সালাহউদ্দিন আহমেদকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী নিযুক্ত করায় কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনে খুশির বন্যা বয়ে যাচ্ছে। তিনি ১৭ ফেব্রুয়ারি সকালে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পর বিকালে শপথ নিয়েছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে।
এই খবর পৌঁছলে দলীয় নেতাকর্মীরা বিভিন্ন স্থানে মিষ্টি বিতরণ করেন। বিকালে চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলায় দলীয় নেতাকর্মীরা আনন্দ মিছিল বের করেন।
মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় শপথ নেন নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরা। এ নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। বিকালে সালাহউদ্দিন আহমেদ শপথ নেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে।
যেভাবে রাজনীতিতে উত্থান সালাহউদ্দিনের :
বগুড়া জেলা প্রশাসনে সিনিয়র সহকারী সচিব হিসাবে দায়িত্ব পালনকালে ১৯৯১ সালে তিনি তৎকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া’র সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) হিসাবে যোগ দেন। ১৯৯৬ সালের জানুয়ারিতে এই সরকারি চাকুরী থেকে ইস্তফা দিয়ে সালাহউদ্দিন আহমেদ সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে নেমে পড়েন। একটানা তিনবার কক্সবাজার-১ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি রেকর্ড সৃষ্টি করেন।
সালাহ উদ্দিন আহমেদই একমাত্র রাজনীতিবিদ, যিনি যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী হয়ে স্বাধীনতাত্তোর কক্সবাজার জেলা থেকে সর্বপ্রথম মন্ত্রী হয়েছেন। সালাহউদ্দিন আহমদ বৃহত্তর চকরিয়া থেকে কিছু অংশ আলাদা করে ২০০২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ‘পেকুয়া’ নামক একটি আলাদা উপজেলা প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি পেকুয়ায় প্রয়োজনীয় সকল অবকাঠামো, আধুনিক স্থাপনা ও উন্নয়ন করেছেন পরবর্তী সাড়ে চার বছরে। যা এখন দৃশ্যমান ও সুফল ভোগ করছে সকলে। ২০০৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২ বছর ২ মাস ওয়ান ইলাভেন সরকারের কারাগারে বন্দী থেকে ২০০৯ সালের ২৯ মার্চ তিনি কারামুক্ত হন। সালাহউদ্দিন আহমেদ কারাগারে থাকাবস্থায় এরমধ্যে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তার সহধর্মিনী এডভোকেট হাসিনা আহমেদ কক্সবাজার-১ আসনে চারদলীয় জোটের মনোনয়ন নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে প্রায় ৩৬ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সালাহউদ্দিন আহমেদ ১৯৯৬ সালে প্রথমে কক্সবাজার জেলা বিএনপি’র আহবায়ক এবং পরে পরপর দু’বার কাউন্সিলের মাধ্যমে কক্সবাজার জেলা বিএনপি’র সভাপতি নির্বাচিত হন। পরে ২০১০ সালে বিএনপি’র জাতীয় কাউন্সিলে সালাহউদ্দিন আহমেদ কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন। এরপর তিনি ভারতের মেঘালয়ের সিলং শহরে নির্বাসিত থাকাবস্থায় বিএনপি’র সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয় লাভ করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্বী ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামীর মনোনীত আবদুল্লাহ আল ফারুখ। নির্বাচনে সালাহউদ্দিন আহমেদ পেয়েছিলেন ২,২০,৫৬৬ ভোট এবং আবদুল্লাহ আল ফারুক পেয়েছেন ১,২৪,৭২৬ ভোট। এর আগে সালাহউদ্দিন আহমেদ তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ৯৬ সালের ১২ জুন সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী সালাহউদ্দিন আহমেদ সিআইপিকে পরাজিত করে দ্বিতীয় বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তী ২০০১ সালে ১ অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে পরাজিত করে তৃতীয় বারের মতো সংসদ সংসদ্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। সালাহউদ্দিন আহমদ তৎকালিন বিএনপি সরকারের যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান। এরপর ২০০৮ সালে সেনা সমর্থিত তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে কয়েকটি মামলায় সাজা হলে নিবার্চনে অযোগ্য হয়ে পড়েন। ওই নির্বাচনে সালাহউদ্দিনের সহধর্মিনী এডভোকেট হাসিনা আহমেদ অংশ নিয়ে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এতে চকরিয়া-পেকুয়া আসনটি বিএনপির ঘাটি হিসাবে পরিচিতি লাভ করে।
