জেলায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। কক্সবাজার সদর, পৌরসভা, টেকনাফসহ বিভিন্ন স্থানে হত্যা, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মব সন্ত্রাস, ধর্ষণ, নির্যাতন, খুন, অপহরণ, রাহাজানি ও কিশোর গ্যাং জনগণের জানমালের নিরাপত্তাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। এমনকি দিনদুপুরেও হত্যার ঘটনা হচ্ছে। হত্যায় আগ্নেয়াস্ত্রসহ দেশীয় ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করছে সন্ত্রাসীরা।
এ কারণে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। অপরাধ দমনে জেলা পুলিশ ব্যর্থ বলে মনে করছেন সাধারণ মানুষ।
তবে পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান বলছেন, গেল সপ্তাহে জোরালো অভিযানে দিনে একশ জনের মত সন্ত্রাসী আটক হলেও জনবল সংকটের কারণে কাঙ্ক্ষিত সেবা, লক্ষ্য পৌছাতে ব্যর্থ হচ্ছে পুলিশ। তিনি জনবল বাড়াতে স্থানীয়দের 'ভয়েজ রেইজ' করার তাগিদ দিয়েছেন।
এদিকে চলতি এপ্রিলের মধ্যেই জেলায় অর্ধ ডজনেরও বেশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। হত্যাকান্ডগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, জমি সংক্রান্ত বিরোধ, অপহরণ পরবর্তী হত্যা, প্রেম সংক্রান্ত বিরোধের জেরে হত্যা, এমনকি অজ্ঞাতনামা লাশেরও হদিস মিলেছে। সাম্প্রতিক আলোচিত ধারাবাহিক হত্যাকান্ডের মধ্যে অন্যতম হলো ১৩ এপ্রিল পিএম খালীর পরানিয়া পাড়ায় যুবক মুবিনকে জায়গা বিরোধের জেরে কুপিয়ে পা বিচ্ছিন্ন করে হত্যা। গতকাল ২২ এপ্রিল সদরের খুরুস্কুলে পাহাড়ি জঙ্গলে মন্দিরের পুরোহিত নয়ন সাধুকে হত্যা করে লাশ পাহাড়ে ফেলে দেওয়ার মত ঘটনা ঘটেছে। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সদর হাসপাতালে প্রেরণ করলেও এ ঘটনায় কাউকেই আটক করতে পারেনি। উদঘাটন করা যায়নি হত্যাকাণ্ডের রহস্য।
এছাড়া গেল ৭ এপ্রিল পর্যটনজোন কলাতলীতে সিলভার বে রিসোর্ট এর সামনে বন্ধুর হাতে বিরোধের জেরে খুন হন টমটম চালক শওকত আলম। এ ঘটনায় পুলিশ সন্ধিগ্ধ দুজনকে আটক করলেও মূল আসামি ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে বলে জানান শওকত আলমের পরিবার।
এই ঘটনার তিনদিন পর ১০ এপ্রিল আজিম নামের এক যুবক খুন হন। পুলিশ অবশ্য দ্রুততার সাথে আজিম হত্যাকাণ্ডে জড়িত মূল ঘাতককে আটক করেছে।
আলোচিত হত্যাকাণ্ডের মধ্যে অন্যতম ঘটনা হলো টেকনাফ বাহারছড়া শীলখালীতে পাহাড়ি আস্তানা থেকে গত মঙ্গলবার সকাল দশটার দিকে তিন জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনাটি পুরো দেশে আইনশৃঙ্খলা চরম অবনতির পরিচয় প্রকাশ করে। ২১ এপ্রিল উদ্ধার হওয়া লাশগুলোর মধ্যে রুহুল আমিনের ছেলে রবি আলম, নুরুল কবিরের ছেলে মুজিব, নুরুল ইসলামের পুত্র নুরুল বশর বলে পুলিশ স্থানীয়দের মাধ্যমে লাশ সনাক্ত করে। টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের উত্তর শীল খালীতে দুর্গম পাহাড়ে প্রতিদিনই অপহরণ খুন এবং মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা ঘটেই চলছে। এক্ষেত্রে পুলিশ নির্বিকার বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। সন্ধ্যা হলেই মানুষ বাড়ি থেকে বের হচ্ছে না অপহরণের ভয়ে।
এদিকে মার্চ মাসে আলেচিত কয়েকটি ও খুনের ঘটনা ঘটেছে কক্সবাজারের বিভিন্ন উপজেলায়। কক্সবাজারে সবচেয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে সমুদ্র সৈকত সংলগ্ন কবিতা চত্বর এলাকায় ছাত্রদল নেতা খোরশেদ আলমকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা। এ ঘটনায় পর পুলিশ বেশ তৎপর হলেও খুনের সাথে জড়িত প্রকৃত হত্যাকারীকে আটক করতে পারেনি বলে পরিবারের দাবি। এই ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সরগরম হলেও প্রকৃত হত্যাকারী আড়ালে রয়ে গেছে বলে পরিবারের দাবি। এছাড়া ও ২৪ মার্চ শহরের পশ্চিম বড়ুয়াপাড়ায় মাদাকাসক্ত ছেলের হাতে খুন হন জন্মদাত্রী মা। পুলিশ অবশ্য হত্যাকারীকে দ্রুত সময়ের মধ্যে আটক করে।
বছরের শুরুতে ১০ জানুয়ারি কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে আসা খুলনার সাবেক কাউন্সিলর গোলাম রব্বানীকে গুলি করে হত্যা করা হয় সীগাল পয়েন্টে। এই ঘটনা কক্সবাজারের আইন-শৃঙ্খলা চরম অবনতির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে চিহ্নিত করে সে সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।পুলিশ অবশ্য দ্রুত সময়ের মধ্যে হত্যাকারীকে চিহ্নিত ও গ্রেফতার করে প্রশংসা কুড়িয়েছে।
পুলিশ সুপার এ এম এম সাজেদুর রহমানের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, 'আমরা গত কয়েকদিন যাবত বিশেষ করে গেল এক সপ্তাহে দৈনিক ১০০ জনের মত বিভিন্ন অপরাধী, ওয়ারেনভুক্ত আসামি গ্রেপ্তার করেছি। আমাদের যথেষ্ট জনবল সংকট রয়েছে। জনবল নিয়োগ দেওয়ার জন্য স্থানীয়দের দাবি জোরালো করতে হবে। আইনশৃঙ্খলার উন্নতিতে পুলিশের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
তিনি বলেন- পুলিশ পরিচয়বিহীন লাশের সন্ধান করে হত্যার মোটিভ উদঘাটন করেছে । বিশেষ করে পিএমখালীর আলোচিত মুবিন হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের সনাক্ত করা হয়েছে। এছাড়া গলাকাটা লাশের তদন্তের ভিত্তিতে পরিচয় সনাক্ত করেছে। আইনশৃঙ্খলা অবনতির জন্য স্থানীয়দের কর্মহীনতা, বেকারত্ব পারিবারিক ও সামাজিক অপরাধকে তিনি দায়ী করেন।
আইনশৃঙ্খলা উন্নতিতে শীঘ্রই একটি পরিকল্পিত অভিযান পরিচালনা করবেন বলেও তিনি জানান।