কক্সবাজার সৈকতের সৌন্দর্য, ঢেউয়ের খেলা, সূর্যাস্ত, ঝর্ণা-পাহাড়ের নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখতে ছুটে আসা পর্যটকরা অনেকটা হতাশ। গত কয়েক বছর থেকে সৈকতে ভাঙ্গন, প্লাস্টিক বর্জ্য, ময়লা পানিসহ নানা সমস্যায় ভুগছেন পর্যটকেরা। কর্তৃপক্ষ বলছেন পর্যাপ্ত ডাস্টবিন থাকলেও তা ব্যবহার করছে না কিছু পর্যটক ও ব্যবসায়ী।
গতকাল বুধবার (২১ অক্টোবর) সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে ঘুরে দেখা যায়, সৈকতের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ময়লা, কাঁদা, প্লাস্টিকের বর্জ্য। নারিকেলের খোসা, চিপসের প্যাকেট, মিলারেল পানির খালি বোতল, কলার খোসা ও বিভিন্ন ধরনের পণ্যের প্যাকেটে যেন সয়লাব সৈকত। সুগন্ধায় ফিস ফ্রাইয়ের বর্জ্যে আরও বেহাল অবস্থা। অন্যদিকে অধিকাংশ হোটেলে এসটিপি ব্যবস্থা না থাকায় ময়লা-বর্জ্য সরাসরি পড়ছে বালিয়াড়িতে। ফলে মশা, মাছি ও বিভিন্ন ধরনের পোকার উপদ্রব বেড়েছে। সুগন্ধার সী প্রিন্সেস হোটেল, গ্রীণ নেচার ও কলাতলী ৯৯ ব্রাইডাল হাউস-এর বর্জ্য সরাসরি পড়ছে বালিয়াড়িতে। সবচেয়ে বেশি অপরিষ্কার -অপরিচ্ছন্ন দেখা কলাতলী সৈকতের মেইন প্রবেশ পথে। ৯৯ ব্রাইডাল হাউস-এর ময়লা পানি ড্রেন ফুটো করে সরাসরি রাস্তায় ফেলা হচ্ছে। সেই ময়লা পানি সড়কের ওপর দিয়ে সরাসরি পড়ছে সৈকতে। জমানো ময়লা পানি থেকে বের হচ্ছে দুর্গন্ধ। পর্যটকরা নাকে হাত দিয়ে সৈকতে নামতে দেখা যায়। এতে বিপাকে পড়েছে পর্যটকরা।
সৈকতে পড়া পঁচা পানি বন্ধে
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা দু'পাশে বালু ভর্তি চটের বস্তা দিয়েছে। তাতেও সমাধান হচ্ছে না। চটের বস্তা ফুটো হয়ে ময়লা পানি পড়ছে সাগরে। আর সেই পানিতে গোসল করছে পর্যটকেরা। এসব দেখে অনেকটা বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ অনেক পর্যটক। অধিকাংশ পর্যটক বলছেন, সৈকতের পরিবেশ রক্ষা করতে না পারলে পর্যটক কমবে কক্সবাজারে।
কলাতলী শৃঙ্খলা কমিটির আহবায়ক ১২
জেলা যুবদলের সহ ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক মো: নাছির উদ্দীন দৈনিক কক্সবাজারকে বলেন, কলাতলী মেইন রোড থেকে ড্রেনে ময়লা আটকে পানি চলাচলের রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। বিভিন্ন ছিদ্র দিয়ে পানি বের হয়ে সৈকতে গিয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কয়েকবার অবগত করা হয়েছিল, কিন্তু কোন সমাধান হয়নি। প্রতিদিন পর্যটকেরা অভিযোগ করেন। এছাড়া আশেপাশের ব্যবসায়ীরাও ঠিক মত ব্যবসা করতে পারছেন না।
বুধবার বিকেলে কথা হয় কলাতলীর স্থানীয় ব্যবসায়ী আরিফুল হক তানিমের সাথে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে কলাতলী সৈকতের মেইন প্রবেশ পথে ময়লা পানি ও বর্জ্য। পর্যটকেরা সুন্দর করে হাঁটাচলা করতে পারছেন না। ছোট ছোট গর্তে পড়ে অনেক পর্যটক আহত হয়েছেন। ড্রেনের পানি থেকে প্রচন্ড দুর্গন্ধে ঠিক মতো দোকানে বসতে পারেনা ব্যবসায়ীরা। এ অবস্থা চলতে থাকলে পর্যটক কমে যাবে। এজন্য তিনি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।'
কলাতলী বীচে দেখা মেলে গাজিপুর থেকে আসা কাজল-সুজানা দম্পতির। সুজানা বলেন, 'তিন মাস আগে থেকে কক্সবাজার আসার পরিকল্পনা করে রাখি। পূজার বন্ধে একমাত্র সন্তানকে নিয়ে বেড়াতে আসলাম। আগে থেকে কলাতলী সৈকত আমাদের পছন্দ। কিন্তু, প্রবেশ পথে কালো ময়লা পানি সৈকতে পড়ছে। এটা দেখে আর গোসল করা হয়নি। কাজল বলেন, গত বছরও দেখলাম একই অবস্থা। এখানে কি কারো দায়িত্ব নেই? একটা সৈকতের মুখে এত আবর্জনা ও ময়লা পানি জমে আছে, অথচ কারো নজরে আসছে না, খুবই দুঃখজনক।'
