পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায় উত্তাল হয়ে উঠেছে পর্যটন নগরী কক্সবাজার। জেলা শহরের বিপণিবিতানগুলোতে ক্রেতাদের অভূতপূর্ব জনস্রোতের কারণে তৈরি হয়েছে ‘শহরে তীব্র যানজট’। গত কয়েকদিন ধরে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত শহরের প্রধান সড়ক ও উপ-সড়কগুলোতে যানবাহন ও মানুষের চাপে এক প্রকার অচলাবস্থা বিরাজ করছে। বিশেষ করে জেলা শহরের নামী-দামী শপিংমল থেকে শুরু করে ফুটপাতের অস্থায়ী দোকান—সবখানেই এখন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। কেনাকাটার এই জোয়ারের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে অসহনীয় যানজট, যা পুরো শহরের জনজীবনকে স্থবির করে দিয়েছে। তবে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ বলছে তারা শহরকে যানজটমুক্ত রাখতে কাজ করে যাচ্ছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, শহরের পানবাজার, নিউমার্কেট, হকার্স মার্কেট, বার্মিজ মার্কেট এলাকা, সালাম আর্কেড এবং বড়বাজার এলাকার বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে এখন ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। নারী ও শিশুদের পোশাকে বৈচিত্র্য বেশি থাকায় এসব মার্কেটে ভিড় সবচেয়ে বেশি লক্ষ করা গেছে। জেলা শহরের বাসিন্দাদের পাশাপাশি আটটি উপজেলার প্রান্তিক মানুষও সেরা কালেকশনের খোঁজে জেলা সদরে ছুটে আসছেন। উত্তর কক্সবাজারের চকরিয়া ও পেকুয়া এবং দক্ষিণ কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ থেকে আসা ক্রেতাদের চাপে লারপাড়া বাস টার্মিনাল ও লিংকরোড এলাকায় দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। রামু ও নবগঠিত ঈদগাঁও উপজেলার বাসিন্দাদের যাতায়াত তুলনামূলক সহজ হলেও মহেশখালী ও কুতুবদিয়া দ্বীপের বাসিন্দাদের নৌ-পথে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে শহরের ঘাটে পৌঁছে রিকশা বা টমটমে করে মার্কেটে আসতে হচ্ছে। ফলে জেটি ঘাট থেকে শুরু করে বাজারঘাটা পর্যন্ত পুরো এলাকা এখন মানুষের দখলে।
শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থার ওপর এই বিপুল জনস্রোতের প্রভাব পড়েছে মারাত্মকভাবে। বাস টার্মিনাল থেকে শুরু করে হলিডে মোড় ও কলাতলী পর্যন্ত দীর্ঘ কয়েক কিলোমিটার জুড়ে শত শত টমটম, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির জটলা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে লালদীঘির পাড়, পানবাজার রোড ও ভোলাবাবুর রোড এলাকায় তীব্র যানজটে আটকে থেকে অতিষ্ঠ হয়ে পড়ছেন ক্রেতা ও সাধারণ পথচারীরা। অনেক জায়গায় সরু রাস্তার ওপর অবৈধ পার্কিং এবং রিকশা-টমটমের অনিয়ন্ত্রিত চলাচলের কারণে পায়ে হেঁটে চলাও দায় হয়ে পড়েছে। ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা যানজট নিরসনে আপ্রাণ চেষ্টা চালালেও ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যানবাহনের চাপে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে যানবাহন চলাচল সাময়িকভাবে ডাইভারশন বা সীমিত করে দেওয়া হচ্ছে।
উপজেলা পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চকরিয়া ও টেকনাফ পৌর শহরের বড় বাজারগুলোতেও কেনাকাটা জমে উঠেছে। তবে উন্নত ব্র্যান্ড ও ফ্যাশন বৈচিত্র্যের আকর্ষণে বিত্তবান ক্রেতারা জেলা সদরের অভিজাত বিপণিবিতানগুলোকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন। উখিয়া ও টেকনাফের সীমান্তবর্তী বাজারগুলোতে স্থানীয়দের পাশাপাশি ক্যাম্পের বাসিন্দাদের উপস্থিতিতে কেনাবেচা বাড়লেও শহরের তুলনায় সেখানে কালেকশন কম হওয়ায় মানুষের স্রোত সদরের দিকেই বেশি। অন্যদিকে মহেশখালী ও কুতুবদিয়ার অভ্যন্তরীণ বাজারগুলোতে স্থানীয়ভাবে বিকিকিনি চললেও ঈদ উপলক্ষে প্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহের জন্য দ্বীপের মানুষ জেলা শহরকে নিরাপদ ও সহজ মনে করছেন। ফলে সবকটি উপজেলার মানুষের সম্মিলিত চাপে জেলা শহরের অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত ভার তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের ঈদ বাজারে বিক্রির পরিমাণ এবং ক্রেতার সমাগম অনেক বেশি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সত্ত্বেও মানুষ সাধ্যমতো কেনাকাটা করছেন। পোশাকের পাশাপাশি জুতা, কসমেটিকস ও আতর-টুপি-তসবিহর দোকানগুলোতেও এখন ভিড় তুঙ্গে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঈদ বাজারকে কেন্দ্র করে অপরাধ দমনে সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি এবং গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে পুলিশি টহল বাড়ানো হয়েছে। তবে যানজট ও অতিরিক্ত ভিড়কে পুঁজি করে পকেটমার ও ছিনতাইকারী চক্রের তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্রেতাদের মাঝে অস্বস্তিও রয়েছে। সম্মিলিতভাবে এই কেনাকাটার হিড়িক জেলার অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চার করলেও অপরিকল্পিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও তীব্র যানজট শহরবাসীর জন্য এখন প্রধান মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সার্বিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) দেবদূত মজুমদার জানান, ঈদ কেনাকাটাকে কেন্দ্র করে জেলা শহরে মানুষের অভাবনীয় জনস্রোত তৈরি হওয়ায় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে যাত্রী ওঠা-নামার কারণে সাময়িক যানজট তৈরি হচ্ছে। তিনি আরও জানান, জনভোগান্তি লাঘবে ট্রাফিক বিভাগে স্বাভাবিকের চেয়ে ৩০ শতাংশ অতিরিক্ত জনবল বাড়ানো হয়েছে। এর পাশাপাশি শহরজুড়ে জেলা পুলিশের নিয়মিত টহল ও বিশেষায়িত মোটরসাইকেল পেট্রোলিং ইউনিটও যানজট নিরসনে সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করছে।