মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, এডভোকেট
দুর্নীতি দমন কমিশন আইন,২০০৪ এর ৫ ধারা অনুযায়ী কমিশন তিন জন কমিশনার সমন্বয়ে গঠিত হবে। কমিশনারদের মধ্য থেকে রাষ্ট্রপতি একজন চেয়ারম্যান নিয়োগ করবেন। কোন কমিশনার মৃত্যুবরণ বা স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলে বা অপসারিত হলে রাষ্ট্রপতি ওই শূণ্য পদে ১১ ধারা অনুযায়ী ত্রিশ দিনের মধ্যে উপযুক্ত ব্যক্তিকে এই আইনের বিধান সাপেক্ষে কমিশনার নিয়োগ দান করবেন।
দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ও দুইজন কমিশনার গত ২০২৪ সালের ২৯ অক্টোবর পদত্যাগ করায় তিন জন কমিশনারের পদই ত্রিশ দিনের অধিক কাল ধরে শূণ্য ছিল। পরে ১০ ডিসেম্বর ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন চেয়ারম্যান এবং মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার অজিজী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) হাফিজ আহসান ফরিদ কমিশনার নিযুক্ত হন। তারা সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করলেও অজ্ঞাত কারণে গত ৩ মার্চ তারা পদত্যাগ করলে আবার দুদকের চেয়ারম্যান ও দুইজন কমিশনারের পদ শূন্য হয়ে যায়। কমিশন দুদক আইনের তফসিলে উল্লেখিত অপরাধসমূহের অনুসন্ধান ও তদন্ত পরিচালনা করবে। চেয়ারম্যান প্রধান নির্বাহী হিসেবে তার সার্বিক তত্ত্বাবধানে ও নিয়ন্ত্রণে অন্যান্য কমিশনারগণ তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করবেন এবং এইরূপ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে চেয়ারম্যানের নিকট কমিশনারগণের জবাবদিহিতা থাকবে। কমিশনের সকল সিদ্ধান্ত কমিশনের সভায় গৃহীত হবে। দায়িত্ব পালনের জন্য কমিশনের সভায় নিয়মিত সিদ্ধান্ত গ্রহন ও সুপারিশ প্রণয়ন করা হবে। গৃহীত সিদ্ধান্ত ও সুপারিশসমূহ বাস্তবায়িত হচ্ছে কিনা তা নিয়মিত পরিবীক্ষণ করা হবে। প্রতি তিন মাস পরপর কমিশনের সভায় তা মূল্যায়ন করা হবে। তাই দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পদ শূণ্য থাকলে দুদকের আইনানুগ কার্যক্রম কিভাবে চলবে? কমিশনার ছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাভাবিক কার্যক্রম অচল বা স্থবির হয়ে যাবে না ?
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পালিয়ে যাওয়া পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের লাগাতার পনের বছরের অধিক সময় দুর্নীতি ও লুটপাটের ওপর শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রধান ড.দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য শ্বেতপত্রের খসড়া প্রকাশকালে ২০২৪ সালের ২ ডিসেম্বর ব্রিফিং এ বলেছেন, বিগত সরকারের সময় দেশকে ’চামচাতন্ত্র’ থেকে ’চোরতন্ত্রে’ পরিণত করা হয়েছিল। আইন সভা, নির্বাহী বিভাগসহ সবাই গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে চুরির অংশ হয়েছে। রাজনীতিক, ব্যবসায়ী এবং উর্দি পরা কিংবা উর্দি ছাড়া আমলারা এর সহযোগী ছিলেন। এই চোরতন্ত্রের শীর্ষ দুর্নীতিবাজ ছিলেন আমলারা। আর সবচেয়ে বেশী দুর্নীতি হয়েছে ব্যাংকিং খাতে। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থের একটি বড় অংশ পাচার হয়ে গেছে। প্রতি বছর গড়ে যে পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে তার পরিমাণ জিডিপির প্রায় সাড়ে তিন শতাংশ। বিদেশে পাচারের পরিমাণ প্রতি বছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার হয়ে থাকতে পারে। তবে দুর্নীতি ও লুটপাটের কিছু অর্থ দেশেও রয়ে গেছে।
অতীতেও টিআইয়ের দুর্নীতির ধারণা সূচকে বিশ্বের শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম ১ নম্বরে ছিল ২০০১ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত। এমন পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৪ সালে ২৩ ফেব্রুয়ারী তৎকালীন চারদলীয় সরকার টিআইবির করা খচড়ার ওপর ভিত্তি করে দুদক আইন,২০০৪ প্রণয়ন করে একটি ’স্বাধীন ও নিরপেক্ষ’ কমিশন হিসেবে দুদক গঠন করে। কিন্তুু বাস্তবক্ষেত্রে জন্মলগ্ন থেকে দুদকের কার্যক্রম পর্যালোচনা করলে প্রতীয়মান হয় যে দুদক মোটেও ’স্বাধীন ও নিরপেক্ষ’ থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেনি। এই পর্যন্ত দুদকের সাতজন চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালন করেছেন। তারা হলেন বিচারপতি সুলতান হোসেইন খান, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) হাসান মশহুদ চৌধুরী, গোলাম রহমান, মোঃ বদিউজ্জামান, ইকবাল মাহমুদ, মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ ও ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন।
দুদকের প্রথম চেয়ারম্যান মোটেও সফল হন নাই, কারণ তার সময় দুর্নীতি দমন কমিশন বিধিমালাই প্রণয়ন করা হয় নাই। দুর্নীতি দমন কমিশন বিধিমালা,২০০৭ ওয়ান/ইলেভেনের অনির্বাচিত ফখরুদ্দিন-মঈনুদ্দিন সরকার ২০০৭ সালের ২৯ মার্চ প্রজ্ঞাপনমূলে জারী করেছে। লে, জে, হাসান মশহুদ চৌধুরী চেয়ারম্যান হওয়ার পর দুদক আইনের ১৭ ধারার অধীন দুর্নীতি প্রতিরোধের লক্ষ্যে সততা ও নিষ্ঠাবোধ সৃষ্টি করা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে গণসচেতনতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি ডিজিএফআই এর মাধ্যমে দেশের সৎ লোকদের নিয়ে প্রতি উপজেলা, জেলা, মহানগরে দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি গঠন করেন এবং নিয়মিত কর্মসূচী পালন করে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ দেশব্যাপী দুর্নীতির বিরুদ্ধে গণসচেতনতা সৃষ্টি করতে সক্ষম হন। তার আমলে প্রথম আমি কক্সবাজার সদর উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি ও এডভোকেট মোহাম্মদ বাকের সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হয়ে বিনা পারিশ্রমিকে স্বেচ্ছায় দায়িত্ব পালন করেছি। পরে আমি কক্সবাজার জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি ও অধ্যাপক অজিত দাস সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিন বছর করে তিন মেয়াদের দায়িত্ব পালন করে দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যক্রম কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। আমাদের কক্সবাজার জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির একটি গর্বের ইতিহাস এখানে উল্লেখ করার লোভ সংবরণ করতে পারছি না। দুর্নীতি দমন কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান মোঃ বদিউজ্জামান বিগত ২০১৪ সালের ১২ আগস্ট কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে বেলা সাড়ে ১১ টা থেকে দুপুর ২ টা পর্যন্ত পর পর দুইটা মত বিনিময় সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের ও দুর্নীত প্রতিরোধ কমিটির প্রত্যেক সদস্যকে নিজেদের উপর ন্যস্থ দায়িত্ব সততার সাথে যথাযথভাবে পালন করে নিজেদের সততার পরিচয় আগে দিয়েই অপরকে দুর্নীতি ত্যাগ করে সৎ হওয়ার আবেদন করতে হবে। যে দেশে দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর ও ঘুষের দালালরা কালো টাকার বিনিময়ে সমাজে ব্যাপক সমাদর কিনে নিতে পারে, সে দেশে প্রতি দিন দুর্নীতিবাজ সৃষ্টি হবেই। যে সমাজে সততা ও গুণী ব্যক্তিদের সমাদর নাই সেই সমাজে গুণী জন্ম নেন না। ২০১৩ সালের
