১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ সকাল সাড়ে বারটার সময় কক্সবাজার বদরমোকাম সরকারী প্রাইমারী স্কুল কেন্দ্রে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ,উৎসবমূখর,ঐতিহাসিক ও পরিচ্ছন্ন নির্বাচনে নিজের ভোট দিয়ে প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী হলাম। পায়ে হেটে যাওয়ার সময় প্রথমে দেখা হলো জামাত সমর্থকদের সাথে। হাসানের নেতৃত্বে তারা হাসিমূখে ছবি তুললো আমার সাথে। পরে দেখা হলো আমার নাতি সাবেক কমিশনার মুকুলের নেতৃত্বে একদল বিএনপি সমর্থকদের সাথে। মুকুলের জিজ্ঞাসায় বললাম জীবনের প্রথম ভোট দিয়েছি কক্সবাজার পাবলিক লাইব্রেরী হল সেন্টারে ১৯৭০ সালে। জাতীয় সংসদে নৌকা প্রতীকে ও প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীকে ভোট দিয়েছিলাম মনে আছে। আমি তখন চট্টগ্রাম সরকারী কর্মাস কলেছের ছাত্র ছিলাম। জীবনের প্রথম ভোট দেওয়ার জন্য কক্সবাজার এসেছিলাম। ভোট দেওয়ার পরে বিএনপি নেতা রফিকুল হুদা চৌধুরীর নেতৃত্বে অনেক বিএনপি নেতাকর্মীকে নিয়ে চেয়ারে বসে থাকতে দেখলে তিনি উঠে এসে আমি এবং এডভোকেট ইউসুফ মোহাম্মদ শাসশুল হুদার সাথে ছবি তুলেন। অনেক অমুসলমান ভোটারকেও নির্ভয়ে ভোট দিতে ও দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। সত্যিই একটি উৎসবমূখর শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ভোটকেন্দ্রের চারিদিকে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পরে আমার দেখা সেরা নির্বাচন। বিদেশী পর্যবেক্ষক দলও এই নির্বাচনকে আর্ন্তজাতিক মানের স্বীকৃতিযোগ্য নির্বাচন বলে মতামত ব্যক্ত করেছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশী সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে দুই যুগ পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। এই পর্যন্ত ঘোষিত ফলাফলে বিএনপি জোট পেয়েছে ২১২টি,জামাত জোট পেয়েছে ৭৭টি আসনটি। এর মধ্যে এনসিপি পেয়েছে ৬টি আসন। এই নির্বাচনে বিএনপির ইতিহাসে সেরা বিজয়। জামাতের ইতিহাসেও সেরা বিজয়। এনসিপির প্রথম নির্বাচনে ইতিহাস সৃষ্টিকারী বিজয়। আপাত দৃষ্টিতে জাতীয় পার্টির পরাজয় হলেও দল হিসেবে নিষিদ্ধ করার জন্য কতিপয় দলের আক্রমণাত্মক, মারমূখী দাবী ও চরম প্রতিকুল পরিবেশে নির্বাচনে অংশ গ্রহন করে দলের অস্তিত্ব রক্ষা করতে সক্ষম হওয়ায় তারাও বিজয়ী হয়েছে। প্রকাশ্যে গণভোটে না ভোট দেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়ে জি,এম কাদেরের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘোষণার ফলে ৪ কোটি ৮০ লাখ হাঁ ভোটের বিপরিতে ২ কোটি ২৫ লাখ না ভোট দিয়েছেন বলে আত্মতৃপ্তি পেতে পারেন।
এই ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিজয় হয়েছে গণতন্ত্রের,বিজয় হয়েছে ভোটারদের,বিজয় হয়েছে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের। শুরু হয়েছে গণতান্ত্রিক উত্তরণযাত্রা। শান্তিপূর্ণ নির্বাচন উপহার দেওয়ার জন্য অনেক ব্যর্থতা থাকলেও প্রধান উপদেষ্টা ইউনুস সরকার,সেনাবাহিনী সহ আইনশৃংখলা রক্ষা বাহিনী, নির্বাচনে মোটামোটি নিরপেক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। অনেক ধরনের উসকানী সত্ত্বেও সংখ্যালঘুসহ প্রায় ৬০ শতাংশ জনগণ ভোট কেন্দ্রে এসে ভোট দিতে কোন ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করার জন্য সকল রাজনৈতিক দলকে ধন্যবাদ দিতে হয়। সেনাবাহিনীর প্রধান ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার অবাধ,সুষ্টু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেওয়ার ব্যাপারে দেশবাসীকে দেওয়া কথা রেখেছেন। তাই তাঁদের নাম ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
এই নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন যারা বিনাভোটে ক্ষমতা ভোগ করার সময় কাল দীর্ঘায়িত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন তারা। যারা আগে গণভোট,পিআর ছাড়া কোন ভোট বাংলার মাঠিতে হতে দেব না বলে ঘোষণা করেছিলেন তারা। যারা ভোটে কারচুপি করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন তারা। যারা ভোট বর্জনের আহ্বান জানিয়েছিলেন তারা।
নিজে দুইটি আসনে বিজয়ী ও বিজয়ী দলের নেতা তারেক রহমান সরকার গঠন করবেন,তার পছন্দ অনুযায়ী মন্ত্রীসভা গঠন করবেন তা স্বাভাবিক। তার দেশের জন্য থাকা প্লান,জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পর্যায়ক্রমে পূরণ করবেন বলে জনগণ আশাবাদী। ঘুষ-দুর্নীতি,চাঁদাবাজী,দখলবাজী অতি সহজেই দমন করা সম্ভব যদি দেশের সবকিছু আইন অনুযায়ী পরিচালিত হয়। প্রচলিত আইন অমান্য বা ভঙ্গ করলেই বিচার করতে হবে,শাস্তি দিতে হবে। তখনই আইনশৃংখলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে। প্রয়োজনে সংসদে গণবিরোধী,হয়রানীমূলক আইন থাকলে বাতিল করে নতুন আইন প্রণয়ন করতে হবে। পূর্বে পরিক্ষীত ও সততা নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ বা ঋণখেলাপীদের বড় কোন দায়িত্ব দেওয়া যাবে না। মবসন্ত্রাস বন্ধ করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করতে হলে বিচার বিভাগ,দুদক,তদন্ত সংস্থায় থাকা দুর্নীতিবাজ, দলবাজদের বিদায় করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত ও দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। আগে নিজদলের বেপরোয়া ও বেআদবদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনী ব্যবস্থা গ্রহন করে শুরু করতে হবে। তখন বাকীরা সতর্ক হয়ে যাবে।
জনগণ প্রত্যাশা করেন,রাষ্ট্র ও সংবিধান সংস্কারের ব্যাপারে বিএনপি বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে একটি রাজনৈতিক সমঝোতা বা মীমাংসার পথ বেছে নেবে। শুরু থেকেই জাতীয় সংসদ তর্কবিকর্ত ও আলাপ আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হবে।