মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, এডভোকেট
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় ভাগে মৌলিক অধিকার হিসেবে ২৭ অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে ’সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয়লাভের অধিকারী।’ ৩১ অনুচ্ছেদের উল্লেখ আছে, ’আইনের আশ্রয়লাভ এবং আইনানুযায়ী ও কেবল আইনানুযায়ী ব্যবহারলাভ যে কোন স্থানে অবস্থানরত প্রত্যেক নাগরিকের এবং সাময়িকভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরত অপরাপর ব্যক্তির অবিচ্ছেদ্য অধিকার এবং বিশেষতঃ আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোন ব্যবস্থা গ্রহন করা যাইবে না,যাহাতে কোন ব্যক্তির জীবন,স্বাধীনতা,দেহ,সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে।’
ইদানিং আইনজীবীদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী কর্তৃক ধৃত আসামীদের আদালত থেকে জামিন নেওয়া প্রসঙ্গে এবং অনেক ধৃত আসামীর, চোর, ছিনতাইকারী, ডাকাতের নিকট আইনজীবীদের ঠিকানা,ভিজিটিং কার্ড পাওয়ায় জেলার পুলিশ প্রশাসনের উচ্চ পর্যায় থেকে প্রকাশ্যে বিরূপ ও মানহানিকর মন্তব্যের প্রেক্ষিতে আইনজীবীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে সম্প্রতি কক্সবাজার শহরে নজিরবিহীনভাবে চুরি বৃদ্ধি পেলে জনঅসন্তোষ্ট্রি প্রেক্ষিতে পুলিশ আইনানুগ দায়িত্ব পালন করে শত শত আসামী গ্রেপ্তার করায় সকলে খুশী।
জামিনের বিষয় বাংলাদেশে প্রচলিত ১৮৯৮ সালের ফৌজদারী কার্যবিধিতে পরিস্কারভাবে উল্লেখ আছে। ফৌজদারী কার্যবিধির ৪৯৬ ধারা অনুযায়ী জামিনযোগ্য অপরাধে অভিযুক্ত কোন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে আনা হলে বা পূর্ব থেকে হাজতে আটক থাকলে বা আদালতে আত্মসমর্পণ করলে তাকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হবে। জামিনযোগ্য অপরাধে জামিন পাওয়া আসামীর অবিচ্ছেদ্য অধিকার। ফৌজদারী কার্যবিধির ৪৯৭ ধারা অনুযায়ী অজামিনযোগ্য অপরাধের ধারার মামলায় যদি আসামীকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপার্দ্দ করা হয় বা আগে থেকেই হাজতে আটক থাকে বা স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেন তবে আদালত আসামীকে জামিনে মুক্তি দিতে পারেন। তবে যদি আসামীকে মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডনীয় অপরাধে দোষী মর্মে বিশ্বাস করার যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকে তবে আদালত আসামীকে জামিনে মুক্তি দিবেন না। তারপরও শর্ত আছে যে, আসামীর বয়স ১৬ বৎসরের কম হলে, মহিলা হলে, অসুস্থ হলে বা অক্ষম হলে আদালত আসামীকে জামিনে মুক্তি দিতে পারেন। ফৌজদারী কার্যবিধির ৪৯৮ ধারা অনুযায়ী দায়রা জজ আদালত বা মহামান্য হাইকোট বিভাগ নিম্নআদালতে জামিন লাভে ব্যর্থ আসামীকে উল্লেখিত শর্তে জামিনে মুক্তি দিবার নির্দেশ দিতে পারেন। প্রচলিত আইন অনুযায়ী কোন আসামীকে প্রেপ্তার করা হলে বা আগে থেকে হাজতে আটক থাকলে বা আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করলে উল্লেখিত ধারায় জামিন মজ্ঞুর করার ক্ষমতা আদালতকে আইনে দেওয়া হয়েছে। আসামীকে জামিন দেওয়ার বা না দেওয়ার ক্ষমতা কেবলমাত্র আদালতের। সংশ্লিষ্ট আইনজীবী জামিন দেওয়ার বা না দেওয়ার জন্য শুধু আবেদন করতে পারেন আদালতে। একজন নাগরিক কোন মামলা সংক্রান্তে বা