সোমবারের ভোরে চারদিকে তখনো আবছা কুয়াশা। পুরোপুরি ফুটে ওঠেনি দিনের আলো। ফজরের নামাজ আদায় করে কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন মহেশখালীর শাপলাপুরের বীর বাহাদুর ইসলাম (৩৫)।
স্নিগ্ধ প্রভাতে ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে স্বামীকে বিদায় জানিয়েছিলেন তার সন্তান-সম্ভবা প্রিয়তমা স্ত্রী। তবে বাবার শেষ যাত্রার মুহূর্তটি দেখতে পারেনি তার দেড় বছরের ছোট্ট ছেলেটি। তখন সে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল।
ঈদের ছুটি কাটিয়ে চট্টগ্রামে কর্মস্থলে ফেরার তাড়ায় ভোর পাঁচটার দিকে বাড়ি থেকে বের হন বাহাদুর। সকাল ছয়টার দিকে চকরিয়ার বদরখালী স্টেশন থেকে আরও চার যাত্রীকে সঙ্গে নিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস-চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে পৌঁছাতেই সড়ক দুর্ঘটনায় নিভে যায় তার জীবন প্রদীপ।
বাহাদুর দীর্ঘ ১০ বছর ধরে চট্টগ্রামে উত্তরা ব্যাংকে একটি শাখায় কর্মরত ছিলেন।
একই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন মহেশখালীর আরেক যুবক মোহাম্মদ নোমান ইলাহী (৩৪)। তিনিও ঈদের ছুটিতে বাড়িতে এসেছিলেন। তিনি চট্টগ্রাম শহরে লিংকেজ ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন।
স্বজনেরা জানিয়েছে, চার মাস আগে নোমানের বিয়ে চূড়ান্ত হয়। জীবনসঙ্গীর সঙ্গে কাবিনও সম্পন্ন হয়েছিল। আগামী মাসের নতুন চাঁদে নতুন বধূকে ঘরে তোলার কথা ছিল তার। সে উপলক্ষে পরিবারে চলছিল প্রস্তুতি।
নিহতদের মধ্যে বীর বাহাদুর ইসলাম মহেশখালী উপজেলার শাপলাপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের জাহিদাঘোনা এলাকার বাসিন্দা জালাল আহমদের ছেলে। অপরদিকে মোহাম্মদ নোমান ইলাহী মহেশখালী পৌরসভার লাতুয়ার ডেইল এলাকার বাসিন্দা হাফেজ আবুল বশরের ছেলে।
বাহাদুরের ঘরে সন্তান-সম্ভবা স্ত্রী
বাহাদুরের চাচাতো ভাই শিক্ষক মোহাম্মদ শাহাব উদ্দিন বলেন, ‘ভোরে নামাজ পড়ে বাহাদুর বাড়ি থেকে বের হয়। তখন তার ছেলে ঘুমিয়ে ছিল। স্ত্রী বিদায় জানায়। সকাল আটটার দিকে পুলিশ আমাকে ফোন করে জানায়, দুর্ঘটনায় বাহাদুর মারা গেছেন।’
নিহতের ছোট ভাই ফরিদুল আলম বলেন, ‘আমরা তিন ভাই ও তিন বোন। ঈদের দুই দিন আগে বড় ভাই ঈদের ছুটিতে বাড়িতে এসেছিল। প্রায় ১৫ বছর আগে বাবা-মাকে হারিয়েছি। আজ ভাইকে হারালাম।’
ফরিদুল আলম জানান, বাহাদুরের একটি ছেলে সন্তান রয়েছে। তার স্ত্রী বর্তমানে সন্তান-সম্ভবা।
স্থানীয় বাসিন্দা ছামিদুল ইসলাম বলেন, ‘বাহাদুর ছিল পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। পুরো পরিবার তার আয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল। সে সবার প্রিয় ছিল এবং সবার সঙ্গে মিলেমিশে চলত।’
‘আব্বা, আমি এক্সিডেন্ট করছি, তাড়াতাড়ি আসেন’
অপরদিকে নিহত নোমানের ভাই হাফেজ মুহাম্মদ আবু সারোয়ার বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর আহত অবস্থায় বড় ভাই নোমান নিজেই ফোনের লক খুলে দেন। এরপর বাবাকে কল করে বলেন, “আব্বা, আমি এক্সিডেন্ট করছি, আপনি তাড়াতাড়ি আসেন।”
নিহতের ভাগনে মুনির বিন সুলতান বলেন, ‘নোমান প্রায় নয় বছর ধরে চট্টগ্রামের লিংকেজ ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট লিমিটেডে চাকরি করতেন। ঈদের ছুটি শেষে সোমবার সকালে নামাজ পড়ে বাড়ি থেকে বের হন। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে খবর পাই, তিনি দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন। পরে চট্টগ্রামে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।’
নিহতের ছোট ভাইয়ের বন্ধু মোহাম্মদ সুলতান আমিন বলেন, ‘তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে নোমান ছিলেন বড় ছেলে। উপজেলার ছোট মহেশখালী ইউনিয়নের সিপাহীরপাড়া এলাকা থেকে তার বিয়ে ঠিক হয়েছিল। চার মাস আগে কাবিন সম্পন্ন হয়। বধূ বরণে নতুন করে সাজানো হচ্ছিল বাড়ি। নতুন চাঁদে হতো বিয়ের ধুমধাম আয়োজন। কিন্তু বিয়ের আনন্দের পরিবর্তে সেখানে এখন শোকের মাতম।’
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সোমবার (১ জুন) ভোরে বদরখালী থেকে পাঁচ যাত্রী নিয়ে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা চট্টগ্রামের দিকে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে সকাল সাড়ে ৭টার দিকে বাঁশখালীর মনছুরিয়া বাজারের গরুর বাজার এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা মাছবোঝাই একটি পিকআপের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই বীর বাহাদুর নিহত হন। গুরুতর আহত নোমান ইলাহীকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনিও মৃত্যুবরণ করেন।
এ ঘটনায় আহত হয়েছেন মহেশখালীর মাতারবাড়ি ইউনিয়নের মোজাম্মেল হকের মেয়ে মনি বেগম (২৪) এবং চকরিয়া উপজেলার বদরখালী এলাকার আবুল হোসেনের ছেলে মো. হেলাল (২২)।
বাঁশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রবিউল হক জানান, খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ দুটি উদ্ধার করে। আহতদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। দুর্ঘটনাকবলিত অটোরিকশা ও পিকআপ জব্দ করা হয়েছে। তবে দুর্ঘটনার পর চালক পালিয়ে যাওয়ায় তাকে আটক করা সম্ভব হয়নি।
উভয় পরিবারের সদস্যরা জানান, নিহতদের মরদেহ সোমবার বিকেলে নিজ নিজ বাড়িতে আনা হয়েছে। এশার নামাজের পর জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে। তাদের মৃত্যুতে পরিবার ও এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।