সাগরপাড়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম-কিন্তু এখন যেন পরিত্যক্ত এক স্থাপনা। মূল মাঠজুড়ে হাঁটুসমান ঘাস, হারিয়ে গেছে পিচের অস্তিত্ব। গ্যালারি, ড্রেসিংরুম, মেডিকেল রুমসহ পুরো স্টেডিয়ামজুড়েই জরাজীর্ণতার ছাপ। দীর্ঘদিনের অবহেলায় নষ্ট হতে বসা কক্সবাজার ক্রিকেট স্টেডিয়াম এবার নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)।
শুক্রবার স্টেডিয়াম পরিদর্শন শেষে বিসিবির পরিচালক ও সিকিউরিটি কমিটির চেয়ারম্যান সাঈদ ইব্রাহীম আহমেদ জানান, ধাপে ধাপে মাঠের লেভেল, ড্রেনেজ ও প্রয়োজনীয় ফ্যাসিলিটি উন্নয়নের পাশাপাশি আধুনিক ক্রিকেট ভেন্যু হিসেবে গড়ে তোলার কাজ শুরু হবে।
সরেজমিনে দেখা যায়, কক্সবাজার ক্রিকেট স্টেডিয়ামের মূল মাঠের গ্যালারি ভবনের বেহাল দশা। জরাজীর্ণ ছাউনি ভেঙে পড়ছে, দেয়ালজুড়ে গজিয়েছে গাছের শেকড়। চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ধ্বংসাবশেষ। দূর থেকে দেখলে পরিত্যক্ত কোনো স্থাপনা বলেই মনে হয়।
শুধু গ্যালারি ভবন নয়, বেহাল মূল মাঠও। হাঁটুসমান ঘাসে অনেকটা ঢেকে গেছে পিচ। ড্রেসিংরুম, প্রেস বক্স, প্রেসিডেন্ট বক্স, প্লেয়ার্স ডাইনিং, ম্যাচ রেফারি রুম, জিম ও মেডিকেল রুম—সবখানেই জরাজীর্ণতার ছাপ।
একাডেমি মাঠের অবস্থাও একই। পিচের কাজ করছেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। ঘাস কাটার মেশিনটি অকেজো হয়ে মাঠের পাশেই পড়ে থাকায় কাঁচি দিয়ে ঘাস কাটতে হচ্ছে তাদের। হাঁটুসমান ঘাসের মধ্যেই মাঠের পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখেন বিসিবির জাতীয় ব্যবস্থাপক সৈয়দ আব্দুল বাতেন।
এমন পরিস্থিতিতে শুক্রবার দুপুরে কক্সবাজার ক্রিকেট স্টেডিয়াম পরিদর্শনে আসেন বিসিবির পরিচালক ও সিকিউরিটি কমিটির চেয়ারম্যান সাঈদ ইব্রাহীম আহমেদ। সঙ্গে ছিলেন কক্সবাজারের সন্তান জাতীয় দলের ক্রিকেটার মুমিনুল হক। মূল মাঠ, একাডেমি মাঠসহ স্টেডিয়ামের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন তারা।
পরিদর্শন শেষে সাঈদ ইব্রাহীম আহমেদ জানান, কক্সবাজারের ক্রিকেট সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে চায় বিসিবি। একাডেমি ও মূল মাঠ সংস্কারের পাশাপাশি জাতীয় ক্যাম্প এবং ন্যাশনাল ক্রিকেট লিগসহ বিভিন্ন ঘরোয়া টুর্নামেন্ট আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনের জন্য বর্তমানে বিসিবির প্রধান ভেন্যু মিরপুর, চট্টগ্রাম ও সিলেট। তবে কক্সবাজারের অবস্থান ও পর্যটন সম্ভাবনা বিবেচনায় এখানে ক্রিকেটসহ বিভিন্ন ক্রীড়া আয়োজনের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। কক্সবাজারবাসী যাতে নিয়মিত ক্রিকেট উপভোগ করতে পারেন, সে লক্ষ্যেই কাজ করতে চায় বিসিবি।
বিসিবির এই পরিচালক বলেন, দীর্ঘদিন অবহেলায় থাকায় স্টেডিয়ামের অনেক অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা নষ্ট হয়েছে। এসব ফ্যাসিলিটি দ্রুত সংস্কার করে ব্যবহার উপযোগী করতে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সঙ্গে আলোচনা করে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
শুধু বড় শহর নয়, কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে জাতীয় দলের ক্রিকেটার তুলে আনাও বিসিবির অন্যতম লক্ষ্য বলে জানান তিনি। একাডেমি ও উন্নত অনুশীলন সুবিধা চালু হলে স্থানীয় তরুণ ক্রিকেটারদের সামনে নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
কক্সবাজারের ক্রিকেটাররা লিগে সুযোগ পাচ্ছেন না—এমন ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয় বলেও মন্তব্য করেন সাঈদ ইব্রাহীম আহমেদ। তিনি জানান, সম্প্রতি চট্টগ্রাম আঞ্চলিক টুর্নামেন্টে কক্সবাজার ও রাঙামাটির ক্রিকেটারদের নিয়ে ‘টিম সাম্পান’ অংশ নিয়েছে। কক্সবাজারের পাশাপাশি পার্বত্য ও অন্যান্য অঞ্চলের প্রতিভাবান ক্রিকেটারদের সামনে নিয়ে আসাই ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে শুধু ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো বড় শহর নয়, কক্সবাজার, বগুড়া, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও জাতীয় দল ও হাই পারফরম্যান্স (এইচপি) দলে ক্রিকেটার উঠে আসবে—এটাই বিসিবির লক্ষ্য।
আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনের ক্ষেত্রে আইসিসির নির্দিষ্ট মানদণ্ড ও অনুমোদন প্রয়োজন। দীর্ঘদিন অবহেলায় থাকায় কক্সবাজার স্টেডিয়ামে সেই মানদণ্ড পূরণের জন্য অনেক কাজ করতে হবে বলেও জানান তিনি।
সাঈদ ইব্রাহীম আহমেদ বলেন, প্রাথমিকভাবে একাডেমি ভবন ও মূল মাঠকে কেন্দ্র করে কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। মাঝের জায়গায় প্রায় ৬০ গজের একটি টার্ফ তৈরি করা গেলে ইনডোর ও ঘরোয়া পর্যায়ের অনুশীলন করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি একাডেমি ও ডরমিটরি সুবিধা চালু করা গেলে জাতীয় পাইপলাইনের তরুণ ক্রিকেটাররা এখানে নিয়মিত অনুশীলনের সুযোগ পাবেন।
তিনি আরও বলেন, একাডেমি ভবন ও মূল মাঠের উন্নয়নকাজের পাশাপাশি মাঠের লেভেল ঠিক করা, মাটি ভরাট ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নসহ প্রয়োজনীয় কাজ ধাপে ধাপে করা হবে। আশা করা হচ্ছে, আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে এর দৃশ্যমান ফল পাওয়া যাবে।
কক্সবাজার ক্রিকেট স্টেডিয়াম পরিদর্শনকালে বিসিবির স্থানীয় কাউন্সিলর জসিম উদ্দিন, ভেন্যু ম্যানেজার আশরাফুল আজিজ সুজনসহ স্থানীয় ক্রিকেটাররা উপস্থিত ছিলেন।