তীব্র গরমে পর্যটন নগরী কক্সবাজারে পর্যটক টানতে হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টগুলো দিচ্ছে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়। কিন্তু তারপরও ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে ভ্রমণ সংক্ষিপ্ত করে কক্সবাজার ছাড়ছেন পর্যটকরা। তাদের অভিযোগ-৮ ঘণ্টার মধ্যে ৫ ঘণ্টাই থাকছে না বিদ্যুৎ।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) সকাল ১০টা; সৈকতপাড়ের তারকামানের একটি হোটেল। দিনের বেলায় হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যেতেই বন্ধ হয়ে যায় লিফট। আতঙ্কে পড়েন পর্যটকরা। বন্ধ হয়ে যায় বৈদ্যুতিক পাখাও। রুম থেকে বের হয়ে এসে হোটেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তর্কে জড়ান অনেকেই। কিছুক্ষণ পর জেনারেটর চালু করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হলেও ১০ মিনিট পর সেটিও বন্ধ হয়ে যায়। এমন ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে অনেক পর্যটক কক্সবাজার ছাড়ছেন।
পর্যটকদের অভিযোগ ঘনঘন বিদ্যুৎ যাওয়া-আসায় পুরো ভ্রমণের আনন্দই নষ্ট হচ্ছে। দিনের বেলায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় গরমে কষ্ট বাড়ছে কয়েকগুণ। তাদের দাবি, ৮ ঘণ্টার মধ্যে ৫ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকে না।
ঢাকার মতিঝিল থেকে আসা পর্যটক মোহাম্মদ সেলিম বলেন, আমরা এখানে আসি একটু অবসরটা উপভোগ করতে। কিন্তু ঘনঘন লোডশেডিং পুরো মুডটাই নষ্ট করে দেয়। ঢাকায় বাসায় এমন সমস্যা হয় না, কারণ জেনারেটর ব্যাকআপ থাকে। এখানেও ব্যাকআপ আছে, তবে সময়মতো চালু না হওয়ায় ভোগান্তি বাড়ছে।
সাভার থেকে আসা পর্যটক রিয়াজুল কবির বলেন, ‘বিশেষ করে দিনের বেলায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। বলা যায়, ৮ ঘণ্টার মধ্যে অন্তত ৫ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ ছিল না। এতে গরমে ভোগান্তি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। একদিন ইনানী ছিলাম, ওখানে ভয়াবহ লোডশেডিং। আবার ইনানী থেকে কক্সবাজার শহরে এসেও হোটেলে একই অবস্থা। ভয়াবহ লোডশেডিং। অবশেষে কক্সবাজার ছাড়ছি।’
ঢাকার বনানী থেকে আসা পর্যটক নয়ন চৌধুরী বলেন, প্রচণ্ড গরমের মধ্যে অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ে কোথাও স্বস্তি মিলছে না। রুমেও শান্তি নেই, আবার জেনারেটরও বেশিক্ষণ ব্যাকআপ দিতে পারে না। রাতে ঘুমের মধ্যেও বারবার বিদ্যুৎ চলে যায়। তিন দিন থাকার পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু এমন ভোগান্তির কারণে একদিনেই কক্সবাজার ছাড়তে বাধ্য হচ্ছি।’
পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ে কক্সবাজারের পর্যটন খাতে ধস নামছে। ৫০ শতাংশ ছাড় দিয়েও পর্যটক ধরে রাখা যাচ্ছে না। ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে পর্যটকরা আগেভাগেই চেকআউট করছেন। হোটেলগুলোতে জেনারেটর চালাতে প্রতিদিন ১০০ থেকে ২০০ লিটারের বেশি তেল খরচ হচ্ছে। তারপরও কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।
হোটেল প্রসাদ প্যারাডাইসের রক্ষণাবেক্ষণ কর্মকর্তা মেহেদী বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে লোডশেডিং অনেক বেড়ে গেছে। প্রতিদিন প্রায় ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। ফলে জেনারেটর চালাতে আমাদের অতিরিক্ত তেল খরচ হচ্ছে। প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ২০ লিটার তেল লাগে, এতে দৈনিক ১৪০ থেকে ১৫০ লিটারেরও বেশি তেল ব্যয় হচ্ছে।
হোটেল ওশ্যান প্যারাডাইসের ম্যানেজার আব্দুল হান্নান বলেন, এটা সত্য যে আমরা ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ডিসকাউন্ট দেয়ার পরও অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে অনেক পর্যটক তাদের পরিকল্পনা পরিবর্তন করছেন। যারা দুই-তিন দিনের জন্য আসেন, তারা এই ভোগান্তির কারণে পুরো সময় থাকতে পারছেন না। ফলে অনেকেই আগেভাগে চেক-আউট করে কক্সবাজার ছাড়ছেন-মূলত অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণেই।
তীব্র গরম আর লোডশেডিংয়ে বিপাকে পড়েছেন সৈকতপাড়ের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও। পর্যটক না থাকায় খালি পড়ে আছে ট্যুরিস্ট জিপ। অলস সময় পার করছেন ইজিবাইক চালকরা। বার্মিজ পণ্যের দোকানিরা গুনছেন লোকসান। পর্যটক কমে যাওয়ায় বিক্রি না হয়ে নষ্ট হচ্ছে ডাব। বালিয়াড়ির হকারদেরও দুঃখের শেষ নেই।
লাবনী পয়েন্টের ছাতা মার্কেটের ব্যবসায়ী মো. মোরশেদ বলেন, বর্তমানে অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে পর্যটকও কমে গেছে, আর গরমের ভোগান্তিও আছে। আগে যেখানে দিনে ৫০-৬০ হাজার টাকার মতো বিক্রি হতো, এখন তা নেমে প্রায় ১০ হাজার টাকায় এসেছে। সন্ধ্যার সময় আমাদের মূল বিক্রি হলেও তখনই বিদ্যুৎ না থাকায় বিক্রিতে বড় ধস নেমেছে। ফলে ব্যবসা অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পর্যটন ব্যবসায়ীদের দাবি, লোডশেডিংয়ের কারণে প্রতিদিনই পর্যটন খাতে কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। তবে বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, ঘাটতির মধ্যেও সমন্বয় করে পর্যটন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চলছে।
মেরিন ড্রাইভ-কলাতলী হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, সব হোটেলে জেনারেটর দিয়ে এসি পর্যন্ত চালানো সম্ভব নয়। একটি মাঝারি মানের হোটেলেও প্রতিদিন গড়ে ১০০ থেকে ১৫০ লিটার পর্যন্ত ফুয়েল খরচ হচ্ছে। কিন্তু ফুয়েলের সংকট ও দাম বৃদ্ধির কারণে আমাদের আর্থিক ক্ষতি ক্রমেই বাড়ছে।
কক্সবাজার বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল কাদের গণি বলেন, চাহিদা বেশি থাকায় কিছুটা বিদ্যুৎ ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। কক্সবাজারের হোটেল-মোটেল জোনে প্রায় ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হলেও আমরা গড়ে ৩০ থেকে ৪৫ মেগাওয়াট পর্যন্ত সরবরাহ পাচ্ছি, কখনও কখনও সর্বোচ্চ ৫০ মেগাওয়াটও পাওয়া যায়।
তিনি আরও বলেন, আজকের চাহিদা অনুযায়ী প্রায় ৫০ মেগাওয়াট প্রয়োজন হলেও আমরা পাচ্ছি প্রায় ৩৫ মেগাওয়াট। ফলে প্রায় ১৫ মেগাওয়াট ঘাটতির কারণে কক্সবাজার পৌরসভা ও পিডিবি এলাকায় পর্যায়ক্রমে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। পর্যটন এলাকা বিবেচনায় রেখে আমরা লোড ম্যানেজমেন্ট ও মনিটরিং করছি এবং ভবিষ্যতে আরও ভালোভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহের চেষ্টা চলছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাহিদা আর সরবরাহের বড় ঘাটতিতে বাড়ছে লোডশেডিং আর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন শিল্প।