পবিত্র ঈদুল আজহার মুসল্লীদের বরণে প্রস্তুত কক্সবাজার কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দান কর্তৃপক্ষ। এজন্য প্রায় সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে বৃহস্পতিবার (২৮ মে) ঈদুল আজহার জামাত হবে ২টি। প্রথম জামাত হবে সকাল সাড়ে ৭টায়। প্রথম জামাতে ইমামতি করবেন কক্সবাজার কেন্দ্রীয় মডেল মসজিদের প্রধান পেশ ইমাম মুফতি মাওলানা সোলাইমান কাসেমী এবং দ্বিতীয় জামাত হবে সকাল সাড়ে ৮টায়। দ্বিতীয় জামাতে ইমামতি করবেন কক্সবাজার কেন্দ্রীয় মডেল মসজিদের সহকারী পেশ ইমাম হাফেজ মাওলানা মোহাম্মদ ওসমান গনি। ২০২৪ সাল থেকে কক্সবাজার কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহায় পর পর ২টি জামাত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। কক্সবাজার কেন্দ্রীয় মডেল মসজিদের দীর্ঘ ৩ যুগের খতিব ও কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানের নিময়িত ইমাম আল্লামা মাহমুদুল হক পবিত্র হজ্জ পালনের জন্য বর্তমানে সৌদী আরব রয়েছেন।
গত ১৮ মে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো: আ: মান্নানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ঈদুল আজহা উদযাপন বিষয়ক এক প্রস্তুতি সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রস্তুতি সভায় বক্তব্য রাখেন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শাহিদুল আলম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) দেবদূত মজুমদার, জেলা শ্রমিক দলের সভাপতি রফিকুল ইসলাম প্রমুখ। এসময় উপস্থিত ছিলেন, সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার তাহমিনা আক্তার, সাংবাদিক ইউনিয়ন কক্সবাজারের সভাপতি নুরুল ইসলাম হেলালীসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধিরা।
কক্সবাজার পৌরসভার প্রশাসক মো. শামীম আল ইমরান জানিয়েছেন, কক্সবাজার কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে জেলার প্রধান ঈদুল আজহার জামাতের প্রস্তুতি প্রায় ৮৫% ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। সম্মানিত মুসল্লীরা সাবলীল ও সুন্দরভাবে পরিচ্ছন্ন ও উৎসবমুখর পরিবেশে যাতে ঈদুল আজহার নামাজ আদায় করতে পারেন সেজন্য ২টি জামাতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিটি জামাতে ৮ হাজারের বেশী মুসল্লী নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বৃষ্টির কথা মাথায় রেখে প্যান্ডেলে ত্রিপল লাগানো সহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বৃষ্টি হলে ময়দান থেকে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। হালকা বাতাস হলেও যাতে প্যান্ডেলের কোন সমস্যা নাহয়, সেভাবে শক্ত করে প্যান্ডেল টাঙানো হয়েছে।
কক্সবাজার পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আদনান চৌধুরী জানান, কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে ৫টি গেইট দিয়ে মুসল্লীরা প্রবেশ করতে পারবেন। ঈদগাহ ময়দানে ঈদুল আজহার জামাতে সর্বোচ্চ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সার্বক্ষনিক নজরদারিতে থাকবেন। কোন মুসল্লী অসুস্থ হলে যাতে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা সেবা দেওয়া যায়, সেজন্য মেডিকেল টিমকে প্রস্তুত রাখা হবে। কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেবদূত মজুমদার জানিয়েছেন, কক্সবাজার জেলা পুলিশের উদ্যোগে ২ স্থরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া, র্যাব-১৫ এর চৌকস একটি টিমও সমন্বিত নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকবে। সাধারণ পোশাকে গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনও দায়িত্ব পালন করবে। স্টেডিয়াম, স্টেডিয়ামের দক্ষিণ পাশের রোড, হাসপাতাল সড়ক ও জেলা পরিষদ মোড়ে আর্চওয়ে অর্থাৎ নিরাপত্তা গেইট বসানো হবে। প্রায় ৩শত মুসল্লী যাতে একসাথে অজু করতে পারেন, সে ব্যবস্থা করা হয়েছে।
