টানা ভারী বর্ষণে কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা মেগা ক্যাম্প-৫ এ পাহাড়ধসে দেয়ালচাপায় একটি বালিকা হেফজখানার ৬ শিক্ষার্থী, এক নারী শিক্ষকসহ ৮ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। তিন ঘণ্টার উদ্ধার অভিযানে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে আরও ৫ শিক্ষার্থীকে।
বুধবার (০৮ জুলাই) দুপুরে কুতুপালং ৫ নম্বর ক্যাম্পের এ-ব্লকে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিস জানায়, পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে বারবার সতর্ক করা হলেও নিরাপদ স্থানে সরে না যাওয়ায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলেন: ক্যাম্প ৫ এর বাসিন্দা রাশেদা, গুমাইচা বিবি ও ক্যাম্প ৩ এর বাসিন্দা উম্মে নাজাত, উম্মে সালমা ও শহিদা। বাকি ৩ জনের নাম পাওয়া যায়নি।
আহতরা হলেন: আসরা (০৯), বেগম জান (১৫) ও ফারেসা বিবি (১২)। বাকিদের নাম পাওয়া যায়নি।
সরজমিনে দেখা যায়-চারদিকে পাহাড়, পাহাড়ের প্রতিটি ঢালুতে অসংখ্য রোহিঙ্গার বসতি। তার মধ্যে ক্যাম্প ৫ এর পাহাড়ের চূড়ায় মসজিদ, তার নিচে অবস্থান খতিজাতুল বালিকা হেফজখানা। প্রবল ভারী বর্ষনের সময় পাহাড় ধসে মসজিদের জরাজীর্ণ দেয়াল বালিকা হেফজখানার ওপর আকস্মিকভাবে ধসে পড়ে। এতে সেখানে অবস্থানরত ২০ জনের মতো শিক্ষক-শিক্ষার্থী চাপা পড়ে।
কুতুপালং ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এ-ব্লকের বাসিন্দা নবী হোসেন (৭০) বলেন, “পান মুখে দিয়েছিলাম। হঠাৎ বিকট এক শব্দ শুনতে পাই। প্রথমে মনে হয়েছিল, হয়তো কোনো বড় গাছ ভেঙে পড়েছে। কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই হেফজখানা থেকে মেয়েরা দৌড়ে বেরিয়ে এসে চিৎকার শুরু করে। মুহূর্তেই চারদিকে কান্নার রোল পড়ে যায়। খবর ছড়িয়ে পড়তেই অসংখ্য মানুষ ঘটনাস্থলে ছুটে আসে। এত মানুষের ভিড় ছিল যে, পুরো এলাকায় পা রাখারও জায়গা ছিল না।”
হেফজখানার ওপরে ছিল মসজিদ। বিকট শব্দ শুনে দ্রুত দৌড়ে আসেন একই ক্যাম্পের যুবক ছানাউল্লাহ (২৫)। তিনি বলেন, “আমরা মসজিদে নামাজ আদায় করছিলাম। হঠাৎ বিকট এক শব্দ শুনে নামাজ শেষ করেই দৌড়ে ঘটনাস্থলে যাই। গিয়ে দেখি, হেফজখানার দেয়াল ধসে পড়েছে। দেয়ালের নিচে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী-সবাই নারী ও কিশোরী-চাপা পড়ে আছে। তখন কেউ নামাজ পড়ছিল, কেউ আবার কোরআন তেলাওয়াত ও পড়াশোনায় ব্যস্ত ছিল। মুহূর্তের মধ্যেই সবকিছু ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। কয়েকজনকে জীবিত উদ্ধার করা গেলেও অনেকেই দেয়ালের নিচে আটকা পড়ে। আমার নিজের চোখে ৫ জনের মরদেহ দেখেছি। এছাড়া আরও ছয় থেকে সাতজন গুরুতর আহত হয়েছেন। মোট ১১ থেকে ১২ জন দেয়ালের নিচে চাপা পড়েছিলেন।”
ঘটনার পরপরই স্থানীয় বাসিন্দা, স্বেচ্ছাসেবক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার কর্মিদের পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিসের কর্মিরাও উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। ঘটনাস্থলে রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবকরাও। উদ্ধার কিশোরীদের দেন প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করে রেড ক্রিসেন্টের মেডিকেল টিম।
রেড ক্রিসেন্টের মেডিকেল টিমের নার্স রুপা চক্রবর্তী বলেন, “অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে পাহাড়ধসের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা প্রয়োজনীয় ফার্স্ট এইড কিট, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে যাই। আহতদের তাৎক্ষণিক প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। যাদের অবস্থা গুরুতর ছিল, তাদের দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সে করে বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে রেফার করা হয়েছে। আমরা ঘটনাস্থলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করেছি এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী পরবর্তী সহায়তা কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।”
উখিয়া ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন অফিসার ডলার ত্রিপুরা বলেন, “টানা কয়েক দিনের অতিবর্ষণের কারণে পাহাড়ধসের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। দুপুরের দিকে ক্যাম্পের একটি মহিলা মাদ্রাসা পাহাড়ধসে মাটিচাপা পড়ার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের দুটি উদ্ধারকারী ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযান শুরু করে।
ঘটনাস্থলে গিয়ে আমরা জানতে পারি, স্থানীয়রা এরই মধ্যে কয়েকজনের মরদেহ ও আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠিয়েছেন। পরে নিশ্চিত হওয়ার জন্য আমরা পুরো এলাকায় তল্লাশি চালাই। তবে নতুন করে আর কোনো ব্যক্তিকে চাপা পড়া অবস্থায় পাওয়া যায়নি। মেডিকেল টিমের তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় মোট আটজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং পাঁচজন আহত অবস্থায় চিকিৎসা নিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, “অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে ধসের ঘটনা ঘটছে। পাশাপাশি পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন এবং পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে আগেই মাইকিং করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে সরে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বারবার সতর্ক করা হয়েছিল। আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাসের পরও অনেকেই সেখানে অবস্থান করায় এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে।”
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, প্রবল ভারী বর্ষনের সময় পাহাড়ধ্বসে একটি জরাজীর্ণ দেওয়াল বালিকা হেফজখানার ওপর আকস্মিক ভেঙ্গে পড়ে। এতে সেখানে অবস্থানরত ২৫ থেকে ৩০ জন চাপা পড়ে। ঘটনার পরপরই স্থানীয় বাসিন্দা, স্বেচ্ছাসেবক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার কর্মিদের পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিসের কর্মিরাও উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। এতে এক শিক্ষক ও এক নারীসহ ১৩ জনজন গুরুতর আহত হন। এসময় ঘটনাস্থল থেকে চারজনকে মৃত উদ্ধার করা হয়। পরে আহত ৯ জনকে হাসপাতালে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক আরও ৪ জনকে মৃত ঘোষণা করেন। অপর ৫ জন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
কমিশনার মিজানুর রহমান জানান, বিকাল ৫ টার দিকে ফায়ার সার্ভিস সহ উদ্ধারকাজে অংশ নেয়া স্বেচ্ছাসেবীরা অভিযান শেষ করেছেন। ঘটনার ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের কাজ চলমান রয়েছে।
এর আগে গত সোমবার ক্যাম্প ১৫, ১১ ও ৭ এ পাহাড় ধসে মারা যান ৮ রোহিঙ্গা।