কক্সবাজার শহরে নিয়ন্ত্রণহীন মিশুক ও ইজিবাইক এখন শুধু যানজট নয়, আইনশৃঙ্খলার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ। অভিযোগ রয়েছে, নিবন্ধনহীন এসব যানের অনেকগুলো চালাচ্ছে রোহিঙ্গা ও অপ্রাপ্তবয়স্করা, আবার কিছু যান ব্যবহার করে চালক চালাচ্ছেন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেও। এ পরিস্থিতিতে পর্যটন নগরীর নিরাপত্তা ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে বিশেষ অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ।
বুধবার (১০ জুন) বিকেলে ঘন্টাব্যাপি শহরের কলাতলী মোড় এবং ঘুনগাছ তলায় অভিযানে শতাধিক নিবন্ধনহীন ইজিবাইক ও মিশুক জব্দ করার পাশাপাশি চালকদের আটক করেছে পুলিশ। এছাড়া অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানিয়েছে তারা।
কক্সবাজারে অনিবন্ধিত মিশুক ও ইজিবাইকের দৌরাত্ম্য এখন শুধু যানজট নয়, আইনশৃঙ্খলার জন্যও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব যানবাহনের অনেকগুলো চালাচ্ছে অপ্রাপ্তবয়স্ক ও রোহিঙ্গা চালক, আর কিছু ক্ষেত্রে এগুলো ব্যবহার হচ্ছে ছিনতাই ও মাদকসহ নানা অপরাধে। ফলে পর্যটন নগরীর নিরাপত্তা ও সড়কে শৃঙ্খলা নিয়ে বাড়ছে শঙ্কা।
লাইসেন্সধারী যানবাহনের চেয়ে অবৈধ যান কয়েকগুণ বেশি, যা বাইরের এলাকা থেকেও শহরে প্রবেশ করে পরিস্থিতি আরও জটিল করছে। এতে যানজটের পাশাপাশি বাড়ছে অপরাধের ঝুঁকি ও পর্যটন খাতের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা। স্থানীয়রা বলছেন, শুধু যানবাহন নিয়ন্ত্রণ নয়, মাদক ও অপরাধবিরোধী অভিযান জোরদার করা জরুরি।
পর্যটন ব্যবসায়ী রুমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজারে কিছু অনিবন্ধিত মিশুক ও ইজিবাইক চলাচল করছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুরাও এসব যানবাহন চালাচ্ছে, যা আইন ও নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
তিনি বলেন, এসব যানবাহনের বেশিরভাগেরই কোনো বৈধ নিবন্ধন নেই। কিছু ক্ষেত্রে এসব যানবাহন মাদক পরিবহন, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাই পর্যটন নগরীর নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে অনিবন্ধিত যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি ও নিয়মিত অভিযান প্রয়োজন।
কক্সবাজার শহরের বাসিন্দা আল আমিন বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত অনেক অপরাধের ঘটনায় রোহিঙ্গাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠে এসেছে। তাঁর দাবি, বিভিন্ন অপরাধ তদন্তে প্রায়ই কোনো না কোনোভাবে রোহিঙ্গা সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়-হোক তা সরাসরি অংশগ্রহণ, ভাড়াটিয়া হিসেবে অবস্থান বা অন্য কোনো সংযোগের মাধ্যমে।
তিনি বলেন, এসব ঘটনার কারণে কক্সবাজারের স্থানীয় বাসিন্দাদের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে। স্থানীয় জনগণের পরিবর্তে বাইরে থেকে আসা কিছু ব্যক্তি অপরাধে জড়ালেও তার নেতিবাচক প্রভাব পুরো এলাকার মানুষের ওপর পড়ে। তাই অপরাধে জড়িতদের পরিচয় নিশ্চিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নিরপরাধ স্থানীয়দের যেন দায়ভার বহন করতে না হয়, সেদিকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
কক্সবাজার গ্যারেজ মালিক সমিতি কল্যাণ পরিষদের সভাপতি আব্দুল জলিল ডালিম বলেন, একসময় কক্সবাজারে প্রায় তিন হাজার লাইসেন্সধারী মিশুক ও টমটম চলাচল করত এবং তখন যানবাহন ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত ছিল। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে আরও লাইসেন্স যুক্ত হওয়ায় বর্তমানে লাইসেন্সের সংখ্যা প্রায় চার হাজারে পৌঁছেছে। তবে বাস্তবে শহরে মিশুক ও টমটম মিলিয়ে প্রায় ১১ হাজার যানবাহন চলাচল করছে বলে তাঁর দাবি।
তিনি বলেন, কক্সবাজারের বাইরে থেকে ঈদগাঁও, চকরিয়া, হারবাং, খুরুশকুলসহ বিভিন্ন এলাকা থেকেও বিপুল সংখ্যক যানবাহন শহরে প্রবেশ করে। ফলে পর্যটননির্ভর এই শহরে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয় এবং জনদুর্ভোগ বাড়ে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চাইলে এ বিষয়ে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
ডালিমের অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে যানবাহনের মালিকরা গাড়ি ভাড়ায় চালানোর জন্য রোহিঙ্গা ও বাইরের লোকজনের হাতে তুলে দেন। এতে নিয়ন্ত্রণহীনতা তৈরি হয় এবং নানা ধরনের অপরাধের ঝুঁকি বাড়ে। তিনি বলেন, পর্যটকদের ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়াসহ বিভিন্ন ঘটনার অভিযোগও মাঝে মাঝে পাওয়া যায়, যা কক্সবাজারের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
তিনি আরও বলেন, কক্সবাজারের অন্যতম বড় সমস্যা মাদক। তাঁর দাবি, শহরের বিভিন্ন এলাকায় মাদকের বিস্তার রয়েছে। তাই যানবাহন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মাদকবিরোধী অভিযান আরও জোরদার করা প্রয়োজন, যাতে পর্যটন নগরীর নিরাপত্তা ও সুনাম রক্ষা করা যায়।
এমন পরিস্থিতিতে পর্যটন নগরী কক্সবাজারকে নিরাপদ করতে মাঠে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অভিযানে শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়ে তল্লাশি চালানো হয়। এসময় কাগজপত্রবিহীন ও নিয়ম লঙ্ঘনকারী শতাধিক মিশুক ও ইজিবাইক জব্দ করা হয়। এছাড়া শতাধিক অপ্রাপ্ত বয়স্ক এবং রোহিঙ্গা চালকদের আটক করা হয়।
সচেতন মহল বলছে- কক্সবাজারে চুরি, ছিনতাইসহ অপরাধ কমাতে প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কাজ করবে স্থানীয় প্রতিনিধিরাও।
কক্সবাজার পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর আশরাফুল হুদা সিদ্দিকী জামশেদ বলেন, কক্সবাজার পর্যটন নগরীর বিভিন্ন এলাকায় চুরি, ছিনতাইসহ নানা ধরনের অপরাধ বেড়ে যাওয়ায় জেলা পুলিশ সুপার ও কক্সবাজার সদর মডেল থানার কর্মকর্তারা পৌরসভার ১২টি ওয়ার্ডের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, কিছু রোহিঙ্গা বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে এবং এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে।
তিনি বলেন, বিশেষ করে ইজিবাইক ও টমটম চালকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোহিঙ্গা রয়েছে বলে বৈঠকে আলোচনা হয়। এ কারণে তাদের এসব যানবাহন চালানো নিয়ন্ত্রণে আনতে একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে পুলিশ অভিযান পরিচালনা করছে।
জামশেদের মতে, এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকলে অবৈধভাবে ক্যাম্পের বাইরে অবস্থান করে যানবাহন চালানো ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে এবং কক্সবাজারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে।
পুলিশ জানিয়েছে, কক্সবাজারের নিরাপত্তা নিশ্চিতে মিশুক ও ইজিবাইক চালকদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চলছে।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার পরিদর্শক শেখ মোহাম্মদ আলী বলেন, দেশ-বিদেশ থেকে বিপুল সংখ্যক পর্যটক কক্সবাজারে আসেন। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই পুলিশ এ অভিযান পরিচালনা করছে। অভিযানে টমটম ও ইজিবাইক চালকদের পরিচয় যাচাই করা হচ্ছে, তারা রোহিঙ্গা কি না কিংবা অন্য কোনো এলাকা থেকে এসেছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, অনেক অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু ইজিবাইক ও মিশুক চালাচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এসব শিশু কীভাবে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে এবং তারা কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত কি না, তা তদন্ত করা হচ্ছে। শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ড ও অপরাধ থেকে দূরে রাখাও এ অভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্য।
শেখ মোহাম্মদ আলী জানান, অভিযানে শতাধিক ইজিবাইক ও মিশুক জব্দ করা হয়েছে। চালকদের পরিচয় যাচাই-বাছাই চলছে। পাশাপাশি যারা বয়স ও পরিচয় যাচাই না করেই ১৪-১৫ বছরের শিশুদের হাতে টমটম তুলে দিয়েছেন, সেই মালিকদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পর্যটন নগরী কক্সবাজারে ১১ হাজারের বেশি ইজিবাইক ও মিশুক চলাচল করছে। যার বেশির ভাগই নিবন্ধিনহীন। এসব যানবাহনের অধিকাংশ চালকই রোহিঙ্গা কিংবা অপরাধ কর্মকাণ্ড জড়িত বলছে সংশ্লিষ্টরা।