চট্টগ্রামের চান্দঁগাও আবাসিক এলাকা থেকে পরিবার নিয়ে গত সোমবার কক্সবাজারে এসেছেন ল্যান্ড ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আবুল কাশেম। তিনি বলেন, সকালে সুগন্ধা বিচে গিয়েছিলাম। বেশি মানুষের কারণে ফিরে আসি। বিকেলে কলাতলী সৈকতে নামতে গিয়ে দুর্গন্ধ ময়লা পানি দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
বলেন, 'পুরো সৈকতজুড়ে ময়লা। এগুলো দেখার কি কেউ নেই ? পর্যটকের কথা মাথায় রেখে সৈকত পরিস্কার রাখা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।'
কুমিল্লা থেকে বেড়াতে আসা নাফিস ইকবাল বলেন, 'কক্সবাজারে অনেক মজা করবো বলে বন্ধুরা মিলে এসেছি। কিন্তু পরিবেশের সাথে বাস্তবের মিল খুঁজে পাচ্ছি না। পানি অপরিষ্কার, সৈকতের পাশ দিশে হাঁটা যাচ্ছে না। একটা গন্ধ নাকে লাগছে। যার কারণে গোসল করা হয়নি।'
নারায়নগঞ্জ থেকে বেড়াতে আসা পর্যটক সুমন বিশ্বাস বলেন, 'আমি আমার স্ত্রী ও দুই বাচ্চা নিয়ে সৈকত এসে ছাতার নিচে বসলাম, কিন্তু পিছনেই কি পরিমান ময়লা তা আপনারা দেখতে পাচ্ছেন। এই যদি হয় সৈকতের পরিবেশ- তাহলে ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে দুর্গন্ধের মধ্যে কীভাবে বসবো। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সৈকতের পরিবেশ রক্ষা করার জন্য এখনই পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।'
এদিকে ময়লা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার জন্য জেলা প্রশাসন থেকে মোড়ে মোড়ে ডাস্টবিন বসানো হয়েছে। কিন্তু অনেকেরই হাতে থাকা পানির বোতল, চিপস, বিরিয়ানি-নাস্তার প্যাকেট, বাদামের প্যাকেট ইত্যাদি নির্দিষ্ট না ফেলে বালিয়াড়িতে ফেলতে দেখা যায়।
এ বিষয়ে কথা হয় একাধিক ঝাল মুড়ি, আইসক্রিম, চানাচুর, চাটনি বিক্রেতাসহ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর সঙ্গে। তাদের প্রত্যেকের দোকানের আশপাশে ময়লা, পলিথিন, আচারের প্যাকেটসহ নানা ময়লা থাকলেও তারা বলেন-আমরা প্রত্যেক দোকানদার ডাস্টবিন ঝুড়ি ব্যবহার করছি। এখন পর্যটকরা তাতে ময়লা না ফেললে আমরা কি করতে পারি? আবার কেউ কেউ বলছেন, এই ময়লা তাঁদের দোকানের না। এরকম একাধিক ব্যবসায়ী দায়সারা বক্তব্য দেন
পরিবেশবাদীরা বলছেন, 'সৈকত বা রাস্তা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা সকলের দায়িত্ব। সৈকত রাস্তাঘাট পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা এটা শুধু কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব, কিন্তু না। ময়লা আবর্জনা ফেলার সময় নির্দিষ্ট ডাস্টবিন ব্যবহার করলেই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হবে। সেজন্য পর্যটক ও স্থানীয়সহ আমাদের সকলের সচেতন হতে হবে।'
জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুর রহমান সায়েম দৈনিক কক্সবাজারকে বলেন, 'যে যেদিকে পারছে সেদিকেই দোকান বসাচ্ছে; অভিযান চালিয়েও তাঁদের দমানো যাচ্ছে না। তারা দোকানের পানি সড়কে ফেলছে। সরেজমিনে গিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের আশ্বাস দেন তিনি।'
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) তাসনিম জাহান বলেন, 'কলাতলী, সুগন্ধা বা যেকোনো পয়েন্ট দিয়ে বৃষ্টির পানি বা ময়লা পানি সৈকতে পড়তে পারে। কিন্তু, বৃষ্টির পানি না হয়ে যদি ড্রেনের পানি পড়ে থাকে, তাহলে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পর্যটকের স্বার্থে জেলা প্রশাসন কাজ করে যাচ্ছে।'