সালাউদ্দিন আহমদ এর পারিবারিক জীবনঃ সালাহউদ্দিন আহমেদ ১৯৬২ সালের ৩০ জুন কক্সবাজার জেলার তৎকালীন বৃহত্তর চকরিয়া উপজেলার পেকুয়া ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী সিকদার পাড়া গ্রামে সম্ভ্রান্ত মৌলভী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার পিতার নাম মৌলভী ছাঈদুল হক ও মাতার নাম বেগম আয়েশা হক। তার পিতামহ ছিলেন মৌলভী আবদুল আলী ও মাতামহ ছিলেন হাকিমন। পেকুয়াতে প্রাথমিক পর্যায়ের পড়ালেখা শেষ করে কিশোর সালাহ উদ্দিন আহমদ পেকুয়ার শিলখালী উচ্চ বিদ্যালয় হতে রেকর্ড সংখ্যক নম্বর পেয়ে ১৯৭৭ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে ১৯৭৯ সালে কৃতিত্বের সাথে তিনি এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন ১৯৮০ সালে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৪ সালে এলএলবি (সম্মান) ও ১৯৮৬ সালে এলএলএম ডিগ্রি অর্জন করেন ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে আইনজীবী তালিকাভুক্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে অ্যাডভোকেট হিসেবে সনদ লাভ করেন। ৭ম বিসিএস পরীক্ষায় ১৯৮৫ সালে অংশ নিয়ে তিনি বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারে উত্তীর্ণ হন। ১৯৮৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তিনি বিসিএস (প্রশাসন) চাকরিতে যোগদান করেন। বগুড়া জেলা প্রশাসনে সিনিয়র সহকারী সচিব হিসাবে দায়িত্ব পালনকালে ১৯৯১ সালে তিনি তৎকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া’র সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) হিসাবে যোগ দেন।
কর্মজীবন ও রাজনীতিঃ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সভাপতিসহ সফলতার সাথে আরো বিভিন্ন পদে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। কিছুদিন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্রদলের দায়িত্বে থাকাকালে স্বৈরাচারী সরকারের রোষানলে পড়েন।
বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের আামলে রাজধানীর উত্তরার একটি বাসা থেকে সাদা পোশাকে অস্ত্রধারীরা তুলে নেয় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদকে। হাত বেঁধে, চোঁখ ঢেকে নিয়ে যাওয়া হয় অজ্ঞাত স্থানে। এখন যাকে সবাই চেনে আয়নাঘর নামে। সেই আয়না ঘরে কাটে ৬১ দিন। তারপর সীমান্ত দিয়ে ভারতে ঠেলে দেওয়া হয়। অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে ভারতে সালাহউদ্দিন আহমেদের বিচার হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পথ ধরে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে ফেরেন গুমের শিকার সালাহউদ্দিন আহমেদ।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদ ২০১৫ সালে দলের মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ওই বছর ১০ মার্চ উত্তরার একটি বাসা থেকে সালাউদ্দিনকে তুলে নিয়ে যায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় দেওয়া সদস্যরা। তারপর তাকে আইনের হাতে সোপর্দ না করে গুম করে রাখা হয়। দুমাসেরও বেশি সময় পর পরিবারের সদস্যরা খবর পান সালাহউদ্দিন আহমেদ ভারতের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীরা ঠেলে ওপারে পাঠালেও অবৈধ অনুপ্রবেশের মামলায় শিলংএ বন্দিত্বের জীবন কাটাতে হয় সালাহউদ্দিন আহমেদকে। দীর্ঘ আইন প্রক্রিয়ায় ছাড়াও পান তিনি, কিন্তু দেশে ফিরতে পারেননি। অবশেষ ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ১১ আগষ্ট দেশে ফেরেন।