২০ নভেম্বর দুদক আইনের সংশোধনীতে দন্ডবিধির ৪২০ ধারা দুদকের আইনের তফসিলভুক্ত করাতে আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট জনগণের, আদালতের ও তদন্তকারী কর্মকর্তাদের কি কি অসুবিধা ও জটিলতা হচ্ছিল তার প্রতি দুদক চেয়ারম্যান বদিউজ্জামানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে শুধু ’পাবলিক সার্ভেন্ট’ ও ’পাবলিক মানি’ সংশ্লিষ্ট থাকলেই দন্ডবিধির ৪২০/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/৪৭৭এ ইত্যাদি ধারার অপরাধ দুদক আইনের আওতায় আসবে এবং সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত লেনদেন সংক্রান্ত হলে তা আগের মত প্রচলিত আইনে তদন্ত ও বিচার হবে মর্মে সংশোধনী আনার পক্ষে কক্সবাজার জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির পক্ষে আমরা প্রস্তাব প্রদান করি। আমাদের বক্তব্য শুনে দুদক চেয়ারম্যান মোঃ বদিউজ্জামান জানান, সম্প্রতি দন্ডবিধির ৪২০ ধারা দুদক আইনের তফসিলভুক্ত করা নিয়ে সৃষ্ট অপ্রত্যাশিত অসুবিধা দূর করার জন্য আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনার জন্য সরকারের সাথে আলোচনা হচ্ছে। আমাদের প্রস্তাব একজন দুদক অফিসারকে দিয়ে লিখে নিলেন। দুদক চেয়ারম্যান আমাদের কক্সবাজারে দেওয়া প্রস্তাব কমিশনে পাশ করিয়ে সরকারকে দিলে তা সংসদে পাশ হয়ে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের পর আইন হওয়ায় দুদক আইনে বর্তমানের তপসিলে ২০১৬ সালের ২১ জুন সংযোজন করা হয়। এই কথা মহান হৃদয়ের অধিকারী সাবেক সফল দুদক চেয়ারম্যান মোঃ বদিউজ্জামান আমাদের না জানালে আমরা নিজেদের দেওয়া প্রস্তাব, আমরা আইন প্রণেতা না হওয়া সত্ত্বেও, আইন হিসেবে সংসদে পাশ হয়ে আইনে রূপান্তর হয়ে বর্তমানে দুদক আইনের তপসিলে আছে তা জানতে পারতাম না।
অভিযোগ আছে, দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ ও মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহর আমলেই দুদক আওয়ামীকরণ হয়ে দুর্নীতি দমনের পরিবর্তে বড় দুর্নীতিবাজদের সহায়তা করেছেন, কর্মকর্তাদের অনেকেই নিজেরাই দুর্নীতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং সরকারের প্রতিপক্ষদের হয়রানীর কাজে ব্যবহৃত হয়েছেন। দুদকের ভিতরেই দুর্নীতি ও রাজনীতি প্রবেশ করেছে মর্মেও প্রকাশ্যে অভিযোগ উঠেছে। বিগত সরকারের দুর্নীতি ও লুটপাটের শ্বেতপত্র থেকে সেই অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়। ফ্যাসিস্ট আমলে দুদকের মামলায় দন্ডিত বিএনপি, জামাত, অন্য বিরোধী দলের নেতাকর্মী ও ড.মুহাম্মদ ইউনুসের মত আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত, সম্মানিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলাগুলো সংশ্লিষ্ট দুদক কর্মকর্তাকর্তৃক প্রত্যাহারের আবেদনে বা গুণাগুণের উপর ভিত্তি করে শুনানীর পর আদালতকর্তৃক, উচ্চ আদালতকর্তক আসামীরা বেকসুর খালাস পেয়েছেন। এতে কি প্রমাণিত হয় না যে দুদককে পতিত সরকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছে এবং দুদকের কর্মকর্তারাও বেআইনীভাবে ব্যবহৃত হয়েছেন? দুদকের এক আইনকর্মকর্তা সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে মিডিয়ায় তা স্বীকার করে নিয়েছেন। দুদকের ডাইরেক্টর পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দুর্নীতির দায়ে দোষী সাব্যস্থ হয়ে আদালতকর্তৃক দন্ডিত হয়েছেন। দুদকের সকল কর্মকর্তা/কর্মচারী, দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সকল সদস্য,দুদকের সকল পিপি অবশ্যই শতভাগ দুর্নীতিমুক্ত হবেন তা প্রত্যাশিত। দুদকের মধ্যে যে সব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আছে, রাজনীতি সংশ্লিষ্টতা, রাজনৈতিক নেতাদের সাথে যোগাযোগের অভিযোগ আছে,প্রকাশ্যে রাজনৈতিক দলের নেতা-কমীদের মত দলবদ্ধ হয়ে মিটিং-মিছিল,মানবন্ধন করে জনসমক্ষে নিজেদের নিরপেক্ষতা হারিয়েছেন, সততা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। দুর্নীতি দমন কমিশনকে অবশ্যই জনসমক্ষে ’স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ’ প্রতিষ্ঠন হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
র্দীঘদিন দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পদ শূণ্য না রেখে প্রকৃত দুর্নীতিবাজদের উৎসাহিত না করে অবিলম্বে দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ দিয়ে দুনীতি দমন কমিশনকে আবার কার্যকর করা হবে তা জনগণ প্রত্যাশা করেন।