স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনায় কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে অবৈধ ও অস্থায়ী সব স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান শুরু করেছে জেলা প্রশাসন। দুই দিন মাইকিংয়ের পর বৃহস্পতিবার বিকেলে অভিযানে সৈকতের বালিয়াড়ি থেকে ৩০টির বেশি স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। তবে ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রশাসনকে রাজস্ব দিয়ে দোকান বসানো হয়েছিল। এখন উচ্ছেদ করা হলে ব্যবসায়ীদের টাকা ফেরত দিতে হবে, নাহলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা। এদিকে প্রশাসন জানিয়েছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টের বালিয়াড়ি-যেখানে গড়ে উঠেছে ফিশ ফ্রাই মার্কেট। বৃহস্পতিবার বিকেলে সেখানেই অভিযান শুরু করে জেলা প্রশাসন। বালিয়াড়ি জুড়ে থাকা একের পর এক অস্থায়ী দোকানপাট পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে যাচাই-বাছাইয়ের পর শ্রমিকরা ভেঙে ট্রাকে তুলে নেয়। ফিশ ফ্রাই মার্কেট এলাকা থেকে তিন ট্রাক অস্থায়ী দোকান উচ্ছেদ করা হয়।
এরপর অভিযান পরিচালনাকারী দলটি যায় সুগন্ধা পয়েন্টের রাস্তার মোড়ে। সেখান থেকেও বেশ কয়েকটি অস্থায়ী দোকান উচ্ছেদ করা হয় এবং রাস্তার পাশে গড়ে ওঠা অন্য দোকানগুলো দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
পরে আভিযানিক দলটি সুগন্ধা পয়েন্টের ঝাউবাগানের বালিয়াড়িতে গিয়ে আরও কয়েকটি অস্থায়ী দোকান গুঁড়িয়ে দেয়। তবে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই হঠাৎ করে এসে দোকান উচ্ছেদ করা হচ্ছে। তাদের দাবি, প্রশাসনকে রাজস্ব দিয়ে দোকান বসানো হয়েছিল। এখন উচ্ছেদ করা হলে সেই টাকা ফেরত দিতে হবে, অন্যথায় তারা আইনগত ব্যবস্থা নেবেন।
সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টের চটপটি ব্যবসায়ী আব্দুল খালেক বলেন, “কোনো পূর্ব ঘোষণা বা আমাদেরকে না জানিয়ে হঠাৎ করে এসে দোকান উচ্ছেদ শুরু করা হয়েছে।”
তিনি অভিযোগ করে বলেন, সৈকতে নতুন করে বসানো অনেক দোকান এখনও রয়েছে, কিন্তু সেগুলোর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তার দাবি, বেছে বেছে কয়েকটি দোকান উচ্ছেদ করা হচ্ছে।
আব্দুল খালেক বলেন, “মনে হচ্ছে কোনো একটি পক্ষ থেকে কিছু দোকানকে আগে থেকেই নিশ্চিত করা হয়েছে যে তাদের দোকান তোলা হবে না। কারণ অনেক নতুন দোকান এখনও বসানো অবস্থায় আছে, কিন্তু সেগুলো না তুলে কয়েকটি দোকান উচ্ছেদ করে অভিযান দেখানো হচ্ছে।”
তিনি বলেন, এভাবে বাছাই করে অভিযান চালানো হলে সাধারণ দোকানিদের মধ্যে প্রশ্ন ও অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে।
বৃহত্তর সুগন্ধা বিচ মার্কেট সমিতির সভাপতি জয়নাল আবেদীন বলেন, “আমার এই কার্ডটি বৈধ নাকি অবৈধ-আপনারা ভালো করে দেখুন। এটি আমার নামেই দেওয়া হয়েছে। যদি কার্ডটি বৈধ হয়, তাহলে অভিযানের সময় আমার দোকান কেন ভাঙা হলো? এটা কি সভাপতিকে লক্ষ্য করে করা হয়েছে, নাকি সত্যিকার অর্থেই নিয়ম অনুযায়ী অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে?”
