মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, এডভোকেট
বাংলাদেশের আইনজীবীদের অন্যতম শীর্ষ সংগঠন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচন ১৪টি পদের মধ্যে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ১৩টি পদে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপি-সমর্থিত জাতীয়তাবাদী আইনজীবী প্যানেলের (নীল প্যানেল) প্রার্থীরা। সদস্যের একটি পদে জয় পেয়েছেন জামায়াতে ইসলামী-সমর্থিত আইনজীবী ঐক্য প্যানেলের (সবুজ প্যানেল) প্রার্থী। জাতীয় নাগরিক পার্টি(এনসিপি)-সমর্থিত ন্যাশনাল ল ইয়ার্স অ্যালায়েন্স মনোনীত প্যানেলের (লাল-সবুজ প্যানেল) প্রার্থীরাও নির্বাচনে অংশ গ্রহন করেন। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী বিএনপি পন্থী সভাপতি পেয়েছেন ২,৯৮৪ ভোট ও জামাত পন্থী প্রার্থী পেয়েছেন মাত্র ৭৮৮ ভোট। সম্পাদক পদে বিএনপি পন্থী প্রার্থী পেয়েছেন ২৫৮২ ভোট ও জামাত পন্থী প্রার্থী পেয়েছেন মাত্র ৭৮৬ ভোট। মোট ১১,০৯৭ ভোটের মধ্যে ৪,০৪৮ ভোটার ভোট প্রদান করেছেন। প্রায় ৬৬% আইনজীবী ভোট প্রদান করেন নাই। দেশের সর্ববৃহৎ আইনজীবী সমিতি ঢাকা জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনেও একই চিত্র ৬৬% আইনজীবী ভোট দিতে আসেন নাই। যারা ভোট দিতে আসেন নাই তারা কি নির্বাচনের প্রতি বিশ্বাস ও আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন, নাকি সজাগভাবে নির্বাচন বর্জন করেছেন তা জানা যায়নি। উল্লেখ করা প্রয়োজন আমাদের কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে ৯৪% আইনজীবী ভোট প্রদান করেছেন অর্থাৎ ৬% আইনজীবী ভোট প্রদান করেন নাই। কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে বিএনপি, জামাত ও বেনামে আওয়ামী লীগ পন্থীরাও নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। যদিও সভাপতি পদ পেয়েছেন বিএনপি পন্থীরা, সাধারণ সম্পাদক পেয়েছেন জামাত পন্থীরা। আওয়ামী লীগপন্থীরাও বিভিন্ন সাতটি পদে নির্বাচিত হয়েছেন। সকল আইনজীবীসহ জেলাবাসী ও রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনকে অবাধ,নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহনমূলক হিসেবে মেনে নিয়েছেন। রাজধানী ঢাকার আইনজীবী সমিতিগুলোর নির্বাচন কেন হতাশাজনক, লজ্জাজনক হয়েছে তা ব্যাখ্যা করা নিরাপদ নয়। কারণ ড. ইউনুস সরকারের আমলে প্রশ্রয় পাওয়া ’মবতন্ত্র’ বা ’বেআদবতন্ত্র’ এখনও সক্রিয় আছে, তা প্রতিদিনের পত্রপত্রিকার সংবাদ থেকে দৃশ্যমান। আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলের পদাংক অনুসরণ করতে দেখলে অংশগ্রহনমূলক, অবাধ নির্বাচন, গণতন্ত্র ও আইনের শাসনে বিশ্বাসী মানুষগুলো ব্যাপকভাবে হতাশ হচ্ছেন।
বাংলাদেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য আর একটি মারাত্মক ক্ষতিকর সমস্যা হচ্ছে ক্রমবর্ধমান হারে তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ মাদকতায় ও মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে যাওয়ার সমস্যা। প্রায় প্রতি দিন সংবাদপত্রের পাতায় দেশের কোন না কোন জায়গায় বিপুল ইয়াবা বা অন্য মাদকদ্রব্য উদ্ধারের খবর দেখা যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে দেশে যে পরিমাণ ইয়াবা বা অন্য মাদক চোরাচালানীর মাধ্যমে আমদানী করা হয় তার অনুমান ১০% ভাগ আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধৃত হয়। বাকী ৯০% দেশে নিরাপদে প্রবেশ করে এবং ব্যবহার হয়। মাদকের বিরুদ্ধে সকল সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করা হলেও তা বন্ধ হয় নাই। মিয়ানমার থেকে ইয়াবা আমদানী বা পাচার বন্ধ করার অজুহাতে ওসি প্রদীপের আমলে শুধু টেকনাফ থানায় ২০৪ জন নাগরিককে ইয়াবা পাচারে সংশ্লিষ্টার অভিযোগে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রশাসনিক তদন্ত প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছিল। যারা ইয়াবা পাচার বন্ধ করার দায়িত্ব নিয়ে নিজেরা সেই অজুহাতে দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল টাকা উপার্জন করায় জড়িয়ে গিয়েছিলেন তাদের বিরুদ্ধে ডকুমেন্টারী তৈরী করতে গিয়েই মেজর(অব) সিনহাকে হত্যা করে ওসি প্রদীপ বিচারে মুত্যুদন্ডে দন্ডিত হয়েছেন। কিন্ত ইয়াবা পাচার এখনও অব্যাহত আছে কেন। তার উত্তর হল চাহিদা থাকলে সরবরাহ বৈধ বা অবৈধ পথে অবশ্যই আসবে। মাদক চোরাচালানী /আমদানী বন্ধ করতে হলে দেশের মধ্যে মাদকের চাহিদা তথা ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। কেউ ইয়াবা বা মাদক সেবন না করলে মাদকের চাহিদা থাকবে না। ফলে ইয়াবা বা মাদক চোরাই পথে আমদানী সংক্রিয়ভাবে অর্থনীতির ধর্ম অনুযায়ী বন্ধ হয়ে যাবে। প্রয়োজনে প্রচলিত আইন সংশোধন করে ইয়াবা সেবনকারী বা মাদক সেবনকারীদের দ্রুত সনাক্ত করে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে তাৎক্ষনিক শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতি জেলায়-উপজেলায় মাদকাসক্তদের চিকিৎসার জন্য সরকারীভাবে হাসপাতাল বা নিরাময়কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শুধু মাদক পাচারকারীদের ধরে মৃত্যুদন্ড,যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিলে ইয়াবা আমদানী বন্ধ হবে না।
সরকারী/বেসরকারী চাকুরী, স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, ড্রাইভিং লাইসেন্স, আমদানী রপ্তানীসহ ব্যবসায়িক লাইসেন্স বা পেশাজীবীদের সনদ প্রদানের সময়, রাজনৈতিক দলগুলোর সদস্যপদসহ নেতৃত্বের পদ দেওয়ার আগে ডোপ-টেস্ট বাধ্যতামূলক করতে হবে। জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিল করার সাথে মাদকাসক্ত নন মর্মে ডোপ-টেস্ট রির্পোট দাখিল করাও বাধ্যতামূলক করতে হবে। মাদকাসক্ত প্রমাণিত হলে তারা সর্বক্ষেত্রে অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবেন বলে আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করতে হবে। মাদককে কেন্দ্র করেই বহু খুনাখুনী, হানাহানি, চুরি-ডাকাতির মত গুরুতর অপরাধ হয়ে থাকে। সরকার আন্তরিকভাবে উদ্যাগ নিলে দেশে মাদক সেবন কঠোরভাবে নিরুৎসাহীত করা ও বন্ধ করা খুব কঠিন কাজ নয়। গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে কক্সবাজারের ভুমিপুত্র সাহসী ও উদ্যাগী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দেশে মাদক সেবন বন্ধ করার মাধ্যমে ইয়াবা ও মাদক পাচার সম্পূর্ণ বন্ধ করে আইনশৃংখলা পরিস্থিতির উন্নতি করতে সক্ষম হবেন বলে জনগণ আশাবাদী।