চট্টগ্রামের বাঁশখালী এলাকার মোহাম্মদ ইদ্রিসের ছেলে মো. জাহিদুল ইসলাম। তিন বন্ধু মিলে এসেছিলেন কক্সবাজার ঘুরতে। কিন্তু গাড়িতে উঠতে কবলে পড়েন মানবপাচারকারী চক্রের। পরে সাগরপথে অবৈধভাবে ট্রলারযোগে মালয়েশিয়ায় যাত্রাকালে শনিবার ভোরে উদ্ধার করে কোস্টগার্ড। এরপর আনা হয় টেকনাফ কোস্টগার্ড স্টেশনে। দেয়া হয় খাদ্য ও চিকিৎসাসেবা।
উদ্ধার মো. জাহিদুল ইসলাম জানান, তারা তিন বন্ধু কক্সবাজার ঘুরতে এসেছিলেন। পরে একটি গাড়িতে ওঠার পর ড্রাইভার তাদেরকে গন্তব্যের পরিবর্তে অন্যদিকে নিয়ে যেতে থাকে। অনেক দূর যাওয়ার পর তারা ড্রাইভারকে নামিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন। কিন্তু গাড়িতে থাকা দুইজন তাদের নামিয়ে না দিয়ে উল্টো মোবাইল ফোনগুলো কেড়ে নেয়। এরপর মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে তাদেরকে পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়।
জাহিদুল ইসলাম আরও জানান, শুক্রবার মাগরিবের পর থেকে তারা সেখানে আটকে ছিলেন। পরে সাগরে ট্রলারে তুলে দিয়ে গভীর রাতে কোস্টগার্ড তাদের উদ্ধার করে। এরপর এখন কোস্টগার্ড স্টেশনে আছি।
মূলত রাতের আঁধারে সাগরপথে মালয়েশিয়া পাঠানোর নামে ভয়ংকর মানবপাচার চক্রের কবল থেকে ৫০ জনকে উদ্ধার করেছে কোস্টগার্ড। এ সময় চক্রের ৯ সদস্যকে আটক করা হয়। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের কেউ অপহরণের শিকার, কেউ চাকরির প্রলোভনে প্রতারিত হয়েছেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জিম্মি করে নির্যাতন ও পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। বিদেশে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের টার্গেট করা এই চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে কোস্টগার্ড।
কোস্টগার্ড জানায়, রাতের আঁধারে মেরিন ড্রাইভ হয়ে সাগরে থাকা ট্রলার তোলা হয় লোকজন। যেখানে রয়েছে নরসিংদী, নওগাঁ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা। উদ্দেশ্যে- সাগরপথে অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় যাত্রা। কিন্তু খবর পায় কোস্টগার্ড; সাগরে আসে কোস্টগার্ড জাহাজ মনসুর আলী। একই সঙ্গে অভিযানে যোগ দেয় শাহপরী ও বাহারছড়া স্টেশনের সদস্যরা। জাহাজ নিয়ে সাগরে শুরু হয় তল্লাশী, অভিযানে সন্দেহজনক একটি ট্রলারকে থামার নির্দেশ দেয় কোস্টগার্ড। কিন্তু সংকেত অমান্য করে দ্রুত গভীর সাগরের দিকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। পরে ধাওয়া করে টেকনাফের বাহারছড়া সমুদ্র এলাকায় ট্রলারটিকে থামানো হয়। আর তল্লাশিতে ট্রলারটিতে থাকা মালয়েশিয়াগামী ৫০ জন ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করা হয় এবং ৯ জন মানবপাচারকারীকে আটক করা হয়।
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের কেউ অপহরণের শিকার, কেউ চাকরির প্রলোভনে প্রতারিত হয়েছেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ- জিম্মি করে নির্যাতন ও পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করে মানবপাচারকারী চক্র।
উদ্ধার হওয়া নরসিংদীর মোহাম্মদ সুজন মিয়া জানান, তাকে নরসিংদী থেকে ঘুরতে নিয়ে আসার কথা বলে এখানে আনা হয়। পরে তাকে অপহরণ করে দালালের মাধ্যমে অন্যত্র বিক্রি করা হয়। অপহরণকারীরা তাকে জোর করে মালয়েশিয়া পাঠানোর কথা বলতে বাধ্য করে এবং পরিবারের কাছে ফোন দিতে বলে। না হলে তাকে মারধরের হুমকিও দেওয়া হয়। ভয়ে তিনি তাদের নির্দেশমতো পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাকে বলা হয়েছিল যে ১০-১২ দিন পর ফোন দিয়ে টাকা-পয়সা দালালের মাধ্যমে পাঠাতে হবে, যার পরিমাণ প্রায় তিন লাখ টাকা।
উদ্ধার হওয়া নওগাঁর বাসিন্দা মো. ইয়াছিন আরাফাত জানান, তিনি এক বন্ধুর আমন্ত্রণে কক্সবাজারে ঘুরতে আসেন। তবে সেখানে পৌঁছানোর পরই তিনি অপহরণের শিকার হন। তাকে জোরপূর্বক অন্য একটি চক্রের হাতে তুলে দেওয়া হয় এবং পরে একটি বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার কাছে থাকা নগদ টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং তাকে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে তাকে চুপ থাকতে বাধ্য করা হয়। পরে তাকে টর্চার অবস্থায় বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়, কোথায় নেওয়া হচ্ছিল তা তিনি পরিষ্কারভাবে জানতেন না।
এদিকে, মধ্যরাতে উদ্ধারের পর ভুক্তভোগীদের আনা হয় টেকনাফ কোস্টগার্ড স্টেশনে। সেখানে দেয়া হয় চিকিৎসা সেবাসহ খাদ্য সহায়তা।
পরে শনিবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে কোস্টগার্ড জানায়, বিদেশে চাকরি ও উন্নত জীবনের প্রলোভনে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের টেকনাফে এনে গোপন আস্তানায় আটকে নির্যাতন ও মুক্তিপণ আদায় করছিল সংঘবদ্ধ মানবপাচার চক্র। জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে কাজ করছে বাহিনীটি।
টেকনাফ কোস্টগার্ড স্টেশনের কর্মকর্তা লেঃ কমান্ডার মোঃ মুত্তাকীন সিদ্দিকী বলেন, পাচারকারী চক্রটি বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরি ও উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা নাগরিকদের টেকনাফে নিয়ে আসে। পরে তাদের গোপন আস্তানায় আটকে রেখে নির্যাতন ও মুক্তিপণ আদায় করা হতো। পরবর্তীতে তাদের সাগরপথে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পাচারের পরিকল্পনা ছিল। এছাড়া কিছু ভুক্তভোগীকে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের তথ্যও পাওয়া গেছে।
কোস্টগার্ড কর্মকর্তা বলেন, মানবপাচারের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় মামলা করার পাশাপাশি উদ্ধার ভুক্তভোগীদের স্বজনদের নিকট হস্তান্তর করা হবে।