চকরিয়া উপজেলার হারবাং ইউনিয়নের ব্রিকফিল্ড এলাকায় সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতাধীন বিশাল পাহাড় কেটে অন্তত লক্ষাধিক ঘনফুট মাটি লুটের ঘটনা ঘটেছে। দিনরাত স্কেভেটর গাড়ি দিয়ে বিশাল পাহাড়টি কেটে মাটি লুট করে সমতল ভূমিতে পরিনত করা হয়েছে। বর্তমানে সমতল করা ওই জায়গা মোটা দামে প্লটভিত্তিক বিক্রি করছেন দখলবাজরা। এ সুবাদে প্লট কিনে নেওয়া লোকজন খালী জায়গায় এখন নতুন করে অবৈধ স্থাপনা (বসতি) নির্মাণও শুরু করেছেন।
এমন প্রেক্ষাপটে চলতি বর্ষা মৌসুমে কেটে নেওয়া পাহাড় সংলগ্ন ওই এলাকায় ভয়াবহ পাহাড় ধসের উদ্বেগ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে আশ্রয়ন প্রকল্পে বসবাসরত বাসিন্দাদের মাঝে। এতে করে প্রাণহানির আশঙ্কাও করছেন স্থানীয় লোকজন। পাশাপাশি ওই এলাকায় পরিবেশ বিপর্যয়ের শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে অভিযোগ উঠেছে, গত রমজান মাসের আগে জেলা প্রশাসকের ১ নম্বর খাস খতিয়ানের হারবাং মৌজার বিএস ১৬৫১৩ দাগের আওতাধীন আশ্রয়ন প্রকল্পের সরকারি জায়গার পাহাড় কেটে লক্ষাধিক ঘনফুট মাটি লুটের পর সমতল ভূমিতে পরিনত করেছে। সম্প্রতি নতুন স্থাপনা তৈরির হিড়িক পড়লেও এখনো সংশ্লিষ্ট প্রশাসন জড়িতদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নেয়নি।
সরজমিনে জানা গেছে, চকরিয়া উপজেলার হারবাং ইউনিয়নের উত্তর হারবাং ব্রিকফিল্ড এলাকায় ইতোপূর্বে উপজেলা প্রশাসন থেকে সরকারি এক নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত পাহাড় শ্রেণির এই জায়গার পাদদেশে আশ্রয়ণ প্রকল্প তৈরি করে সেখানে অন্তত ১০টি ভুমিহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে।
ওই আশ্রয়ন প্রকল্পের পাশে ওই পাহাড়ের ঢালুতে বেশকিছু পরিবার অবৈধভাবে বসতি স্থাপনের মধ্য দিয়ে বসবাস করে আসছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে স্থানীয় ভাবে নাজেম উদ্দিন, আবদুল খালেক, জসীম উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট মিলেমিশে শক্তিশালী এক্সেভেটর দিয়ে দিনরাত ওই পাহাড় কেটে লক্ষাধিক ঘনফুট মাটি লুটের মাধ্যমে পুরো পাহাড়ের জায়গা সমতল ভূমিতে পরিনত করেছে।
পাহাড় কেটে মাটি লুটের পর এখন খালী জায়গায় প্লট বাণিজ্য শুরু হয়েছে। প্লট কেনার পর সেখানে নতুন স্থাপনা (বসতি) তৈরি করছেন ক্রেতা লোকজন।
এলাকাবাসী জানিয়েছে, পাহাড় কেটে মাটি লুটের পর সমতল ভূমিতে অবৈধ স্থাপনা তৈরির খবর পেরে ইতোমধ্যে কয়েকদফা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে চিত্র ধারণ করে নিয়ে গেছেন হারবাং ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কর্মকর্তা (তহসিলদার) মো. আবুল মনছুর।
ভূমি অফিসের তহসিলদার মো. আবুল মনছুর বলেন, হারবাং ব্রিকফিল্ড এলাকার আশ্রয়ণ প্রকল্পের জায়গার পাহাড় কেটে মাটি লুটের ঘটনায় জড়িতদের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা রুজুসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহনের জন্য চকরিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনারের (ভুমি) কাছে জানানো হয়েছে।
চকরিয়া উপজেলা পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মাহমুদ বলেন, প্রশাসনের উদাসীনতার সুযোগে উত্তর হারবাং এলাকায় বালুদস্যু চক্র ছড়াখালে সেলো মেশিন বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে করছেন। পরিবেশবিধ্বংসী এসব কর্মকাণ্ড বন্ধে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনী পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণে তাঁরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
মনে হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন মাটি ওই চক্রের কাছে রীতিমতো অসহায়।
এ ব্যাপারে চকরিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রূপায়ন দেব বলেন, উত্তর হারবাংয়ের সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের জায়গার পাহাড় কেটে মাটি লুটের খবর পেয়ে হারবাং ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তাকে সাথে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়।
এর প্রেক্ষিতে চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করে গত ২০ এপ্রিল পাহাড় কাটার ঘটনাস্থলে অভিযান চালিয়ে বেশকিছু অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন চকরিয়া উপজেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার (ভুমি) রুপায়ন দেব।
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ার বলেন, সরকারি আশ্রয়নের জায়গা জবরদখল মুক্ত করতে এবং পাহাড় কেটে মাটি লুটের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে উপজেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত সেখানে অভিযান চালিয়ে তৈরি করা অবৈধ স্থাপনা সমুহ ভেঙে উচ্ছেদ করে দিয়েছেন। এখন সরকারি আশ্রয়নের পাহাড় কাটার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হবে।
কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, চকরিয়া উত্তর হারবাংয়ে সরকারি আশ্রয়ন প্রকল্পের জায়গার পাহাড় কেটে মাটি লুটের ঘটনার বিষয়ে আমরা অবগত হয়েছি। সেখানে অভিযান পরিচালনার জন্য চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদফতর থেকে এনফোর্সমেন্ট টিমের সহায়তা চাওয়া হয়েছে। সহসা পরিবেশ অধিদফতর পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহন করা হবে।