বারবার প্রচার-প্রচারণা ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি নেওয়ার পরও বন্ধ হচ্ছে না চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ। এতে আহত হচ্ছেন যাত্রী, ভাঙছে ট্রেনের জানালার কাচ। রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে এ ধরনের ৫০টির বেশি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনা প্রতিরোধে এবার প্রযুক্তির সহায়তা নিচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। পরীক্ষামূলকভাবে ঢাকা-কক্সবাজার রুটের পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেনে স্থাপন করা হয়েছে তিনটি সিসিটিভি ক্যামেরা। উদ্যোগ সফল হলে পর্যায়ক্রমে অন্য ট্রেনেও ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
চলন্ত ট্রেনে জানালার পাশে বসে আছেন যাত্রী। গন্তব্যে পৌঁছানোর অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় হঠাৎ বাইরে থেকে ছুটে এল পাথর। মুহূর্তেই ভেঙে গেল জানালার কাচ, আহত হলেন যাত্রী। আনন্দের ভ্রমণ পরিণত হলো আতঙ্কে। কক্সবাজার রুটে চলাচলকারী ট্রেনের যাত্রীদের কাছে এমন অভিজ্ঞতা এখন আর অপরিচিত নয়।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানায়, ঢাকা-কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে প্রতিদিন চার জোড়া ট্রেন চলাচল করে। এসব ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটছে রামু, ইসলামাবাদ, ডুলাহাজারা, চকরিয়া ও হারবাং এলাকায়। গত দেড় বছরে ৫০টির বেশি ঘটনার তথ্য নথিভুক্ত হলেও বাস্তবে এ সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন।
আতঙ্ক নিয়ে যাতায়াত করছেন যাত্রীরা
কক্সবাজারে নিয়মিত যাতায়াত করেন যাত্রী শাহিদুল আলম। তিনি বলেন, চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের কারণে এখন ভয় নিয়ে যাতায়াত করতে হয়। তাঁর পাশের এক যাত্রীর চোখ পাথরের আঘাতে নষ্ট হয়ে গেছে। বিশেষ করে পরিবার নিয়ে রাতের ট্রেনে ভ্রমণের সময় আতঙ্ক বেশি কাজ করে।
শাহিদুল আলম বলেন, কক্সবাজারে আসার সময় আনন্দ থাকলেও ফেরার পথে সুস্থভাবে বাড়ি পৌঁছাতে পারবেন কি না, তা নিয়ে শঙ্কা থাকে। এ ধরনের ঘটনা পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে পাথর নিক্ষেপ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ চান তাঁরা।
আরেক যাত্রী ফরহাদ হোসেন বলেন, রেলপথে ভ্রমণের অন্যতম প্রত্যাশা নিরাপত্তা। কিন্তু চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা যাত্রীদের মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। এসি কিংবা নন-এসি-যেকোনো বগিতে জানালার পাশে বসে থাকা যাত্রী পাথরের আঘাতে গুরুতর আহত হতে পারেন। মাথায় পাথর লাগলে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে।
ফরহাদ হোসেনের মতে, শুধু প্রশাসন বা রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে এ সমস্যা পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। এ জন্য জনসচেতনতাও জরুরি। যারা পাথর নিক্ষেপ করেন, তাঁদের এ বিপজ্জনক কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে।
যাত্রী হোসাইন ইব্রাহীম বলেন, রাতের বেলা চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় বড় দুর্ঘটনা, এমনকি প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। এতে যাত্রীদের পাশাপাশি রেলওয়ের মূল্যবান সম্পদও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকারি সম্পদের ক্ষতি মানে জনগণেরই ক্ষতি। তাই এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে।
ঢাকা থেকে কক্সবাজারে নিয়মিত যাতায়াত করেন জাহেদুল হক। তাঁর মতে, বিশেষ করে অন্ধকারে পাথর নিক্ষেপের আশঙ্কা যাত্রীদের নিরাপত্তাহীনতায় ফেলে। প্রতিটি ট্রেনে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হলে পাথর নিক্ষেপকারীদের শনাক্ত করা সহজ হবে। একই সঙ্গে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও উদ্যোগটি ভূমিকা রাখতে পারে।
