প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে সব ধরনের স্থাপনা নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা, উচ্চ আদালতে রায় এবং দফায়-দফায় উচ্ছেদ-দখলের বস্তিতে রূপ নেয়া কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের বালিয়াড়ি নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় রয়েছে জেলা প্রশাসন।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসন নিয়ন্ত্রিত বীচ ম্যানেজম্যান্ট কমিটির অনুমতি পত্র নিয়ে বালিয়াড়িতে বসানো হয়ে থাকে এসব ঝুঁপড়ি দোকান। আর এসব অনুমতি পত্রের মেয়াদ শেষ হচ্ছে ৩০ জুন। ইতিমধ্যে নানা বির্তকের জেরে গত ১ জুন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের পর্যটন সেলের সহকারী কমিশনার স্বাক্ষরিত এক আদেশে সমুদ্র সৈকতের বালিয়াড়িতে দোকান বসানোর জন্য ইস্যুকৃত কার্ডের মেয়াদ ৩০ জুন শেষ হওয়ার পর নতুন করে নবায়ন না করার সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে।
আদেশ মতে, আর এক সপ্তাহ সময় থাকলেও এব্যাপারে সিদ্ধান্তহীনতায় রয়েছে প্রশাসন।
প্রশাসনের দায়িত্বশীল একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের কক্সবাজার জেলা প্রশাসন নিয়ন্ত্রিত বীচ ম্যানেজম্যান্ট কমিটির বছরে কয়েক কোটি টাকা অনুমতি বাণিজ্য রয়েছে। সৈকতের নানা ধরণের ঝুঁপড়ি দোকান, কিটকট (বীচ ছাতা), ঘোড়া, বীচ বাইক, ওয়াটার বাইক সহ নানা ব্যবসা পরিচালনার বিপরীতে অন্তত সাড়ে ৩ হাজার অনুমতি পত্র ইস্যু করা হয়। যা নিয়ে বছরের পর বছর জুড়ে সৈকতে আইন না মেনে অব্যাহত রয়েছে দখল।
যদিও কক্সবাজার শহরের নাজিরারটেক থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ১২০ কিলোমিটার সমুদ্র সৈকতকে ১৯৯৯ সালে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করেছে সরকার। সৈকতের জোয়ার-ভাটার অঞ্চল থেকে ৩০০ মিটার পর্যন্ত বালিয়াড়িতে যেকোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ ও উন্নয়ন নিষিদ্ধ। বালিয়াড়িতে নির্মিত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের নির্দেশনাও রয়েছে। ফলে সৈকতের এসব ব্যবসা নিয়ে বছরের পর বছর বির্তক আলোচনা চলছে।
এর মধ্যে গত ৯ মার্চ কক্সবাজার জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ এক সপ্তাহের মধ্যে সৈকতের সকল অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নির্দেশ দেন। এর প্রেক্ষিতে ১২ মার্চ জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে যৌথবাহিনী সুগন্ধা পয়েন্টের বালিয়াড়িতে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এক হাজার দোকানসহ বিভিন্ন স্থাপনা উচ্ছেদ করে।
কিন্তু ঈদের আগে ও পরে সৈকতের পুরো বালিয়াড়ি আবারও দখল হয়ে যায়। রূপ নেয় বস্তিতে। এব্যাপারে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর জেলা প্রশাসনের পক্ষে ১ জুন সমুদ্র সৈকতের বালিয়াড়িতে দোকান বসানোর জন্য ইস্যুকৃত কার্ডের নতুন করে নবায়ন না করার সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে।
এ ব্যাপারে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, কার্ড নবায়ন করা হবে না। এব্যাপারে বীচ ম্যানেজম্যান্ট কমিটি বসে পরবর্তি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
দখল করে থাকা দোকান উচ্ছেদ করা হবে কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘এটাও আলোচনা হবে। মুলত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনা ও উচ্চ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী কয়েক দফা অভিযান চালিয়ে এসব স্থাপনা উচ্ছেদ করেছিলাম। পরে ক্ষতিগ্রস্ত (উচ্ছেদ হওয়া) ব্যক্তিরা উচ্চ আদালতে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে রিট করেন। আদালত থেকে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। রিটের জবাব প্রদানের পর আদালতের নির্দেশনা মতে অবৈধ স্থাপনা ও দখলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
দোকানের মালিক রফিকুল ইসলাম বলেন, উচ্ছেদের বিরুদ্ধে দোকানমালিকেরা হাইকোর্টে রিট করেছেন। এরপর তাঁরা (দোকানমালিকেরা) বালিয়াড়িতে নতুন করে দোকানপাট বসিয়েছে। নবায়ন না করলে কয়েকহাজার মানুষ জীবিকা হুমকিতে পড়বে।
পরিবেশবিষয়ক সংগঠন ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস) চেয়ারম্যান মুজিবুল হক বলেন, 'প্রতিবেশ সংকটাপন্ন সৈকতের বালিয়াড়ি রক্ষা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করেই সিদ্ধান্ত জরুরি। সৈকতের বালিয়াড়িতে দোকান না বসিয়ে বিকল্প স্থানে কিভাবে বসানো যায় তা দেখা উচিত।'