মাদকের মরণনেশা যখন একটি সাজানো সংসার ও সম্ভাবনাময় তরুণ প্রাণকে তিলে তিলে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়, তখন সেই অন্ধকারের চোরাবালি থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথ দেখানোই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় পর্যটন নগরী কক্সবাজার যখন ভৌগোলিক কারণে মাদকের পাচার ও সহজলভ্যতার এক ঝুঁকিপূর্ণ জনপদে পরিণত হয়েছে, ঠিক তখনই এই জনপদের বিপথগামী তরুণ প্রজন্মকে রক্ষার ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে শহরের আলীর জাহাল সড়ক সংলগ্ন সায়মা ওশান সিটির দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র ‘ফিউচার লাইফ’। এটি কেবল একটি নিরাময় কেন্দ্র নয়, বরং সমাজ ও পরিবারের হারানো সুখ পুনরুদ্ধারের এক অনন্য আশ্রয়স্থল এবং গত আট বছর ধরে অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফেরার এক জীবন্ত বাতিঘর হিসেবে কাজ করছে। ২০১৬ সালে সম্পূর্ণ মানবিক ও অলাভজনক উদ্দেশ্য নিয়ে ইফতেকারুল ইসলামের হাত ধরে এই প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়, যা বর্তমানে কক্সবাজারে মাদকমুক্ত পরিবার গড়ার প্রধান আস্থার ঠিকানায় পরিণত হয়েছে।
জানা গেছে, কক্সবাজারের প্রেক্ষাপটে মাদকের ভয়াবহতা বর্তমানে বহুমাত্রিক রূপ নিয়েছে। তরল মদের পাশাপাশি ইয়াবার আগ্রাসন, গাঁজা ও হেরোইনের মতো প্রাণঘাতী মাদকের সহজলভ্যতা এখানকার তরুণদের কৌতূহল, ভুল বন্ধুত্ব কিংবা পারিবারিক কলহের ফাঁদে ফেলে ধ্বংসাত্মক পথে ধাবিত করছে। এই কঠিন বাস্তবতায় ‘ফিউচার লাইফ’ আসক্তদের “অপরাধী” না ভেবে “রোগী” হিসেবে বিবেচনা করে ভালোবাসা, আধুনিক বিজ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক মানের কাউন্সেলিংয়ের সমন্বয়ে এক পূর্ণাঙ্গ নিরাময় প্রক্রিয়া পরিচালনা করছে।
একটি কোলাহলমুক্ত ও সুদৃশ্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ভবনে স্থাপিত এই কেন্দ্রের প্রতিটি পরতে রয়েছে আভিজাত্য আর শৃঙ্খলার ছাপ। দৃষ্টিনন্দন মার্বেল ফ্লোর, নান্দনিক অন্দরসজ্জা এবং মনোরম পরিবেশ রোগীদের মনে যে মানসিক প্রশান্তি নিশ্চিত করে, তা নিরাময় প্রক্রিয়ার প্রাথমিক ও অন্যতম প্রধান শর্ত। প্রতিষ্ঠানটির মূল চালিকাশক্তি হলো এর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও প্রখ্যাত মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের সরাসরি তত্ত্বাবধান। এখানে রোগীদের শারীরিক ডিটক্সিফিকেশন থেকে শুরু করে মানসিক পুনর্বাসন এবং সামাজিক পুনর্গঠনের একটি বৈশ্বিক স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।
প্রতিষ্ঠানটির মানবিক সেবার মান কতটা উন্নত, তা বোঝা যায় এখানে চিকিৎসাধীন রোগীদের সাথে কথা বললে। সরজমিন পরিদর্শনকালে রুদ্র (ছদ্মনাম) নামের এক তরুণের সাথে কথা হয়, যিনি এক সময় সফলভাবে পারিবারিক ব্যবসা দেখাশোনা করতেন। কিন্তু প্রিয় বোনের অকাল মৃত্যুতে সৃষ্ট তীব্র মানসিক ট্রমা বা শোক সইতে না পেরে তিনি ইয়াবার মরণনেশায় জড়িয়ে পড়েন। পরবর্তীতে পরিবারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় তিনি ফিউচার লাইফে ভর্তি হন এবং বর্তমানে এখান থেকে সেবা নিয়ে পুণরায় স্বাভাবিক জীবনে ফেরার স্বপ্ন দেখছেন। রুদ্রর মতো আরও অনেক তরুণ বর্তমানে এখানে সুশৃঙ্খলভাবে নিরাময় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, যারা অতীতের ভুলের জন্য অনুতপ্ত এবং নতুনভাবে বাঁচার প্রেরণায় উজ্জীবিত। এখান থেকে চিকিৎসা নিয়ে ফিরে যাওয়ার পর অনেক যুবক বর্তমানে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। উদাহরণ হিসেবে চকরিয়ার এক যুবকের কথা বলা যায়, যিনি নিরাময় কেন্দ্র থেকে ফেরার পর বর্তমানে বিশাল এক পোল্ট্রি খামার গড়ে তুলে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের পরিচয় তৈরি করেছেন। এমন অসংখ্য সাফল্যের উপাখ্যান প্রতিদিন রচিত হচ্ছে ফিউচার লাইফকে কেন্দ্র করে।
