মীদের সঙ্গে এসেছিলাম, আর এবার ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটিতে পরিবার-পরিজনকে নিয়ে এসেছি। প্রায় ৭ দিনের এই ছুটি বেশ আনন্দের সঙ্গে কাটছে। সমুদ্রের সৌন্দর্য, নির্মল পরিবেশ এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ-সব মিলিয়ে অসাধারণ উপভোগ করছি।”
শুধু গোসল নয়, সৈকতের বালুচরে বিনোদন ব্যবস্থাও জমে উঠেছে পর্যটকদের ভিড়ে। পর্যটকেরা ঘোড়ার পিঠে চড়ে কিংবা বিচ বাইকে ঘুরে বেড়াচ্ছেন সৈকতের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। অন্যদিকে দ্রুতগতির জেট-স্কিতে চড়ে অনেকেই ছুটে যাচ্ছেন সাগরের গভীরের দিকে। সারিবদ্ধ চেয়ার-ছাতাগুলোতেও বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন ভ্রমণপিপাসুরা।
সাভার থেকে আসা পর্যটক সিয়াম মাহামুদ বলেন, “ঈদের ছুটিতে বন্ধুদের সঙ্গে কক্সবাজারে এসে দারুণ সময় কাটাচ্ছি। সমুদ্রসৈকতে ঘোড়ায় চড়েছি, বিচ বাইকে ঘুরেছি, জেড স্কীতে ভ্রমণ করেছি এবং সমুদ্রে গোসলও করেছি। প্রতিটি মুহূর্তই ছিল আনন্দময়। বন্ধুদের সঙ্গে একসঙ্গে ঘুরে বেড়ানো এবং সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করার অভিজ্ঞতা সত্যিই অসাধারণ। সব মিলিয়ে ছুটিটা খুব ভালো কাটছে।”
পর্যটক রাফিয়া করিম বলেন, “ঢাকার ব্যস্ততা, যানজট আর প্রতিদিনের একঘেয়ে জীবন থেকে কিছুটা স্বস্তি পেতেই আমরা কক্সবাজারে আসি। ঈদের ছুটিতে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য এটি আমাদের অন্যতম প্রিয় গন্তব্য। এখানে এসে বিশুদ্ধ বাতাস, সমুদ্রের মনোমুগ্ধকর পরিবেশ এবং প্রকৃতির সান্নিধ্যে এক ধরনের প্রশান্তি অনুভব করা যায়, যা সত্যিই মনকে সতেজ করে তোলে।
কক্সবাজারের আরেকটি বড় সুবিধা হলো, পরিবার নিয়ে ভ্রমণের জন্য এখানে পর্যাপ্ত হোটেল ও থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। সমুদ্রের অপরূপ দৃশ্য, শীতল বাতাস এবং নির্মল পরিবেশ উপভোগ করতে করতে দৈনন্দিন ব্যস্ততা, স্কুল-কলেজ, কোচিং ও কর্মজীবনের চাপ থেকে কিছুটা মুক্তি পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে এখানে এসে খুবই ভালো লাগছে এবং ছুটির সময়টা দারুণ উপভোগ করছি।”
তবে পর্যটকদের এই আনন্দ-উল্লাসের মধ্যেই বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে সমুদ্রস্নানে নিরাপত্তার বিষয়টিকে। আর পর্যটকের চাপ বাড়লেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাঠে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
সী-সেইফ লাইফগার্ড সংস্থার ইনচার্জ মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, “বৃষ্টির কারণে আবহাওয়ায় কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও সমুদ্র বর্তমানে বেশ উত্তাল রয়েছে। ঈদের ছুটিতে সৈকতের তিনটি প্রধান পয়েন্টে লাখো পর্যটকের সমাগম ঘটেছে এবং কয়েক হাজার মানুষ সমুদ্রে গোসল করছেন। এ পরিস্থিতিতে আমাদের সী-সেইফ লাইফগার্ড সদস্যরা তিনটি পয়েন্টেই সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন।
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছি এবং প্রতিনিয়ত মাইকিং ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। আল্লাহর রহমতে এখন পর্যন্ত কোনো দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেনি। আমরা চাই, কোনো পর্যটক যেন সমুদ্রে গোসল করতে নেমে কোনো ধরনের ঝুঁকি বা বিপদের মুখে না পড়েন। সে লক্ষ্যে আমাদের উদ্ধারকর্মীরা সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।”
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার জোনের উপ-পরিদর্শক সুব্রত বাড়ই বলেন, “কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে আগত পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্যুরিস্ট পুলিশ দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করছে। ঈদের চতুর্থ দিনেও বৃষ্টিমুখর আবহাওয়া উপেক্ষা করে সৈকতে বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থীর উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। আমরা সৈকতে আগমনের পর থেকে ফিরে যাওয়া পর্যন্ত পর্যটকদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা দিয়ে থাকি।
পর্যটকরা যেকোনো ধরনের সমস্যায় পড়লে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়।
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে আমাদের তিনটি স্থায়ী পুলিশ পোস্ট রয়েছে, যেখানে ২৪ ঘণ্টা সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া ঈদ উপলক্ষে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পর্যটকরা যাতে নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে তাদের ভ্রমণ উপভোগ করতে পারেন, সে লক্ষ্যে ট্যুরিস্ট পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্কতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।”
ঢেউয়ের গর্জন, মানুষের উচ্ছ্বাস আর ঈদের আনন্দ-সব মিলিয়ে কক্সবাজার এখন এক বিশাল মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্যে উপভোগ্য সময় কাটাচ্ছেন লাখো পর্যটক।