তীব্র তাপদাহ থেকে স্বস্তি খুঁজতে পর্যটকেরা ছুটে আসছিলেন পর্যটন নগরী কক্সবাজার-এ। নোনাজল আর নরম বালিয়াড়িতে ছিল ভ্রমণপিপাসুদের উচ্ছ্বাস।
তবে হঠাৎ বজ্রপাত ও ভারী বর্ষণে বুধবার (২৯ এপ্রিল) ফাঁকা হয়ে যায় বিশে^র দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের বালুচর। উত্তাল সাগর ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে সৈকতে যেমন কমে যায় মানুষের উপস্থিতি, তেমনি সমুদ্রস্নান থেকেও দূরে সরে যান পর্যটকেরা।
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট বায়ুচাপের প্রভাবে গত মঙ্গলবার থেকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত জারি করেছে আবহাওয়া অফিস। এতে উত্তাল হয়ে উঠেছে সাগর; ঢেউয়ের উচ্চতা পৌঁছায় ৬ থেকে ৭ ফুটে। এর সঙ্গে ছিল ঝড়ো হাওয়া ও ভারী বৃষ্টিপাত।
বুধবার কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের লাবনী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্ট এবং হোটেল-মোটেল জোন ঘুরে দেখা যায়, সকাল থেকেই লাবনী ও কলাতলী সৈকত ছিল প্রায় পর্যটকশূন্য। তবে সুগন্ধা পয়েন্টে হাতেগোনা কয়েক হাজার পর্যটক দেখা গেছে। উত্তাল সাগর দেখে কেউ সমুদ্রস্নানে নামেননি; অল্প সময় বালিয়াড়িতে হাঁটাহাঁটি করে হোটেলে ফিরে যান।
দুপুরের পর শুরু হয় বজ্রপাতের সঙ্গে ভারী বর্ষণ। এতে দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনটি পয়েন্টের বালুচর একেবারে ফাঁকা হয়ে যায়। সৈকতপাড়ের ফটোগ্রাফার, বিচ বাইক, ঘোড়াওয়ালা, জেটস্কি চালক ও ছোট ব্যবসায়ীরাও সরে যেতে বাধ্য হন।
অন্যদিকে ভারী বর্ষণে হোটেল-মোটেল জোনের প্রধান সড়কে পানি উঠে যায়, এতে পর্যটক ও স্থানীয়দের ভোগান্তি বাড়ে। যদিও সন্ধ্যার পর বৃষ্টি কমলে পানি নেমে যায়। হোটেল-মোটেল জোন, বার্মিজ মার্কেট ও রেস্তোরাঁগুলোও ছিল ফাঁকা।
হোটেল, রেস্তোরাঁ ও দোকান মালিকরা জানান, বজ্রপাত ও ভারী বর্ষণের কারণে পর্যটন ব্যবসায় মন্দা চলছে। অনেক হোটেলে থাকা পর্যটকরাও বৈরী আবহাওয়ায় কক্সবাজার ছাড়তে শুরু করেছেন।
লাবনী পয়েন্টের চটপট্টি ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বাবু বলেন, টানা দুই দিনের বৈরী আবহাওয়ায় সৈকতকেন্দ্রিক ব্যবসা একেবারে মন্দায় পড়েছে। পর্যটক ও স্থানীয়দের সমুদ্রসৈকতে উপস্থিতি কমে যাওয়ায় বিক্রিও তলানিতে নেমেছে। বুধবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তার বিক্রি হয়েছে মাত্র ৫০০ টাকা, যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় খুবই কম।
লাবনী ছাতা মার্কেটের ব্যবসায়ী শমশের আলম বলেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে পর্যটক না থাকায় গত দুই দিন ধরে বেচাকেনা প্রায় বন্ধ। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন তিনি। একই পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন ছাতা মার্কেটের প্রায় দেড়শ’ দোকানি; পর্যটকশূন্য সৈকতের প্রভাব পড়েছে পুরো মার্কেটজুড়েই।
প্রাসাদ প্যারাডাইস হোটেলের মহা-ব্যবস্থাপক মো. ইয়াকুব আলী বলেন, বৈরী আবহাওয়া ও রাস্তাঘাটে পানি জমে থাকার কারণে হোটেল ব্যবসায় মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। বর্তমানে হোটেলের মাত্র ২৫ শতাংশ রুমে পর্যটক অবস্থান করছেন।
