ঝিনুক আকৃতির ছাদ। ওপরে স্টিলের কাঠামোতে সমুদ্রের ঢেউয়ের নকশা। এ যেন সমুদ্রের প্রতিচ্ছবি। সমুদ্র শহর কক্সবাজার বিমানবন্দরের আন্তর্জাতিক নতুন টার্মিনালের নকশাটি তৈরি হয়েছে সমুদ্রের সাথে সামঞ্জস্য রেখেই।
আর এটি সোমবার সকালে পরীক্ষামূলক চালু করা হয়েছে। বর্তমানে কক্সবাজার বিমানবন্দরের আন্তর্জাতিক নতুন টার্মিনালটি অভ্যন্তরীণ যাত্রীদের সেবা দেয়া হলেও, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্যও প্রস্তুত বলে জানিয়েছে বেবিচক।
বেবিচক বলছে, কক্সবাজার বিমানবন্দরের নতুন আন্তর্জাতিক টার্মিনালের আয়তন ১৭ হাজার ৯৫৬ বর্গমিটার। অনুমোদিত ব্যয় ৩৬২ কোটি ৬২ লাখ টাকা। আন্তর্জাতিক যাত্রীসেবার কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছে আধুনিক এই অবকাঠামো। রয়েছে প্রশস্ত অ্যাপ্রনও। ৩৬ হাজার ৩০০ বর্গমিটারের এই অ্যাপ্রনে একসঙ্গে রাখা যাবে দুটি ওয়াইডবডি ও তিনটি ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজ। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনায় সক্ষমতার মান যাচাই শেষে, এই বিমানবন্দর পেয়েছে ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশনের সনদও। আর পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে বছরে যাত্রীসেবা সক্ষমতা ৭ লাখ ৩০ হাজার থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ২০ লাখে।
ইন্টারন্যাশনাল প্যাসেঞ্জার টার্মিনালের সিকিউরিটি সুপারভাইজার মো. সাইফুল্লাহ বলেন, 'পরীক্ষামূলকভাবে আন্তর্জাতিক টার্মিনালের কার্যক্রম চালু হয়েছে। একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিরাপত্তার জন্য যেসব ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, তার সবকিছুই এখানে নিশ্চিত করা হয়েছে।'
তিনি বলেন, নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বাংলাদেশের তিন বাহিনীর মধ্যে দুটি বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, আনসারসহ বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা সমন্বিতভাবে কাজ করছেন। কক্সবাজার যেহেতু দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন এলাকা এবং দেশ-বিদেশের বিপুলসংখ্যক পর্যটক এখানে আসেন, তাই যাত্রীদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন বিমান ভ্রমণ নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।
যাত্রীদের নিরাপত্তার পাশাপাশি তাদের প্রয়োজনীয় মালামাল ও অন্যান্য জিনিসপত্রের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা হচ্ছে। এজন্য পর্যাপ্ত জনবল, আধুনিক যন্ত্রপাতি, মেশিনারি ও প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সাপোর্ট রাখা হয়েছে। আমাদের সার্ভে, নজরদারি ও পর্যালোচনায় একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই এখানে নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, বর্তমানে প্রতিদিন এই বিমানবন্দরে ওঠানামা করছে ৫৪টি উড়োজাহাজ।
নতুন টার্মিনালের আধুনিক ব্যবস্থাপনায় সন্তুষ্ট পর্যটক ও যাত্রীরা।
ঢাকা যাত্রী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, নতুন টার্মিনাল দিয়ে যাত্রা করতে পারব-বিষয়টি সত্যিই অবাক করার মতো এবং আনন্দের। গতকাল রাতে হঠাৎ এসএমএস পেয়ে জানতে পারি, আমাদের নতুন টার্মিনাল দিয়েই যেতে হবে। অনেক বছর ধরে কক্সবাজারে আসি এবং টার্মিনালটির নির্মাণকাজ দেখেছি, কিন্তু কবে চালু হবে তা নিশ্চিত ছিলাম না। আজ সকালে প্রথম দিকের ফ্লাইটে নতুন টার্মিনাল ব্যবহার করতে পেরে সত্যিই খুব ভালো লাগছে।
শরিফুল ইসলাম বলেন, নিয়মিত কক্সবাজারে আসি। আগের টার্মিনালের সঙ্গে নতুন টার্মিনালের পার্থক্য অনেক। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মতো আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও সেবা এখানে পাওয়া যাচ্ছে। যাত্রীদের প্রতি কর্মীদের আচরণও ভালো। কক্সবাজারে এমন আন্তর্জাতিক মানের সেবা সত্যিই প্রশংসনীয়।
হায়দার আলী বলেন, প্রথম দিনেই নতুন টার্মিনালটি ব্যবহার করতে পেরে ভালো লাগছে। আগের পুরোনো টার্মিনালের তুলনায় এটি অনেক বেশি আধুনিক ও উন্নত। এখন পর্যন্ত যে সেবা পেয়েছি, প্রতিটি ক্ষেত্রেই মান যথেষ্ট ভালো ছিল।
যাত্রী ইয়াছিন আরাফাত বলেন, নতুন টার্মিনালটি আন্তর্জাতিক মানের হয়েছে দেখে সত্যিই ভালো লাগছে। দীর্ঘদিন পর দেশে এমন একটি আধুনিক বিমানবন্দর সুবিধা তৈরি হয়েছে। একজন পর্যটক হিসেবে নতুন এই টার্মিনালের সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করতে পেরে আমি খুবই আনন্দিত। কক্সবাজারের মতো পর্যটনকেন্দ্রে এমন আধুনিক বিমানবন্দর দেশের পর্যটন খাতের জন্যও ইতিবাচক অভিজ্ঞতা তৈরি করবে।
ঢাকার যাত্রী আল আমিন বলেন, কক্সবাজার যেহেতু দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন এলাকা, তাই আন্তর্জাতিক মানের এমন একটি বিমানবন্দর আমাদের জন্য খুবই প্রয়োজন ছিল। নতুন এই টার্মিনাল চালু হওয়ায় পর্যটন ও বিমান যোগাযোগে আরও সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করছি।
সংশ্লিষ্টদের দেয়া তথ্য মতে, এখানে আন্তর্জাতিক বহির্গমনে চারটি এবং আগমনে ছয়টি ইমিগ্রেশন কাউন্টার। লাগেজ পরিবহনে রয়েছে দুটি বেল্ট। সঙ্গে পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেম, ফ্লাইট ইনফরমেশন ডিসপ্লে, সিসিটিভি ও ভারী হ্যান্ডব্যাগ স্ক্যানিংয়ের সুবিধা। ডিউটি ফ্রি শপ থেকে বোর্ডিং ব্রিজ; যাত্রীদের স্বচ্ছন্দ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে রাখা হয়েছে আধুনিক নানা ব্যবস্থা। রয়েছে লিফট, এস্কেলেটর ও চেক-ইন কাউন্টার। আগমন ও বহির্গমনের জন্য রয়েছে আলাদা ইমিগ্রেশন কাউন্টার ও লাউঞ্জ।
অবকাঠামোর সঙ্গে সেবার মানও যাতে বজায় থাকে; সেই প্রত্যাশা করেছেন ঢাকার যাত্রী সাব্বির আহমেদ। তিনি বলেন, আগের টার্মিনালে একটি স্ক্যানিং সিস্টেম ছিল। এখন নতুন টার্মিনালে সাতটি স্ক্যানিং সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। আজ সৌভাগ্যক্রমে আমি প্রথম দিনের যাত্রী। নতুন টার্মিনালের সুযোগ-সুবিধা দেখে খুবই ভালো লাগছে। আশা করছি, ভবিষ্যতে এটি আরও আধুনিক ও উন্নত হবে এবং আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দরে পরিণত হবে। কক্সবাজার যেহেতু দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন এলাকা, তাই নতুন এই সুবিধার ফলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য ভ্রমণ আরও সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় হবে।
যাত্রী শায়েলা রহমান বলেন, আজই প্রথমবারের মতো এই টার্মিনাল থেকে যাত্রা করছি। প্রথম ফ্লাইটের যাত্রী হতে পেরে আমরা খুবই আনন্দিত। প্রথম দেখাতেই মনে হয়েছে, আগের বিমানবন্দরের তুলনায় নতুন টার্মিনালটি অনেক বেশি আধুনিক ও উন্নত। ডিজাইন ও সুযোগ-সুবিধাও বেশ ভালো। আমরা আশা করছি, ভবিষ্যতে এটি আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দরগুলোর মতো আরও আধুনিক ও উন্নত করা হবে।
ঢাকার যাত্রী শিহাবুর রহমান বলেন, 'আমি পেশায় একজন স্থপতি। কাজের কারণে আমাকে ও আমার স্ত্রীকে নিয়মিত দেশের বাইরে বিভিন্ন বিমানবন্দর ব্যবহার করতে হয়। পাশাপাশি কক্সবাজারেও আমরা প্রায় প্রতিবছর দুই-তিনবার আসি। এখন পর্যন্ত যা দেখছি, নতুন এই টার্মিনালটি খুবই সুন্দর একটি উদ্যোগ ও স্থাপনা। একটি বিমানবন্দরে চেক-ইন, নিরাপত্তা তল্লাশি, ইমিগ্রেশন, বোর্ডিংসহ নানা ধরনের কার্যক্রম থাকে। সেদিক থেকে এখানে প্রয়োজনীয় কার্যক্রমগুলো বেশ ভালোভাবেই করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
তবে একটি স্থাপনা যতটা ভালোভাবে তৈরি করা হয়, সেটি দীর্ঘদিন ভালো রাখার বিষয়টি নির্ভর করে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের ওপর। আমার প্রত্যাশা থাকবে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিয়মিত ও যথাযথভাবে এর রক্ষণাবেক্ষণ করবেন। আজ যেভাবে সবকিছু নতুন ও সুন্দর লাগছে, এই সৌন্দর্য ও সেবার মান যেন বছরের পর বছর বজায় থাকে।
১,৮৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে শুরু হওয়া এই আধুনিকায়ন প্রকল্পের মাধ্যমে কক্সবাজার বিমানবন্দর দেশের চতুর্থ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে। আগামী অক্টোবর মাসে এই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও নতুন রানওয়ের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের কথা রয়েছে।