চলতি মৌসুমের চার মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো নিশ্চিত হয়নি লবণের ন্যায্যমূল্য। সামনে সময় আছে মাত্র দুই থেকে আড়াই মাস। এমন পরিস্থিতিতে দিশেহারা কক্সবাজার উপকূলের হাজার হাজার লবণ চাষি। তাদের দাবি-প্রতি মণ লবণে লোকসান গুনতে হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৭০ টাকা পর্যন্ত। মাঠ পর্যায়ে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে নতুন সরকারের দিকে তাকিয়ে আছেন তারা।
কক্সবাজারের চৌফলদণ্ডী উপকূলের বাজারপাড়ার লবণ চাষি জিয়ার খান। গেল বছর তিন কানি জমিতে লবণ চাষ করে লোকসান গুনতে হয়েছে প্রায় দেড় লাখ টাকা। এবারও তিন কানি জমিতে লবণ মাঠ করলেও ন্যায্যমূল্য না পেয়ে চরম হতাশায় দিন কাটছে তার।
লবণ চাষি জিয়ার খান (৪৭) বলেন, 'আমরা লবণের ন্যায্যমূল্য চাই। বর্তমানে প্রতি মণ লবণ উৎপাদন করতে আমাদের প্রায় ৪০০ টাকা খরচ হয়, কিন্তু বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ২০০ টাকায়। গত বছর আমার প্রায় দেড় লাখ টাকার মতো লোকসান হয়েছে, এবছরও দেড় লাখ টাকার মতো লোকসান হবে। এভাবে চলতে থাকলে লবণ চাষ টিকিয়ে রাখা খুবই কঠিন হয়ে পড়বে।'
বর্তমানে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় পুরোদমে চলছে লবণ উৎপাদন। কিন্তু চাষিদের চোখে-মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ। মৌসুমের চার মাস পার হলেও এখনো নিশ্চিত হয়নি লবণের ন্যায্যমূল্য। চাষিদের দাবি- প্রতি মণ লবণ উৎপাদনে খরচ হয় ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা। অথচ মৌসুমের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত প্রতিমণ লবণ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১৮০ থেকে ২০০ টাকায়।
চাষি সিরাজুল ইসলাম (৫৫) বলেন, 'লবণ চাষ করতে অনেক টাকা খরচ হয়। কিন্তু সেই খরচের তুলনায় দাম একেবারেই কম। এখন প্রতি মণ লবণ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১৮০ টাকায়, অথচ উৎপাদন খরচই পড়ে এর চেয়ে অনেক বেশি। খরচ উঠানোই কঠিন হয়ে যাচ্ছে। ফলে আমরা চাষিরা একেবারে বড় ধরনের লোকসানে পড়ছি।'
আরেক চাষি সৈয়দ আলম (২৮) বলেন, 'লবণের মাঠ করে এখন কোনো লাভ হচ্ছে না। টানা দুই বছর ধরে লোকসান গুনতে হচ্ছে। এই অবস্থায় শুধু লবণ চাষ করে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে, ঠিকমতো খেতেও পারছি না। বাসায় ছোট একটা দোকান আছে বলেই কোনোভাবে চলতে পারছি। লবণের দামটা যদি একটু বাড়ত, তাহলে আমাদের মতো চাষিদের জন্য কিছুটা স্বস্তি হতো।'
লবণ চাষি রিয়াদুল হক (৩০) বলেন, 'গতবছর এক বান্ডিল ত্রিপলের দাম ছিল প্রায় ৩ হাজার টাকা, এখন তা বেড়ে হয়েছে ৫ হাজার টাকা। শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে, তেলও এখন সহজে পাওয়া যায় না-টাকা দিয়েও অনেক সময় পাওয়া কঠিন হচ্ছে। এত খরচের পরও বর্তমানে প্রতি মণ লবণ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২০০ টাকায়। এই দামে আমাদের খরচই ওঠে না। অন্তত ৪০০ টাকা মণ হলে আমরা কিছুটা পুষিয়ে নিতে পারতাম।'
এদিকে নির্বাচনের আগে জনপ্রতিনিধিরা লবণ চাষিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছিলেন। এখন সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অপেক্ষায় উপকূলের হাজার হাজার লবণ চাষি।
লবণ চাষি নুরুল আলম (৪২) বলেন, 'আমরা বর্তমান সরকারের কাছে এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন সাহেবের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি, যেন লবণ চাষিরা তাদের উৎপাদিত লবণের ন্যায্যমূল্য পায়। আমাদের একটাই দাবি-লবণের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা হোক।'
আরেক চাষি রফিকুল ইসলাম (৩৮) বলেন, 'আমরা অতি দ্রুত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই, যাতে লবণ চাষিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা হয়। কারণ বর্তমান অবস্থায় আমরা চাষিরা বাঁচতে পারছি না। বাজারে যেখানে এক প্যাকেট লবণের দাম প্রায় ৪০ টাকা, সেখানে আমাদের মাঠের লবণ কিনে নেওয়া হচ্ছে মাত্র ৩ টাকায়। এভাবে চলতে থাকলে আমরা কীভাবে বাঁচবো?'
তবে মাঠ পর্যায়ে লবণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন লবণ চাষি কল্যাণ সমিতির নেতারা।
কক্সবাজার চেম্বারের সভাপতি ও লবণ চাষি কল্যাণ সমিতির উপদেষ্টা আবদুল শুক্কুর বলেন, 'কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল সল্ট’ নামে বিদেশ থেকে লবণ আমদানি করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করছে। আদৌ এসব লবণ আমদানির প্রয়োজন আছে কি না, সেটি যাচাই করার কার্যকর কোনো ব্যবস্থা আছে বলেও মনে হয় না। অথচ এখন কক্সবাজারেই ধবধবে সাদা ও মানসম্মত লবণ উৎপাদন হচ্ছে। তবুও আমদানির কারণে স্থানীয় চাষিরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। এছাড়া ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি’র অপব্যবহারও বাজারকে প্রভাবিত করছে। তাই আমরা সরকারের কাছে অনুরোধ জানাই-অতি দ্রুত লবণ আমদানি বন্ধ করে চাষিদের রক্ষায় উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হোক।'
কক্সবাজারস্থ লবণ শিল্পের উন্নয়ন কার্যালয়ের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভুঁইয়া বলেন, 'চলতি মৌসুমে লবণ চাষিরা মাঠে নামতে কিছুটা দেরি হয়েছে। তারপরও এখন আবহাওয়া অনুকূলে, পুরোদমে লবণ চাষও হচ্ছে। আশা করি-এখন মাঠে লবণ উৎপাদনের পরিমাণ অনেক বেশি বাড়বে। আর লবণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে সরকার কাজ করছে। আশা করা যায়- লবণের দাম বাড়বে। তবে এখনো লবণ চাষের জমি পরিমাণ ও কত চাষি মাঠে নেমেছে এই পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। এটা নিয়ে বিসিক কাজ করছে।'
বিসিক জানায়-গত মৌসুমে ৬৮ হাজার ৫০৫ একর জমিতে উৎপাদিত হয়েছিল ২৫ লাখ ২৮ হাজার মেট্রিক টন লবণ। আর চলতি মৌসুমে ২৭ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও চার মাসে উৎপাদন হয়েছে মাত্র ৪ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন।