কক্সবাজারের কুতুবদিয়ার সন্তান মুফতি মুহাম্মদ মুহিববুল্লাহিল বাকীকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি বর্তমানে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের পেশ ইমাম হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন।
গত বৃহস্পতিবার (২১ মে) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চুক্তি ও বৈদেশিক নিয়োগ শাখার উপসচিব মো: গোলান রাব্বানী স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে মুফতি মুহাম্মদ মুহিববুল্লাহিল বাকীকে এ নিয়োগ দেওয়া হয়।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ইসলামিক ফাউন্ডেশন আইন ১৯৭৫-এর ধারা ৫ (ক)(১) ও (২) অনুযায়ী জনাব মুহিব্বুল্লাহিল বাকীকে অন্য যে কোনো পেশা, ব্যবসা, কিংবা সরকারি, আধা-সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান/সংগঠনের সঙ্গে কর্ম-সম্পর্ক পরিত্যাগের শর্তে যোগদানের তারিখ থেকে পরবর্তী এক বছর মেয়াদের জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক (গ্রেড-১) পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রদান করা হলো।
দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক পদে নিয়োগ পাওয়া মুফতি মুহাম্মদ মুহিববুল্লাহিল বাকী পবিত্র হজ্জ আদায় করতে বর্তমানে সৌদিআরব রয়েছেন। ১৯৭৪ সালে কক্সবাজারের কুতুবদিয়ায় জন্ম নেওয়া মুফতি মুহাম্মদ মুহিববুল্লাহিল বাকী কওমি, আলিয়া ও প্রচলিত শিক্ষা ধারায় সমানভাবে শিক্ষিত একজন আলেম হিসেবে সুপরিচিত। তিনি চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী হাটহাজারী আল জামেয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম, ভারতের লখনৌর দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগে অধ্যয়ন করেছেন। কওমি ধারায় দাওরায়ে হাদিস, আলিয়া ধারায় কামিল এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের মাস্টার্স ডিগ্রির সবকটিতে তিনি প্রথম শ্রেণিতে প্রথম অর্জন করেন।
কর্মজীবনে তিনি চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকার ঐতিহ্যবাহী রামপুরা নতুনবাগ মাদ্রাসা, চট্টগ্রামের দারুল মারিফ, দারুল উলুম মাদ্রাসাসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেছেন। এছাড়া, তিনি সম্মিলিত ইমাম খতিব পরিষদের সভাপতি।
ধর্মীয় অঙ্গনেও রয়েছে তার ব্যাপক পরিচিতি। তিনি চট্টগ্রাম আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ সহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মসজিদে খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
ব্যাংকিং খাতের শরিয়াহ তদারকিতেও মুফতি মুহাম্মদ মুহিববুল্লাহিল বাকী'র সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। সর্বশেষ তিনি ইসলামী ব্যাংক সমূহের শরিয়াহ সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান সেন্ট্রাল শরীয়াহ কাউন্সিল ফর ইসলামী ব্যাংকস-এর মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এছাড়া, তিনি স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংকের শরিয়া বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং অগ্রণী ব্যাংক ইসলামী উইং-এর শরিয়া কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এর আগে তিনি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, সোনালী ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক ও বীমা প্রতিষ্ঠানের শরিয়াহ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ধর্মীয় জ্ঞান, আধুনিক শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশাসনিক দক্ষতার সমন্বয়ে মুফতি মুহাম্মদ মুহিববুল্লা হিল বাকী দীর্ঘদিন ধরে দেশের ইসলামী অঙ্গনে বিশেষভাবে পরিচিত।
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতার বিচারক হিসেবেও তিনি সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশ ছাড়াও মিশর ও ভারতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় বিচারক হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। আরবি, উর্দু, হিন্দি, ফারসি, ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় দক্ষতা তাকে বহুমাত্রিক জ্ঞানচর্চার একজন ব্যতিক্রমী আলেম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বিবাহিত এবং তিন পুত্র সন্তানের জনক।
দেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো পেশাদার আলেম ও মসজিদের ইমাম গ্রেড-১ পদমর্যাদার এ প্রশাসনিক উচ্চ পদে নিয়োগ পাওয়ায় বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, তার এ নিয়োগ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কার্যক্রমে নতুন গতি, গবেষণানির্ভর পরিকল্পনা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধভিত্তিক সামাজিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে আরও বেগবান করবে। একই সঙ্গে দেশের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে দক্ষ ও শিক্ষিত আলেমদের সম্পৃক্ততার ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো বলেও মনে করছেন তাঁরা।
তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে সৌদি আরব থেকে মুফতি মুহাম্মদ মুহিববুল্লাহিল বাকী গণমাধ্যমকে বলেন, আল্লাহতায়ালার রহমতে আমার উপর একটি বড় দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। এ দায়িত্ব যেন সঠিকভাবে আদায় করতে পারি, সেজন্য সবার কাছে দোয়া কামনা করছি। আশা করছি আল্লাহর রহমতে দেশের জন্য ভালো কিছু করতে পারব।
এদিকে, ইসলামিক ফাউন্ডেশন কক্সবাজার কার্যালয়ের উপ পরিচালক মুহাম্মদ সরওয়ার আকবর নবনিযুক্ত মহাপরিচালকের সফল দায়িত্ব পালন কামনা করে তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি আরও গতিশীল ও জনমুখী ভূমিকা পালন করবে বলে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
প্রসঙ্গত, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। এর প্রধান কার্যালয় ঢাকায় অবস্থিত, যেটি ৭টি বিভাগীয় কার্যালয়, ৬৪টি জেলা কার্যালয়, ৭টি ইমাম প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং ২৯টি ইসলামিক প্রচারণা কেন্দ্রের সহায়তায় কার্যক্রমসমূহ বাস্তবায়ন করে।