মিয়ানমারের রাখাইনে নতুন করে সংঘাতের সীমান্তে বাড়ছে উদ্বেগ। বিমান হামলা ও যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সীমান্তমুখী হচ্ছে রোহিঙ্গাদের একটি অংশ। তবে নতুন করে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকার কথা জানিয়েছে বিজিবি ও কোস্টগার্ড। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের চাপ সামলানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে অস্থিরতা যেন কাটছেই না। সেখানে নতুন করে বিমান হামলা ও সংঘাতের তীব্রতা বেড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে। নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় আবারও বাংলাদেশমুখী হওয়ার চেষ্টা করছে রোহিঙ্গারা।
সীমান্তবাসি ও সচেতন মহলের দাবি, সীমান্তে কার্যকর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে অনুপ্রবেশ ঠেকানো সম্ভব হবে না। কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ এবং কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থাই হতে পারে এর কার্যকর সমাধান।
কক্সবাজার আইনজীবী সমিতির সভাপতি আব্দুল মান্নান বলেন, “আমরা সবসময় সীমান্ত নিরাপত্তার কথা বলি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, রাতের অন্ধকারে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে। সীমান্তে কার্যকর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে এই অনুপ্রবেশ ঠেকানো সম্ভব হবে না। মিয়ানমারে সংঘর্ষ থাকুক বা না থাকুক, তারা কোনো না কোনো পথ দিয়ে রাতের অন্ধকারে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। তাই অনুপ্রবেশ ঠেকানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ এবং কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার চাপের মধ্যে নতুন করে কাউকে আশ্রয় দেওয়ার সক্ষমতা নেই বলে জানিয়েছে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন। সংস্থাটি বলছে, রোহিঙ্গারা মাতৃভূমি ছেড়ে এলে সংকট আরও বাড়বে এবং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াও জটিল হয়ে পড়বে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, “বর্তমানে নতুন করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। গত কয়েক বছরে যে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা এসেছে, তাদের জন্যও পর্যাপ্ত আবাসনের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। ফলে অনেকেই পাহাড় কেটে বা পাহাড়ের ভেতরে গর্ত করে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে এবং এতে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। এ থেকেই বোঝা যায়, বাংলাদেশে আর নতুন করে রোহিঙ্গাদের জায়গা দেওয়ার মতো সক্ষমতা নেই।
মো. মিজানুর রহমান বলেন, “রাখাইনের পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। সেখানে বিমান হামলা চলছে এবং নতুন করে যুদ্ধের তীব্রতা বেড়েছে। আমরা জানতে পেরেছি, রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় আরাকান আর্মির সদস্যরা অবস্থান নেওয়ায় সেসব এলাকাও বিমান হামলার শিকার হচ্ছে। এর ফলে রোহিঙ্গাদের আবারও সীমান্তের দিকে আসার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
এমনিতেই রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। প্রতি সপ্তাহেই ৩০ থেকে ৫০ জনের মতো বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করছে। বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আরও বেশি মানুষ সীমান্তের দিকে আসতে পারে বলে আমরা শুনছি। তবে আমরা আশা করি, বিজিবি তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে এবং নতুন অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ করবে।”
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, “রোহিঙ্গাদেরও বোঝা উচিত, তারা যদি নিজেদের মাতৃভূমি ছেড়ে চলে আসে, তাহলে তাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে পড়বে। তাই আমরা রোহিঙ্গা কমিউনিটি নেতাদের অনুরোধ করেছি, তারা যেন রাখাইনে থাকা নিজেদের জনগণকে সেখানেই অবস্থান করতে উৎসাহিত করেন এবং বাংলাদেশে আসতে নিরুৎসাহিত করেন।”
মো. মিজানুর রহমান বলেন, রাখাইনে বর্তমানে ঠিক কতজন রোহিঙ্গা রয়েছে, সে বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। তবে আমাদের ধারণা, সেখানে এখনো প্রায় দুই থেকে আড়াই লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে। এছাড়া প্রায় এক লাখের মতো রোহিঙ্গা মিয়ানমারের অন্য অঞ্চলে, বিশেষ করে ইয়াঙ্গুনের দিকে চলে গেছে বলে ধারণা করা হয়।
কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, “বর্তমান সংঘাতের কারণে নতুন করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসার আশঙ্কা অবশ্যই রয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মানুষ প্রাণ বাঁচাতে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পালিয়ে যায়। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা অবস্থান করায় অনেকেই এখানে আসতে চাইতে পারে। তবে আমরা তাদের বারবার বোঝাচ্ছি, তারা যেন নিজেদের স্বজনদের বাংলাদেশে আসতে উৎসাহিত না করেন। কারণ এতে প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হয়ে যাবে। তাদের উচিত নিজেদের মাতৃভূমিতে থেকেই পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করা। আমাদের পক্ষ থেকে বিজিবি সীমান্তে দায়িত্ব পালন করছে, তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল এবং উদ্বেগজনক।”
রাখাইনে সংঘাত বাড়ায় সীমান্তে নজরদারি জোরদার করেছে বিজিবি। টেকনাফের নাফ নদী থেকে শুরু করে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি ও কক্সবাজারের উখিয়া সীমান্তে মোতায়েন করা হয়েছে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সদস্য। পাশাপাশি আধুনিক জলযান, ড্রোন প্রযুক্তি ও নিয়মিত টহলের মাধ্যমে সীমান্তে কড়া নজরদারি চালাচ্ছে কোস্টগার্ড।
কক্সবাজারস্থ ৩৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস. এম. খায়রুল আলম বলেন, “বর্তমানে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে কিছুটা অস্থিরতা বিরাজ করছে। সম্প্রতি সেখানে কয়েকটি বিমান হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর প্রেক্ষাপটে ওই এলাকায় অবস্থানরত কিছু রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে আমাদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য রয়েছে।
তবে আমি সবাইকে আশ্বস্ত করতে চাই, অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে সীমান্তে সর্বোচ্চ সংখ্যক বিজিবি সদস্য মোতায়েন রয়েছে। আমাদের সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করে সীমান্তে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস. এম. খায়রুল আলম বলেন, আপনারা দেখছেন, রোহিঙ্গা হোক বা মিয়ানমারের অন্য কোনো নাগরিক-বাংলাদেশে অবৈধভাবে প্রবেশের চেষ্টা করলেই আমরা তাদের শনাক্ত ও আটক করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। আমাদের নজরদারি যতদূর সম্ভব বিস্তৃত করা হয়েছে, যাতে কেউ আমাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে। এ বিষয়ে আমরা অত্যন্ত দৃঢ় ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রতিবেশী দেশের কোনো নাগরিককে অবৈধভাবে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।”
টেকনাফ কোস্টগার্ড স্টেশনের ইনচার্জ লেফটেন্যান্ট কমান্ডার আরাফাত হোসেন বলেন, “নাফ নদীসংলগ্ন সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোস্টগার্ডের বিভিন্ন ধরনের আধুনিক জলযান দিয়ে ২৪ ঘণ্টা টহল কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। সীমান্তের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় আমাদের টহল ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে।
আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন জলযান ও উন্নত ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমে নাফ নদীসংলগ্ন সীমান্ত এলাকা সার্বক্ষণিক নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছে। দিন-রাত সবসময় আমাদের জলযান ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ব্যবহার করে সীমান্ত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
এছাড়াও স্থলভাগে হিউম্যান পেট্রোলের মাধ্যমে নিয়মিত নজরদারি চালানো হচ্ছে। সীমান্ত এলাকায় যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছি এবং প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করছি।”
রাখাইনের পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তার ওপর নির্ভর করছে সীমান্তের আগামী দিনের চিত্র। তবে নতুন করে রোহিঙ্গা ঢল ঠেকাতে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার কথা জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।