সন্দেহজনকভাবে পুলিশকর্তৃক গ্রেপ্তার হলে একজন আইনজীবীর আইনী সহায়তা পাওয়া তার সাংবিধানিক অধিকার। একজন আইনজীবীরও আইনের সহায়তাপ্রার্থী নাগরিককে আইনী সহায়তা দেওয়া কর্তব্য। রাষ্ট্র সরকারী কর্মকর্তা/কর্মচারীদের মত আইনজীবীদের বেতন/ভাতা দেন না। বিচারপ্রার্থী নাগরিকের কাছ থেকে আইনী সেবার বিনিময়ে আইনজীবীরা ’ফিস’ নিয়ে থাকেন যা সম্পূর্ণ বৈধ । তবে যে আইনজীবীরা সরকারী আইন কর্মকর্তা হিসেবে নিযুক্ত হন তারা বেতন/ভাতা পেয়ে থাকেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও আসামী বা বিবাদীপক্ষের আইনজীবীদের একই দায়িত্ব, তা হল আদালতকে আইনানুগভাবে ন্যায় বিচার করতে সহায়তা করা ।
পেশাগতভাবে কেবলমাত্র আইনজীবীদেরকেই ’বিজ্ঞ’ হিসেবে সম্বোধন করা হয়। তাই আইনজীবীদের কাজে-কর্মে-আচরণে বিজ্ঞতার ছাপ থাকা আবশ্যক। আইন পেশা শুরু করতে গেলে প্রথম দিন থেকে অবশ্যই একজন আইনজীবী হিসেবে নিজের শপথ ও আচরণবিধি সম্পর্কে জানতে হবে এবং সব সময় স্মরণ রাখতে হবে। ’দি বাংলাদেশ লিগেল প্র্যাকটিশনারস এন্ড বার কাউন্সিল অর্ডার এন্ড রুলস,১৯৭২ এবং ক্যাননস অব প্রফেশনাল কনডাক্ট এন্ড এটিকেট’ ( ঞযব ইধহমষধফবংয খবমধষ চৎধপঃরঃরড়হবৎং ধহফ ইধৎ ঈড়ঁহপরষ ঙৎফবৎ,১৯৭২, ঞযব ইধহমষধফবংয খবমধষ চৎধপঃরঃরড়হবৎং ধহফ ইধৎ ঈড়ঁহপরষ জঁষবং,১৯৭২, ঈধহড়হং ড়ভ চৎড়ভবংংরড়হধষ ঈড়হফঁপঃ ধহফ ঊঃরয়ঁবঃঃব ) সম্পর্কে জানতে হয়। ১৯৭২সালের রুলস এর ৬২(২) অনুচ্ছেদে ইংরেজীতে এডভোকেটের শপথনামা আছে যা বাংলায় অনুবাদ করলে হবে, ” আমি.......... সশ্রদ্ধচিত্তে শপথ করিতেছি যে, আইনজীবীরূপে আমি আমার পেশার সুউচ্চ মান ও মর্যাদা সমুন্নত রাখিব; একই সঙ্গে আত্মমর্যাদাবোধ ও এই পেশার প্রতি যথাযথ নিষ্ঠাবান থাকিব এবং পেশাদারী আচরণ ও নৈতিক মানদন্ড অনুসরণ করিয়া চলিব। সংবিধানের রক্ষণ,সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধানকে আমার পবিত্র কর্তব্য মনে করিব এবং বাংলাদেশের জনগণের অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তিস্বরূপ ইহার শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখিতে সচেষ্ট হইব। সংবিধানের পরিপন্থী কোন কর্মকান্ডের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করিব না। মানবাধিকার রক্ষায় আমি হইব একজন সদাপ্রহরী এবং এমন একটি সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে নিজেকে নিয়োজিত রাখিব যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার সুনিশ্চিত হইবে।” বিজ্ঞ এডভোকেটদের জন্য আইনে নির্ধারিত মোট ৪২দফা আচরণবিধি অনুসরণ করা অবশ্যই উচিত। এডভোকেটদের আচরণবিধি হিসেবে অধ্যায়-১ এ আইনজীবীদের প্রতি আচরণ ১-১১ দফা, অধ্যায়-২ এ মক্কেলের প্রতি আচরণ ১-১৪ দফা, অধ্যায়-৩ এ আদালতের প্রতি কর্তব্য ১-৯ দফা ও অধ্যায়-৪ এ জনগণের প্রতি আচরণ ১-৮ দফা বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে। উল্লেখিত আচরণবিধি প্রত্যেক এডভোকেটের জন্য মেনে চলা একান্ত বাধ্যতামূলক। আচরণবিধির যে কোন ধারা অমান্য বা লংঘন করলে তা পেশাগত অসদাচরণ ( চৎড়ভবংংরড়হধষ গরংপড়হফঁপঃ ) বলে গণ্য হবে, যার বিরুদ্ধে আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে অভিযোগ দায়ের করা হলে ট্রাইব্যুনাল গঠন পূর্বক পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগের বিচার করা হয় ও দোষী সাব্যস্থ আইনজীবীকে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য বা চিরকালের জন্য আইন পেশা থেকে বহিস্কারের মত কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়। সুতরাং আইনজীবীরা আইনের উর্ধ্বে নন। কোন আইনজীবী জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসাবে অসদাচরণ, ভুল বা অন্যায় করে থাকলে তার বিরুদ্ধে বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনালে দরখাস্ত দায়ের করে বিচার না চেয়ে প্রকাশ্যে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর প্রতি অশালীন/মানহানিকর আচরণ করলে তা হবে মানহানির অপরাধে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কোন আইনজীবী আসামীর পক্ষে মামলা পরিচালনা করলে বা আদালত থেকে আসামীর জামিন নিলে আইনজীবীকে মানহানিকর কটাক্ষ করে হেয়প্রতিপন্ন করা শুধু মানহানির অপরাধ নয়,তা আদালত অবমাননার অপরাধ হিসেবেও গণ্য হতে পারে। কারণ আদালতে পেশায়রত আইনজীবীকে ’কোর্টঅফিসার’ হিসেবে গণ্য করা হয়। অনেক বড় বড় নেতা,আমলা অভিযোগ করে বলেন, মাদকের, হত্যার, ধর্ষণের, চুরি-ডাকাতির,ছিততাই এর মামলায় অভিযুক্ত আসামীর পক্ষে আইনজীবীরা জামিনের দরখাস্ত না করলে বা মামলা পরিচালনা না করলে উক্ত অপরাধসমূহ বন্ধ হয়ে যাবে। আইনজীবীদের বিরুদ্ধে এই দাবী সংবিধান ও প্রচলিত আইন পরিপন্থী। মৃত্যুদন্ডে দন্ডনীয় অপরাধের আসামীর পক্ষে যদি কোন আইনজীবী না থাকে সংবিধান,ফৌজদারী কার্যবিধি ও এল,আর,ম্যানুয়েলের বিধান অনুযায়ী বিচারকারী আদালতের নির্দেশেই রাষ্ট্রের খরচে আসামীর পক্ষে মামলা পরিচালনা করার জন্য একজন আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া বাধ্যতামূলক। অন্যথায় বিচারে মামলার রায়ই অবৈধ ও বাতিল গণ্য হবে। সবগুলো মামলা কি শত ভাগ সত্য? আদালতে দাখিলকৃত বাদীর,সাক্ষীর,তদন্তকর্মকর্তার অভিযোগের সত্য-মিথ্যা যাচাই কেবলমাত্র আইনজীবীর জেরার মাধ্যমেই করা সম্ভব। আইনজীবীদের বিরুদ্ধে যে নেতা বা কর্মকর্তারা উক্তমর্মে গড় অভিযোগ করেন তারা হয়তঃ নিজেদের অক্ষমতা,অদক্ষতা, অযোগ্যতাকে লুকানোর জন্য অথবা পর্যাপ্ত আইনী জ্ঞানের অভাব থেকেই তা করে থাকতে পারেন। পুুলিশ অনেক কষ্ট করে ঝুঁকি নিয়ে আসামী গ্রেপ্তার করে আদালতে চালান দিলে তারা যদি জামিনে মুক্তি পায় পুলিশ স্বাভাবিকভাবে হতাশ হবেনই। হতাশ হয়ে আইনজীবী ও আদালত সম্পর্কে প্রকাশ্যে মন্তব্য না করে ফৌজদারী কার্যবিধির বিধান অনুযায়ী ১৫ দিন বা এক মাসের মধ্যে প্রয়োজনীয় সাক্ষীপ্রমাণ সংগ্রহ করে অভিযোগপত্র দাখিল করতে পারেন। বাদীসহ সাক্ষীদের আদালতে এনে সাক্ষ্য দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারেন। সাক্ষ্যপ্রমাণ পেলে কোন আদালতই আসামীকে খালাস দেন না,শাস্তি দেন। গ্রেপ্তার বাণিজ্য, তদন্ত বাণিজ্যের অভিযোগ থেকে বের হয়ে অপ্রয়োজনীয় অজুহাত সৃষ্টি না করে দ্রুত মামলার তদন্ত সমাপ্ত করে আদালতে বিচার করে আসামীকে শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করলে অপরাধ কমে যাবে। চকচক করলেই সোনা হয় না। সব কিছুর জন্য অন্যকে দায়ী করে সুন্দর সুন্দর বক্তৃতা দিয়ে দায়িত্বশীল, সৎ ও দেশপ্রেমিক হওয়া যায় না। চলুন.আমরা সকলে নিজের উপর আইন দ্বারা ন্যস্থ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করি। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হই। কথায় বড় না হয়ে কাজে বড় হওয়ার চেষ্টা করি।