তিনি জানান, আবহাওয়ার অবনতি ও বজ্রপাতের আতঙ্কে অনেক পর্যটক রুম ছেড়ে নিজ গন্তব্যে ফিরে যাচ্ছেন। রাস্তায় পানি জমে থাকায় তারা বাইরে বের হতে পারছেন না, ফলে ব্যবসায়িক ক্ষতি আরও বাড়ছে।
ভিস্তা বে রিসোর্টের জেনারেল ম্যানেজার মো. আউয়াল খান শান্ত বলেন, “বৈরী আবহাওয়া, বজ্রপাত ও ঘনঘন লোডশেডিংয়ে রিসোর্ট ব্যবসা চরম সংকটে পড়েছে। ৬৪টি রুমের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ১৪টিতে পর্যটক রয়েছেন, বাকিগুলো খালি পড়ে আছে। যে ক’জন পর্যটক অবস্থান করছেন তারাও রাতেই চলে যাচ্ছেন। বিশেষ করে দিনের বেলায় টানা প্রায় ৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে উঠেছে।”
কলাতলী-মেরিন ড্রাইভ হোটেল রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, টানা দুই দিনের বৈরী আবহাওয়ায় কক্সবাজারে পর্যটকের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। অতিবৃষ্টি ও বজ্রপাতের কারণে সৈকত প্রায় ফাঁকা, অনেক হোটেলের বুকিংও বাতিল হয়েছে।
তিনি বলেন, অতিরিক্ত বৃষ্টিতে রাস্তাঘাটে পানি জমে যাওয়ায় মানুষজনের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এমনিতেই অফ-সিজনের কারণে পর্যটক কম, তার ওপর খারাপ আবহাওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। তবে আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে দ্রুতই পর্যটক সমাগম বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সী সেফ লাইফ গার্ড সংস্থার প্রজেক্ট কর্মকর্তা মো. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে ২৯ এপ্রিল কক্সবাজারের লাবনী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টে মাত্র হাজারখানেক পর্যটকের সমাগম হয়েছে। সাম্প্রতিক খারাপ আবহাওয়ায় পর্যটক আগমন কমে গেছে। যারা এসেছেন, তারাও উত্তাল সাগর ও ঝুঁকির কারণে পানিতে নামতে পারেননি।
তিনি জানান, বিভিন্ন পয়েন্টে লাল পতাকা টানানো হয়েছে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়াতে জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় লাইফগার্ডরা টহল দিচ্ছেন। পর্যটকদের পানিতে নামতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সৈকতে ভাসমান টিউব ও অন্যান্য জলক্রীড়া কার্যক্রমও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, চার দিনের ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বায়ুচাপের তারতম্যের কারণে সমুদ্রবন্দরগুলোকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় (সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত) কক্সবাজারে ৫৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
তিনি বলেন, বজ্রপাত ও দমকা হাওয়ার কারণে জনমনে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এ সময় মানুষকে বৈদ্যুতিক তার, বড় গাছ ও খোলা স্থান থেকে দূরে থাকতে হবে। বজ্রধ্বনি শোনা মাত্র নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হবে এবং ঘরের ধাতব বস্তু স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। টিভি, ফ্রিজ, এসি, রাউটারসহ বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির প্লাগ খুলে রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
আরও দুই দিন বজ্রসহ ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে বলে সতর্ক করে তিনি বলেন, সাগরে অবস্থানকারীদের লাইফ গার্ড সংস্থা, বিচকর্মী ও প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।