তিনি বলেন, যদি সত্যিকার অর্থে নিয়ম মেনে অভিযান পরিচালনা করা হয়, তাহলে সেখানে গণমাধ্যমের একটি টিম, ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি এবং প্রশাসনের টিম একসঙ্গে থেকে স্বচ্ছতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে অভিযান পরিচালনা করুক। এতে তাদের কোনো আপত্তি নেই।
জয়নাল আবেদীন আরও অভিযোগ করেন, বিচ মার্কেটের কার্ড দেওয়া হয়েছে বিনামূল্যে নয়, বরং অনেকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে। তিনি দাবি করেন, তাদের কাছ থেকে প্রায় ৬০ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়েছিল। তার ভাষায়, “সরকার আমাদের কাছ থেকে যে টাকা নিয়েছে, এখন উচ্ছেদের সময় সেই টাকার কী হবে?”
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার হয়তো সেই টাকার দায় নেবে না, তবে জেলা প্রশাসনের অধীনস্থ যেসব কর্মকর্তা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থেকে কার্ড দেওয়ার নামে অর্থ নিয়েছেন, তাদের অবশ্যই সেই টাকা ফেরত দিতে হবে। তার দাবি, পাঁচ শতাধিক কার্ডের মাধ্যমে বড় অঙ্কের অর্থ নেওয়া হয়েছে এবং রাজস্ব হিসেবেও বিপুল পরিমাণ টাকা আদায় করা হয়েছে।
জয়নাল আবেদীন বলেন, যারা অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে টাকা নিয়েছে, তাদেরই সেই দায় নিতে হবে এবং ব্যবসায়ীদের টাকা ফেরত দিতে হবে। অন্যথায় ব্যবসায়ীরা আইনগত ও গণতান্ত্রিক উপায়ে আন্দোলনসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
এদিকে প্রশাসনের দাবি, গত দুই দিন ধরে সমুদ্রসৈকত এলাকায় মাইকিং করে অবৈধভাবে দখল করে থাকা ব্যক্তিদের সতর্ক করা হয়েছে এবং স্বেচ্ছায় সরে যাওয়ার জন্য যুক্তিসঙ্গত সময় দেওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও যারা স্থান ছাড়েননি, তাদের বিরুদ্ধেই এখন অভিযান শুরু করা হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মনজু বিন আফনান বলেন, বর্তমানে সমুদ্রসৈকতে যে অভিযান চলছে, তার দৃশ্যমান অগ্রগতি আজ মানুষ দেখতে পেলেও এই কার্যক্রম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনার পর থেকেই, এমনকি তারও আগে থেকে চলমান ছিল।
তিনি জানান, গত দুই দিন ধরে সমুদ্রসৈকত এলাকায় মাইকিং করে অবৈধভাবে দখল করে থাকা ব্যক্তিদের সতর্ক করা হয়েছে এবং স্বেচ্ছায় সরে যাওয়ার জন্য তাদের যুক্তিসঙ্গত সময় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও যারা স্থান ছাড়েননি, তাদের বিরুদ্ধে এখন অভিযান শুরু করা হয়েছে।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আরও বলেন, অভিযানের পাশাপাশি প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যাকএন্ডে বিভিন্ন প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে। বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটিও বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে এবং তাদের কিছু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াও রয়েছে।
তিনি জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী এই অভিযান অব্যাহত থাকবে। কেউ যদি কোনো অনিয়ম বা অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিষয়ে লিখিত অভিযোগ ও প্রমাণ দেন, তাহলে প্রশাসন অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে। সৈকতে কর্মরত বিচকর্মীসহ যে-ই জড়িত থাকুক না কেন, অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর আগে গত সোমবার (০৯ মার্চ) দুপুরে কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভা শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, সমুদ্রসৈকতে থাকা সব ধরনের অবৈধ ও অস্থায়ী স্থাপনা এক সপ্তাহের মধ্যে অপসারণ করা হবে।