ফিউচার লাইফ নিছক কোনো চিকিৎসা কেন্দ্র নয়, বরং এটি মাদকাসক্তদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন গড়ার পাঠশালা। এখানে চিকিৎসার পাশাপাশি কারিগরি ও ভোকেশনাল ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে রোগীদের বিভিন্ন কাজে দক্ষ করে তোলা হয়, যাতে পুনর্বাসন শেষে তাঁরা সমাজে সম্মানজনক জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন। অবসর সময়কে সৃজনশীল করতে এখানে রয়েছে ইনডোর খেলাধুলা ও নিয়মিত বিনোদনের সুব্যবস্থা। রোগীদের শারীরিক সুস্থতার জন্য মানসম্মত খাবার ও নিরাপদ আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জরুরি প্রয়োজনে রয়েছে সার্বক্ষণিক নিজস্ব বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও আধুনিক অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস। এছাড়া প্রতিটি ধর্মের মানুষের ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এখানে পৃথক উপাসনা ও প্রার্থনার ব্যবস্থা রয়েছে।
তাছাড়া বই পড়ার জন্য লাইব্রেরীর ব্যবস্থা আছে এবং নিয়মিত ফ্যামেলি কাউন্সিলিংও করা হয়।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকাণ্ড শুধু চার দেয়ালের মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই; মাদকের কুফল সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করতে তারা নিয়মিত র্যালি, আলোচনা সভা, সেমিনার এবং লিফলেট বিতরণের মতো সামাজিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের এই অনন্য অবদানের জন্য বিভিন্ন সময় তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে উৎসাহমূলক প্রণোদনা ও জেলা প্রশাসন থেকে বিশেষ সংবর্ধনাও লাভ করেছে।
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক (প্রশাসন) জসিম উদ্দিন কাজল ‘দৈনিক কক্সবাজার’কে জানান, একজন রোগী ভর্তি হওয়া থেকে শুরু করে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়া পর্যন্ত তাঁরা সম্পূর্ণভাবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করেন। তবে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, কক্সবাজারে মাদকের যে ভয়াবহ বিস্তার, সেই তুলনায় সরকারি পর্যায়ে ১০০ শয্যার বড় একটি নিরাময় কেন্দ্র ও উন্নত ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার এখন সময়ের দাবি। অনেক ক্ষেত্রে চরম অসুস্থ অবস্থায় রোগীদের কেন্দ্রে আনতে গিয়ে পরিবারগুলোকে চরম বিড়ম্বনায় পড়তে হয়, যা নিরসনে সরকারি প্রচেষ্টা এবং আরও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
এদিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (এডি) নাহিদ হাসান সৌরভ জানান, ফিউচার লাইফসহ কক্সবাজারে মোট দুইটি বেসরকারী কেন্দ্র রয়েছে, তাঁরা নিয়মিত এই কেন্দ্রটি তদারকি ও পরিদর্শন করেন। নিয়মিত গাইডলাইন প্রদান এবং বিধিমত কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তিনি সার্বিক ভাবে ফিউচার লাইফ’ এর কার্যক্রম ভালো বলে মন্তব্য করেন।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, নিরাশার সাগরে হাবুডুবু খাওয়া অগুণতি মানুষের কাছে ‘ফিউচার লাইফ’ আজ এক নির্ভরযোগ্য নাম, যা প্রতিনিয়ত আশার বাণী শুনিয়ে বলে- সঠিক চিকিৎসা আর সামাজিক ভালোবাসা পেলে একটি নতুন জীবনের গল্প লেখা এখনও সম্ভব।