কক্সবাজারমুখী রেলসেবায় আসছে বড় পরিবর্তন। এ মাসেই বাড়ছে আরও এক জোড়া আন্তঃনগর ট্রেন, চট্টগ্রামের ‘মহানগর’ ট্রেন যাবে কক্সবাজার পর্যন্ত। একই সঙ্গে লোকোমোটিভ সংকট কাটাতে নতুন ইঞ্জিন সংযোজন, কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা, পরিবেশ পুনরুদ্ধারে পুনর্বনায়ন এবং পঞ্চগড় থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ডুয়েল গেজ রেলপথ বাস্তবায়নের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ।
শনিবার (০১ আগস্ট) কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশন ও কক্সবাজার-দোহাজারি রেলপথ পরিদর্শনকালে তিনি এসব ঘোষণা দেন।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, বর্তমানে চলাচল করছে চার জোড়া আন্তঃনগর ট্রেন, যা বাড়িয়ে পাঁচ জোড়া করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। শিগগিরই চট্টগ্রামের ‘মহানগর’ ট্রেন কক্সবাজার পর্যন্ত সম্প্রসারণ ও এসি ট্রেনে রূপান্তর করা হবে। চলতি মাসেই আরও এক জোড়া ট্রেন চালুর আশা জানিয়েছেন রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ।
তিনি বলেন, কক্সবাজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি গন্তব্য। বর্তমানে কক্সবাজার রুটে প্রতিদিন চার জোড়া আন্তঃনগর ট্রেন চলাচল করছে। এ সংখ্যা বাড়িয়ে পাঁচ জোড়া করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ মাসের মধ্যেই আরও এক জোড়া ট্রেন চালুর আশা করছি। চট্টগ্রাম থেকে চলাচলকারী ‘মহানগর’ ট্রেনটি শিগগিরই কক্সবাজার পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হবে এবং এটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) ট্রেনে রূপান্তর করা হবে।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে রেলসেবা আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন রেলপথের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও প্রয়োজনের তুলনায় লোকোমোটিভের কিছু সংকট রয়েছে। তা সত্ত্বেও বিদ্যমান সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি নতুন লোকোমোটিভ যুক্ত করে এ ঘাটতি দূর করার চেষ্টা চলছে।
তিনি আরও বলেন, জনগণের চাহিদার কথা বিবেচনায় নিয়ে রেলসেবা আরও বৃদ্ধি করা হবে। প্রধানমন্ত্রীও রেলসেবার পরিধি ও মানোন্নয়নের বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন এবং সে লক্ষ্যেই কাজ করছে সরকার।
প্রতিমন্ত্রী সকালে কক্সবাজার আইকনিক রেল স্টেশন ভবন ঘুরে ঘুরে পরিদর্শন করেন এবং যাত্রীসেবা, অবকাঠামো, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা ও চলমান কার্যক্রমের খোঁজখবর নেন। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
পরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, রেলপথ নির্মাণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবেশ পুনরুদ্ধারেও কাজ করছে সরকার। দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণে কাটা গাছের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে নতুন করে গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, দোহাজারী থেকে কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণের সময় প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার গাছ কাটা হয়েছিল। এর পরিবর্তে যে পুনর্বনায়ন করা হয়েছে, তার বর্তমান অবস্থা সরেজমিনে পরিদর্শন করা হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, কোথাও কোথাও লাগানো গাছের মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ টিকে আছে, বাকিগুলো নষ্ট হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, রেলপথ নির্মাণের কারণে যে পরিবেশগত ক্ষতি হয়েছে, তা পুনরুদ্ধারে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে গাছের ঘাটতি পূরণ করা হবে। এ কার্যক্রমে রেলওয়ে, বন বিভাগ, স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনকে সম্পৃক্ত করে নতুন করে বনায়ন বাস্তবায়ন করা হবে, যাতে কাটা গাছের ক্ষতি যথাসম্ভব পুষিয়ে নেওয়া যায়।
এদিকে কক্সবাজার রেলস্টেশন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার পরিকল্পনার কথাও জানান প্রতিমন্ত্রী। পাশাপাশি পঞ্চগড় থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ডুয়েল গেজ রেলপথ এবং ঢাকা-সিলেট রুটে ডুয়েল গেজ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, রেল খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে কক্সবাজার রেলস্টেশনটি বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এ বিষয়ে টেন্ডার প্রক্রিয়া চলছে। টেন্ডার কার্যক্রম সম্পন্ন হলে স্টেশনটি বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশন পরিদর্শন শেষে প্রতিমন্ত্রী দুপুরে গ্যাংকারযোগে যান রামু স্টেশনে। সেখানে তিনি রামু স্টেশন পরিদর্শন করেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন।
এসময় রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, সরকারের লক্ষ্য সারা দেশে আধুনিক ও সমন্বিত রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এ লক্ষ্যে পঞ্চগড় থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ডুয়েল গেজ রেলপথ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বর্তমান সরকারের মেয়াদে ঢাকা-সিলেট রুটেও ডুয়েল গেজ রেলপথ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত একটি কর্ড লাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) চলছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৭০ কিলোমিটার পথ কমে যাবে এবং যাত্রাসময়ে প্রায় ১ ঘণ্টা ২০ মিনিট সাশ্রয় হবে।
তিনি বলেন, সরকারের মূল উদ্দেশ্য হলো কক্সবাজারকে দেশের সব অঞ্চলের সঙ্গে কার্যকর ও আধুনিক রেল যোগাযোগের আওতায় আনা।
এদিকে কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফর রহমান কাজল বলেন, 'শুধু পর্যটক নয়. স্থানীয়দের কথা বিবেচনা নিয়ে ঢাকা-কক্সবাজার রেলপথ উন্নত ও সেবার মান বাড়ানোর দাবি স্থানীয় সংসদ সদস্যের।'
পরিদর্শনকালে রেল মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
প্রসঙ্গত, ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর চালু হওয়া এই রুটটি পর্যটন চাহিদা বাড়ার কারণে দেশের অন্যতম ব্যস্ত রেলপথে পরিণত হয়েছে। শুরুতে ট্রেনগুলো শুধু ঢাকা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত চলাচল করত। কয়েক মাস পর বাংলাদেশ রেলওয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে সম্প্রসারণ করে।