পর্যটক এক্সপ্রেসে তিন ক্যামেরা
কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশনের ওয়াশপিটে রাখা পর্যটক এক্সপ্রেসের বগিতে পরীক্ষামূলকভাবে স্থাপন করা হয়েছে তিনটি সিসিটিভি ক্যামেরা। বগির দুই পাশে এসব ক্যামেরা বসানো হয়েছে। পাথর নিক্ষেপের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ করাই এর উদ্দেশ্য।
কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশনের ওয়াশপিট সুপারভাইজার চয়ন রায় বলেন, ট্রেন স্টেশনে পৌঁছানোর পর ওয়াশপিটে নিয়ে রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করা হয়। কোনো জানালার কাচ ভাঙা থাকলে মজুত সাপেক্ষে সেখানে পরিবর্তন করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে এ কাজ ঢাকায় গিয়ে সম্পন্ন করতে হয়। প্রতিটি কাচ পরিবর্তনের হিসাবও সংরক্ষণ করা হয়।
চয়ন রায় বলেন, দুর্বৃত্তদের পাথর নিক্ষেপে ট্রেনের জানালার কাচ প্রায়ই ভেঙে যেত। তবে পর্যটক এক্সপ্রেসে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের পর গত এক সপ্তাহে কোনো কাচ ভাঙার ঘটনা পাওয়া যায়নি।
তাঁর ভাষ্য, সরকারের এ উদ্যোগ ইতিবাচক। পর্যায়ক্রমে প্রতিটি ট্রেনে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হলে পাথর নিক্ষেপ ও জানালার কাচ ভাঙার ঘটনা কমে আসবে বলে তাঁরা আশা করছেন।
অন্য ট্রেনেও ক্যামেরা স্থাপনের দাবি
কক্সবাজার রুটে চলাচলকারী অন্য ট্রেনগুলোতেও সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন রেলসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, শুধু একটি ট্রেনে ক্যামেরা স্থাপন করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। এ জন্য পুরো রেলপথে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি অপরাধীদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
কক্সবাজার এক্সপ্রেসের স্টুয়ার্ড ম্যানেজার মাইনুল ইসলাম তুহিন বলেন, রামু, ইসলামাবাদ ও ডুলাহাজারার মধ্যবর্তী কয়েকটি স্থানে তাঁদের ট্রেন পাথর নিক্ষেপের শিকার হচ্ছে। এ ধরনের ঘটনা পুরোপুরি প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় তাঁদের ট্রেনেরও বেশ কয়েকজন যাত্রী আহত হয়েছেন। অনেক সময় ট্রেনের কর্মীরাই আহত ব্যক্তিদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। পাথর নিক্ষেপকারীদের শনাক্ত করতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, তা সময়ের সঙ্গে বোঝা যাবে। তবে এ সমস্যা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্ম ম্যানেজার মেহেদী হাসান বলেন, রেললাইনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় যাত্রীরা আহত হচ্ছেন, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রেলওয়ের সম্পদ। এ সমস্যা প্রতিরোধে পর্যটক এক্সপ্রেসে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে পাথর নিক্ষেপকারীদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মেহেদী হাসান আরও বলেন, বিভিন্ন স্টেশনে গিয়ে পাথর নিক্ষেপের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়। তবে শুধু প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে এ সমস্যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই এবার ক্যামেরার মাধ্যমে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি সফল হলে পর্যায়ক্রমে অন্য ট্রেনেও এ প্রযুক্তি ব্যবহারের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম থেকে দুই জোড়া এবং ঢাকা থেকে দুই জোড়া ট্রেনে প্রতিদিন কক্সবাজার রুটে যাতায়াত করেন প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার যাত্রী। বিপুলসংখ্যক এসব যাত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাথর নিক্ষেপ বন্ধ করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সচেতনতামূলক প্রচারণায় কাজ না হওয়ায় সিসিটিভি ক্যামেরার পরীক্ষামূলক ব্যবহার কতটা কার্যকর হয়, এখন সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের।