রোহিঙ্গাদের এলপিজি সরবরাহে তহবিল সংকটের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে ভাসানচরে এলপিজি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গারা বলছেন, এলপিজি বন্ধ হলে রান্নার জ্বালানির জন্য আবারও নির্ভর করতে হবে বনের ওপর।
সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে বলছেন, এতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে উখিয়া-টেকনাফের বন ও পরিবেশ। তাই প্রয়োজনীয় সময় পর্যন্ত এলপিজি কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে আন্তর্জাতিক সহায়তা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
২০১৭ সালের রোহিঙ্গা ঢলের পর রাতারাতি পাল্টে যায় কক্সবাজারের পাহাড়ি জনপদ। গড়ে ওঠে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ আশ্রয়শিবির। রান্নার জ্বালানির জন্য তখন একমাত্র ভরসা ছিল বন থেকে আনা কাঠ। প্রতিদিন হাজার হাজার রোহিঙ্গা পরিবার ছুটে যেত জঙ্গলে। দ্রুত উজাড় হতে থাকে সংরক্ষিত বনভূমি।
উখিয়ার ৪ নম্বর ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ জোবায়ের ও সেতেরা দম্পতি। এলপিজি আসার আগে প্রতিদিন রান্নার জন্য ব্যবহার করতেন প্রায় ৫ কেজি কাঠ। কিন্তু এখন এলপিজি পাওয়ার কারণে তাদের আর জঙ্গলে যেতে হয় না। নেই বনের ভেতরে গিয়ে কাঠ সংগ্রহের ঝুঁকিও।
ক্যাম্প-৪ এর বাসিন্দা সেতেরা বেগম (২৫) বলেন, মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে শুরুতে ক্যাম্পে কোনো গ্যাস সরবরাহ ছিল না। তখন রান্নার জন্য বনে গিয়ে গাছপালা কেটে আনতে হতো। এতে স্থানীয় গ্রামবাসীর সঙ্গে প্রায়ই সমস্যার সৃষ্টি হতো। তবে গ্যাস সরবরাহ শুরু হওয়ার পর তাদের সেই ভোগান্তি অনেকটাই কমেছে। এখন আর জ্বালানির জন্য বনে যেতে হয় না এবং স্থানীয়দের সঙ্গেও কোনো বিরোধ হচ্ছে না।
মোহাম্মদ জোবায়ের (৩০) বলেন, আগে জ্বালানি হিসেবে লাকড়ি ব্যবহার করায় রান্নার সময় পুরো ঘর ধোঁয়ায় ভরে যেত এবং এতে শিশুদের অসুস্থতা বাড়ত। কিন্তু গ্যাস পাওয়ার পর ঘর ধোঁয়ামুক্ত থাকছে এবং বাচ্চাদের অসুস্থতাও কমে গেছে।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, যদি গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে আবার আগের মতো কষ্টে পড়তে হবে। জ্বালানির জন্য বনে গিয়ে গাছ কাটতে হবে, স্থানীয় গ্রামবাসীর সঙ্গে বিরোধের ঝুঁকি তৈরি হবে এবং ঘরে ধোঁয়ার কারণে শিশুদের অসুস্থতাও আবার বেড়ে যেতে পারে।
পরিবেশ রক্ষা এবং নিরাপদ জ্বালানি নিশ্চিত করতে সেইফ প্লাস কর্মসূচির আওতায় ২০১৮ সালে ক্যাম্পগুলোতে শুরু হয় এলপিজি বিতরণ কর্মসূচি। বর্তমানে এই কর্মসূচি সেইফ প্লাস টু নামে পরিচিত। এই উদ্যোগের ফলে বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্পে প্রায় আড়াই লাখ পরিবার নিয়মিত এলপিজি পাচ্ছে।
বন বিভাগের তথ্য বলছে- ২০১৭ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রায় ৭ হাজার একর বনভূমি। ধ্বংস হয় ২ হাজার ২৭ একর সৃজিত বন এবং ৪ হাজার ১৩৬ একর প্রাকৃতিক বন। বাড়ে পাহাড়ধসের ঝুঁকি, ক্ষতিগ্রস্ত হয় জীববৈচিত্র্য, সংকুচিত হয়ে পড়ে এশিয়ান হাতির আবাসস্থলও। আর শুধু রান্নার জন্যই প্রতিদিন প্রয়োজন হতো প্রায় ৯০০ মেট্রিক টন জ্বালানি কাঠ।
তবে রোহিঙ্গারা বলছেন, এই সরবরাহ বন্ধ হলে তারা শুধু জ্বালানি সংকটেই পড়বেন না, পুনরায় বাড়বে বন উজাড়ের চাপও।
ক্যাম্প-৪ এর ডি-৫ ব্লকের বাসিন্দা আব্দুল কুদ্দুস (৫৫) বলেন, ‘মিয়ানমার থেকে নতুন করে বাংলাদেশে আসার পর রান্নার জ্বালানি নিয়ে তারা খুব কষ্টে ছিলেন। জ্বালানির জন্য বনে গিয়ে গাছ কাটতে হলে অনেক সময় মারধরের শিকার হতে হতো এবং টাকা দিতে হতো। এমনকি অনেক সময় খাদ্য সহায়তা হিসেবে পাওয়া চাল–ডাল দিয়েও লাকড়ি সংগ্রহ করতে হয়েছে। পরে গ্যাস সরবরাহ শুরু হওয়ার পর সেই ভোগান্তি অনেকটাই কমেছে। এখন আর জ্বালানির জন্য বনে যেতে হয় না এবং তুলনামূলকভাবে নিরাপদে আছেন। তবে যে পরিমাণ গ্যাস দেওয়া হয় তা পরিবারের জন্য যথেষ্ট হয় না। পরিবারের সদস্য বেশি হওয়ায় অনেক সময় মাস শেষ হওয়ার ৭ থেকে ১০ দিন আগেই গ্যাস শেষ হয়ে যায়।’
ক্যাম্প-৪ এর এ-৬ ব্লকের বাসিন্দা রশিদা বেগম (৪০) বলেন, গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। এত মানুষের জন্য তখন কীভাবে রান্না করে খাবার জোগাড় করা হবে, তা নিয়ে তারা বড় দুশ্চিন্তায় থাকব।
একই ক্যাম্পের এফ ব্লকের বাসিন্দা খালেদ হোসেন (২০) বলেন, ক্যাম্পে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে রোহিঙ্গাদের জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠবে। রান্নার জ্বালানির জন্য তখন বাধ্য হয়ে বনে গিয়ে গাছ কাটতে হবে। এতে বন্য হাতির আক্রমণসহ নানা ঝুঁকির মুখে পড়তে হতে পারে। তাই গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে রোহিঙ্গারা বড় ধরনের সমস্যার মধ্যে পড়বে।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম যৌথভাবে এই এলপিজি সরবরাহ কর্মসূচি পরিচালনা করছে। তাদের মতে, এলপিজি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে উখিয়া-টেকনাফের বন ও পরিবেশের ওপর।
ইউএনএইচসিআরের অ্যাসিস্ট্যান্ট ফিল্ড অফিসার সারাহ জাবিন বলেন, তহবিল সংকটের কারণে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এলপিজি সরবরাহ কার্যক্রম কয়েকবারই ঝুঁকির মুখে পড়েছে। তিনি জানান, এই সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে এর পরিণাম ভয়াবহ হতে পারে। কারণ কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছেন। জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হলে শুধু রান্নার সমস্যা নয়, অগ্নি নির্বাপণসহ নিরাপত্তা ব্যবস্থাতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়বে।
তিনি বলেন, এলপিজি সরবরাহ বন্ধ হলে রোহিঙ্গারা জ্বালানি হিসেবে গাছ কাটার দিকে ঝুঁকবে, যা পরিবেশ ও স্থানীয় হোস্ট কমিউনিটির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়াবে। বর্তমানে প্রতিটি রোহিঙ্গা পরিবারকে ১২ কেজি এলপিজির একটি সিলিন্ডার দেওয়া হয় এবং পরিবারের সদস্যসংখ্যা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় অন্তর তা সরবরাহ করা হয়। ২০১৮ সাল থেকে ইউএনএইচসিআর এই সহায়তা দিয়ে আসছে।
সারাহ জাবিন আরও জানান, এলপিজি ব্যবহারের ফলে বন উজাড় ও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি কমেছে। ক্যাম্পের অধিকাংশ আশ্রয়স্থল বাঁশসহ দাহ্য উপকরণে তৈরি হওয়ায় আগুন লাগলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে এলপিজি শুধু রান্নার জ্বালানি নয়, নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি পরিবারকে এলপিজি দেওয়ার আগে এক ঘণ্টার বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং প্রতি দুই বছর পরপর সেই প্রশিক্ষণ পুনরায় আয়োজন করা হয়।
তবে পুরো কর্মসূচিটিই নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর। আর দাতা সংস্থাগুলোর তহবিল সংকটে ইতোমধ্যে কিছু এলাকায় এলপিজি সরবরাহে বিঘ্ন দেখা দিয়েছে। তবুও এই উদ্যোগ চালু রাখতে আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত থাকবে-এমনটাই আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে এলপিজি সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে যেসব রোহিঙ্গা কিছুটা সামর্থ্যবান তারা বাজার থেকে লাকড়ি কিনছেন, আর যাদের সেই সামর্থ্য নেই তারা বাধ্য হয়ে আশপাশের বন থেকে গাছ কাটছেন।
তিনি বলেন, বিষয়টি জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে জানানো হয়েছে। তবে বর্তমানে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে আর্থিক সংকট। যদি পর্যাপ্ত তহবিলের অভাবে এলপিজি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা না যায়, তাহলে গত সাত-আট বছরে ক্যাম্প এলাকায় যে গাছ লাগিয়ে একটি সবুজ পরিবেশ গড়ে তোলা হয়েছে, তা দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মিজানুর রহমান আরও বলেন, এর প্রভাব শুধু ক্যাম্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। আশপাশের পাহাড় ও বনাঞ্চলও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এ কারণে তিনি ইউএন এজেন্সি ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, তারা যেন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ডোনারদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়। কারণ মূল সমস্যা এখন অর্থের ঘাটতি।
ইউএনএইচসিআরের যোগাযোগ কর্মকর্তা শারি নিজমান বলেন, জাতিসংঘের অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ে ‘সেফ প্লাস–২’ নামে একটি উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এই উদ্যোগটি মূলত দুটি ক্ষেত্রে কাজ করে।প্রথমত, শিবিরের প্রতিটি রোহিঙ্গা পরিবারে এলপিজি বিতরণ করা হচ্ছে। এর ফলে রান্নার জ্বালানি হিসেবে কাঠের ওপর নির্ভরশীলতা কমেছে, যা পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কাঠ পোড়ানোর ধোঁয়া থেকে সৃষ্ট শ্বাসযন্ত্রের বিভিন্ন রোগের ঝুঁকিও কমছে। পাশাপাশি, জ্বালানি কাঠ সংগ্রহে দীর্ঘ সময় ব্যয় করার প্রয়োজন না থাকায় শরণার্থীদের সময় ও শ্রম সাশ্রয় হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, এই উদ্যোগের আওতায় শিবিরের ভেতরে ও আশপাশে ব্যাপক হারে বৃক্ষরোপণ ও সবুজায়ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এর ফলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হচ্ছে। গ্রীষ্মকালে গাছপালা তাপ থেকে আশ্রয় দেয়, আর বর্ষাকালে গাছের শিকড় মাটিকে দৃঢ়ভাবে ধরে রেখে ভূমিধস ও কাঁদাধসের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে।
শারি নিজমান আরও বলেন, ক্যাম্পে পরিচালিত অন্যান্য কার্যক্রমের মতোই এই কর্মসূচিও দাতাদের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে মানবিক তহবিল হ্রাসের চ্যালেঞ্জ থাকলেও এলপিজি কর্মসূচি অব্যাহত রাখা অত্যন্ত জরুরি। কারণ, কোনো কারণে এলপিজি সরবরাহ ব্যাহত হলে বা পরিবারগুলো পর্যাপ্ত জ্বালানি না পেলে তারা তাৎক্ষণিকভাবে আবার কাঠ সংগ্রহে ফিরে যায়, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।
তাই তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রয়োজনীয় সময় পর্যন্ত যেন এলপিজি কর্মসূচি অব্যাহত রাখা যায় এবং দাতারা এ উদ্যোগে তাদের সমর্থন বজায় রাখবেন।
এদিকে মানবিক সংস্থাগুলোর যৌথ উদ্যোগে সেইফ প্লাস টু কর্মসূচির আওতায় উখিয়া ও টেকনাফ এলাকায় ৩ হাজার হেক্টর জমিতে নতুন করে বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে। এরমধ্যে ৭০০ হেক্টরেরও বেশি এলাকা রয়েছে সরাসরি ক্যাম্পের ভেতরে। এসব উদ্যোগ শুধু কার্বন শোষণে সাহায্য করছে না। পাহাড়ি ঢালে মাটি শক্ত রাখতেও ভূমিকা রাখছে।
এক সময় কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়গুলো কেঁদেছিল বৃক্ষহীনতার বেদনায়। আজ সেখানে নতুন চারা গজাচ্ছে। একটি এলপিজি সিলিন্ডার হয়তো একটি পরিবারকে রান্নার সুযোগ দেয়- কিন্তু বাঁচিয়ে দেয় একটি বন, একটি পাহাড়, একটি ভবিষ্যৎ এমনটায় মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।