কক্সবাজার পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা ছৈয়দুল হক আজাদ জানান, ময়দানে পর্যাপ্ত সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। অত্যাধিক তাপমাত্রার কথা চিন্তা করে প্যান্ডেলে ১৫০ টির বেশি সিলিং ফ্যান লাগানো হয়েছে। তাছাড়া ২০টি স্ট্যান্ড ফ্যান ও ১০টি এয়ারকুলারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। লাগানো হয়েছে পর্যাপ্ত লাইট। রং দিয়ে সাজানো হয়েছে ময়দানের মিম্বর। মাইক ও সাউন্ড বক্স লাগানো হয়েছে পুরো প্যান্ডেল জুড়ে। বর্নিল সাজে সাজানো হয়েছে পুরো ময়দান। ৫টি গেইট থেকে মুসল্লীরা ময়দানে প্রবেশের সময় প্রত্যেককে এক বোতল আতর, ৫০০ মি:লি: মিনারেল পানি এবং টিস্যু উপহার দেওয়া হবে। ময়দানে মনিটরিং সেল সার্বক্ষনিক কাজ করবে। প্রয়োজনে জরুরি সেবা দিতে ফায়ার সার্ভিসকে এলার্ট রাখা হয়েছে। শহরে ব্যানার সহ ১৫টি তোরণ নির্মাণ করা হয়েছে।
ঈদগাহে ময়দানে প্যান্ডেল নির্মাণ ও অন্যান্য আনুষাঙ্গিক কাজের দায়িত্ব প্রাপ্ত এস.এম ডেকোরেটর্স এন্ড ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের সত্বাধিকারী কমল দাশ সাধন জানান, ২০ থেকে ২২ ফুট উচ্চতা সম্পন্ন বিশাল প্যান্ডেলের আয়তন প্রায় ৬০ হাজার বর্গফুট। প্যান্ডেল নির্মাণ সহ আনুষঙ্গিক কাজ ইতিমধ্যে শতকরা প্রায় ৮৫ ভাগ সম্পন্ন হয়েছে। অবশিষ্ট কাজ মঙ্গলবারের মধ্যে শেষ করা হবে। তিনি আরো জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠানের সুনাম ও মুসল্লীদের আরো বেশী সেবাদানের কথা মাথায় রেখে অন্যান্য বছরের চেয়ে এবছর সম্মানিত মুসল্লীরা ঈদুল আযাহার নামাজ আদায়ে যাতে অধিকতর বেশী আনন্দ উপভোগ ও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, সেজন্য ময়দানে বাড়তি কিছু নান্দনিক আয়োজন করা হচ্ছে। তার মধ্যে, ছবি উঠানোর জন্য ২ টি ফটোবুথ, অত্যাধুনিক একটি ডিজাইন প্যান্ডেল, আধুনিক ও মনোরম গেইট নির্মান করা হয়েছে। যা মুসল্লীদের উৎসবের আমেজ বৃদ্ধি ও বিনোদনে ভূমিকা রাখবে বলে জানান, এস.এম ডেকোরেটর্স এন্ড ইভেন্ট ম্যাজেজমেন্টের সত্বাধিকারী কমল দাশ সাধন। তিনি আরো জানান, পুরো ঈদগাহ ময়দান, প্যান্ডেল ও আশেপাশের এলাকাকে মনোরম সাজে সজ্জিত করা হচ্ছে।
কক্সবাজার বিদ্যুৎ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সুত্রে জানা গেছে, ঈদগাহ ময়দানে ঈদুল আজহার জামাতের আগে পরে সার্ক্ষনিক নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
কক্সবাজার পৌরসভার প্রশাসক মো. শামীম আল ইমরান, কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান, কক্সবাজার পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আদনান চৌধুরী, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের জে.এম শাখার সহকারী কমিশনার এফ. এম. খায়রুল হক ও পর্যটন শাখার সহকারী কমিশনার মো. মাহমুদুর রহমান সায়েম, কক্সবাজার পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ছৈয়দুল হক আজাদ, কক্সবাজার পৌরসভার দায়িত্বশীল কর্মকর্তা, কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কক্সবাজার কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানের প্রস্তুতি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শনকালে তাঁরা কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে ঈদুল আজহার জামাত এর সার্বিক প্রস্ততি দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটিতে কক্সবাজারে ব্যাপক পর্যটন সমাগম হবে বলে প্রস্তুতি সভায় আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়। এ সুযোগে কোন কোন আবাসিক হোটেলের মালিক রুম ভাড়া এবং রেস্টুরেন্টে খাবার বিল বেশি নেন। কক্সবাজার পর্যটন শিল্পের সুনাম রক্ষায় ও এ প্রবণতা রোধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে হোটেলের রুমের ভাড়া ও খাবারের মূল্য কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা হবে। একইসাথে ঈদ উল আজহাতে কক্সবাজারে আগত পর্যটকদের নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বাড়তি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে কোরবানির পশুর বর্জ্য দ্রুত সরানোর ব্যবস্থা করতে কক্সবাজার পৌরসভা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন প্রশাসনিক কর্মকর্তা ছৈয়দুল হক আজাদ। ঈদুল আজহার ছুটিতে শহর ও পর্যটন এলাকা পরিচ্ছন্ন রাখতে পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা তৎপর থাকবে। বিশেষ করে পর্যটন এলাকায় রাতের বেলায় পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কক্সবাজারে ঈদুল আজহার ছুটিতে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে তৎপর থাকতে প্রস্তুতি সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যেসকল স্থানে ছিনতাইয়ের আশংকা থাকে সেসব স্থানে পুলিশি টহল জোরদার করা হবে।
ঈদুল আজহার ছুটিতে যানবাহনের ভাড়া যাতে বৃদ্ধি না করে, সেজন্য যানবাহন মালিক সমিতি গুলোকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে মহেশখালী-কক্সবাজার নৌরুটের নৌযান গুলো যাতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করতে নাপারে, সে বিষয়ে মহেশখালীর ইউএনও-কে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়।
ঈদুল আজহা ও ছুটিতে অতি বর্ষনে পাহাড় ধ্বসের আশংকা থাকায় ফায়ার ব্রিগেড, রেড ক্রিসেন্ট সহ দুর্যোগ মোকাবেলায় সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। এরকম পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তর সমুহের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হবে বলে সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, চামড়া সংরক্ষণসহ বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এদিকে, ঈদুল আযাহার উদযাপন বিষয়ক প্রস্তুতি সভায় কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) তাসনীম জাহানকে আহবায়ক করে ১০সদস্য বিশিষ্ট ঈদুল আজহার জামাত সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে আয়োজনের লক্ষ্যে একটি ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্যান্য সদস্যরা হলেন, কক্সবাজার পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আদনান চৌধুরী, পুলিশ সুপারের প্রতিনিধি, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের জে.এম শাখার সহকারী কমিশনার এফ. এম. খায়রুল হক ও পর্যটন শাখার সহকারী কমিশনার মো. মাহমুদুর রহমান সায়েম, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপ পরিচালক মুহাম্মদ সরওয়ার আকবর, জেলা তথ্য অফিসার মো: আবদুছ ছাত্তার, কক্সবাজার প্রেসক্লাবের প্রতিনিধি, জেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ ইউনুস, জেলা ইমাম সমিতির সভাপতি/সাধারণ সম্পাদক। ব্যবস্থাপনা কমিটি কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে অনুষ্ঠিতব্য ঈদুল ফিতরের জামাতের সার্বিক প্রস্তুতি মনিটরিং করছেন বলে জানিয়েছেন।
এদিকে, জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেছেন, ঈদ উল আযহার পবিত্রতা রক্ষা করে নিরাপদ ও উৎসবমুখর পরিবেশে কক্সবাজারবাসী যেনো ঈদ পালন করতে পারে, সেজন্য কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সম্ভব সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তিনি জেলাবাসীকে ঈদুল আজহার শুভেচ্ছা জানিয়ে সকলের সুস্বাস্থ্য ও মঙ্গল কামনা করেছেন।