বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত আবারও বড় সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। গ্রীষ্মকাল ও সেচ মৌসুম সামনে রেখে বিদ্যুৎ বিভাগ ২০ হাজার ১৩৬ কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, সময়মতো এই অর্থ না পেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং দেশজুড়ে ভয়াবহ লোডশেডিং দেখা দিতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই সংকট হঠাৎ তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতা, অতিরিক্ত ব্যয়, আমদানি নির্ভরতা এবং পরিকল্পনার ঘাটতির ফলেই আজ বিদ্যুৎ খাত এমন অনিশ্চয়তার মুখে।
সক্ষমতা বেশি, কিন্তু বিদ্যুৎ কম, এই বৈপরীত্য কেন?
বাংলাদেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় ২৮,৯১৯ মেগাওয়াট, আর ক্যাপটিভ ও অফ-গ্রিডসহ (ক্যাপটিভ পাওয়ার হলো নিজস্ব ব্যবহারের জন্য স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, যেমন- কারখানার নিজস্ব জেনারেটর, যা সাধারণত গ্রিডের ওপর নির্ভরতা কমায়। অন্যদিকে, অফ-গ্রিড সিস্টেম হলো এমন বিদ্যুৎ ব্যবস্থা যা সরকারি বা পাবলিক বিদ্যুৎ গ্রিডের সাথে যুক্ত নয় এবং ব্যাটারি স্টোরেজ ব্যবহার করে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করে।) দেশের মোট সক্ষমতা ৩২ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি। অথচ সর্বোচ্চ বিদ্যুতের চাহিদা ২০২৫ সালে ছিল মাত্র ১৬,৭৯৪ মেগাওয়াট। অর্থাৎ কাগজে-কলমে চাহিদার তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে।
তবুও কেন লোডশেডিং? এর মূল কারণ তিনটি-
# জ্বালানি সংকট
# অর্থ সংকট
# পরিকল্পনার দুর্বলতা
বাস্তবে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর মতো গ্যাস বা কয়লা নেই। ফলে সক্ষমতা থাকলেও উৎপাদন হচ্ছে না। এতে একদিকে বিদ্যুৎ সংকট তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে অচল বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য সরকারকে অর্থ গুনতে হচ্ছে।
জ্বালানি নির্ভরতার ঝুঁকি:
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশই এখন আমদানি নির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ২০২৬ সালের জ্বালানি পরিস্থিতি অনুযায়ী, বাংলাদেশ জীবাশ্ম জ্বালানির (তেল, গ্যাস ও কয়লা) উপর চরমভাবে নির্ভরশীল, যার সিংহভাগ আমদানি করতে হয়। তীব্র বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে আমদানিকৃত জ্বালানি তেল, এলএনজি ও কয়লার মূল্যের ওপর ভিত্তি করে মোট জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ, বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রধানত ডিজেল, গ্যাস ও কয়লার উপর নির্ভরশীলতা বজায় রয়েছে।
জ্বালানি নির্ভরতার প্রধান দিকসমূহ (২০২৬ সালের এপ্রিলের পরিস্থিতি অনুযায়ী):
তেল (তেল নির্ভরতা): দেশে প্রতি বছর প্রায় ৬৫-৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়, যার বড় অংশই ডিজেল। স্থানীয় পরিশোধনের (ইস্টার্ন রিফাইনারি) ক্ষমতা মাত্র ২০% হওয়ায় প্রায় ৮০% পরিশোধিত তেল আমদানি করতে হয়।
গ্যাস ও এলএনজি: বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ শিল্পের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে এলএনজি (LNG) আমদানির উপর নির্ভরতা বাড়ছে।
কয়লা: বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ধরে রাখতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য কয়লা আমদানি অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
অর্থনৈতিক প্রভাব: আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির ফলে ২০২৬ সালের মার্চ-এপ্রিল নাগাদ জ্বালানি আমদানি ব্যয় প্রায় ৪.৮ বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।
এই চিত্র স্পষ্ট করে যে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত এখনও জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, কয়লা বা এলএনজির দাম বাড়লেই বিদ্যুৎ খাত বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
বকেয়া বিলের চাপ ও বিদ্যুৎ সংকট:
বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতের আরেকটি বড় সমস্যা হলো বকেয়া বিল। সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদকদের বিল সময়মতো পরিশোধ করতে না পারায় অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র জ্বালানি কিনতে পারছে না।
একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৪,০০০ কোটি টাকার বেশি বকেয়া থাকায় সেটি বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ওই কেন্দ্রটি বন্ধ হলে প্রায় ১,১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।
এছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদকদের সংগঠন জানিয়েছে, বিল পরিশোধে দেরি হওয়ায় তারা জ্বালানি আমদানির জন্য এলসি খুলতে পারছে না, যা গ্রীষ্মকালে বিদ্যুৎ সংকট আরও বাড়াতে পারে।
ক্যাপাসিটি চার্জ: উৎপাদন না করেও বিল: ( ক্যাপাসিটি চার্জ হলো বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও বা অলস বসিয়ে রাখলেও চুক্তি অনুযায়ী যে নিশ্চিত অর্থ বা ভাড়া দেওয়া হয়) বিদ্যুৎ খাতে সবচেয়ে বড় বিতর্কিত বিষয় হলো ক্যাপাসিটি চার্জ। অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন না করলেও সরকারকে নির্দিষ্ট অর্থ দিতে হচ্ছে।
চাহিদার তুলনায় বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন দেওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলেও সরকারকে হাজার হাজার কোটি টাকা দিতে হচ্ছে। এটি বিদ্যুৎ খাতকে আর্থিকভাবে দুর্বল করে ফেলছে এবং ভর্তুকির ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে।
আমদানি করা বিদ্যুতের বাড়তি চাপ:
বাংলাদেশ এখন ভারত থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ আমদানি করছে। বর্তমানে প্রায় ২,৬৯৬ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ আমদানি করা হচ্ছে বিভিন্ন আন্তঃদেশীয় সংযোগের মাধ্যমে।
কিন্তু এই আমদানিকৃত বিদ্যুৎ ডলার নির্ভর। ফলে টাকার অবমূল্যায়ন হলে বিদ্যুৎ খরচ আরও বেড়ে যায়। এতে ভর্তুকির চাপ বাড়ে।
সামনে কী হতে পারে:
বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে গ্রীষ্মকালে কয়েকটি ঝুঁকি তৈরি হতে পারে-
# দীর্ঘ সময় লোডশেডিং
# শিল্প উৎপাদন কমে যাওয়া
# কৃষিতে সেচ সংকট
# অর্থনীতিতে ধীরগতি
# জনজীবনে দুর্ভোগ
# বিশেষ করে সেচ মৌসুমে বিদ্যুৎ সংকট হলে খাদ্য উৎপাদনেও প্রভাব পড়তে পারে।
সম্ভাব্য সমাধানের পথ:
এই সংকট থেকে উত্তরণে কয়েকটি বাস্তব পদক্ষেপ জরুরি-
১. বিদ্যুৎ পরিকল্পনা পুনর্মূল্যায়নঃ
চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিকল্পনা করতে হবে।
২. নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগঃ
সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের অংশ বাড়ানো জরুরি।
৩. দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানঃ
দেশীয় জ্বালানি বাড়ানো ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নেই।
৪. ক্যাপাসিটি চার্জ পুনর্বিবেচনাঃ
অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে হবে।
৫. বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতাঃ
নীতিগত দুর্বলতা দূর করতে হবে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ভর্তুকি দিয়ে সাময়িকভাবে সংকট সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।
বাস্তবতা হলো, বিদ্যুৎ খাতের সমস্যার সমাধান না হলে শুধু লোডশেডিংই বাড়বে না, বরং অর্থনীতির গতিও থমকে যাবে।
সুতরাং এখনই সময় বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, অন্যথায় সামনে অন্ধকার গ্রীষ্ম অপেক্ষা করছে।
লেখক: উৎসব পাল