বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের শহর কক্সবাজার। যেখানে আছে সমুদ্রের ঢেউ, বিস্তীর্ণ বালিয়াড়ি, পাহাড়, দ্বীপ, নদী, জীববৈচিত্র্য আর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি। প্রকৃতি কক্সবাজারকে দিয়েছে পর্যটনের এক অনন্য ভাণ্ডার। সমুদ্র সৈকতকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই পর্যটন নগরী প্রতিবছর দেশের লাখো মানুষের ভ্রমণ গন্তব্য হয়ে ওঠে। পর্যটকের সঙ্গে বাড়ে হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা, পর্যটনসেবা ও বিনোদন কেন্দ্রিক অর্থনীতি।
কিন্তু সম্ভাবনার বিপরীতে কক্সবাজারের বাস্তব চিত্রে রয়েছে নানা সংকট। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পাহাড় কাটা, সৈকত ও বালিয়াড়ি দখল, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, পরিবেশগত অবক্ষয়, যানজট, পানি ও পয়নিষ্কাশন সমস্যা, পর্যটন মৌসুমে অতিরিক্ত চাপ, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পর্যটন ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতা।
ফলে বিশ্ব পর্যটন দিবস ঘিরে প্রশ্ন উঠছে, পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেই কি কক্সবাজারের পর্যটন টেকসই হচ্ছে? তাই পর্যটক বাড়ানোর প্রতিযোগিতা না করে টেকসই পর্যটনের ভিত্তি শক্ত করার কথা বলছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
কক্সবাজারের পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী বেলাল আবেদীন ভূট্টো। যিনি কক্সবাজারকে শুধু মাত্র সমুদ্র সৈকতের শহর হিসেবে দেখার পক্ষে নন।
তিনি বলেন, কক্সবাজার জেলার পর্যটন সম্ভাবনা সৈকতের অনেক বাইরে। কক্সবাজারের মূল শহরের বাইরে রয়েছে ইনানী, হিমছড়ি, পাটুয়ারটেক, দরিয়ানগর, মহেশখালী, সোনাদিয়া, কুতুবদিয়া, টেকনাফ, শাহপরীর দ্বীপ এবং সেন্টমার্টিন। পাহাড়, ম্যানগ্রোভ, প্রবাল দ্বীপ, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, লবণচাষ, শুঁটকি, মাছধরা, স্থানীয় সংস্কৃতি ও গ্রামীণ জীবনকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে কক্সবাজারে তৈরি হতে পারে বহুমাত্রিক পর্যটন অর্থনীতি।
তিনি বলেন, এক সময় হয়তো পর্যটকরা এখানে আসতেন শুধু সমুদ্র দেখার জন্য। কিন্তু এখন তার প্রসার হয়েছে। এখন পর্যটক সহ শিক্ষার্থী-গবেষক আসেন। যারা প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ, পাখি দেখা, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণ, পাহাড়ি ট্রেইল, স্থানীয় খাবার, সংস্কৃতি, নৌভ্রমণ, গ্রামীণ পর্যটন এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটনের দিকেই বেশি আগ্রহী।
তাঁর মতে, একটি গন্তব্যের পর্যটন যত বেশি একটি মাত্র আকর্ষণের ওপর নির্ভরশীল থাকে, তত বেশি সেটি মৌসুমি চাপ ও পরিবেশগত ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। কক্সবাজারের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা। সৈকতকেন্দ্রিক পর্যটনের বাইরে নতুন গন্তব্য তৈরি করা গেলে একদিকে মূল শহরের ওপর চাপ কমবে, অন্যদিকে জেলার প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জন্যও পর্যটন অর্থনীতির সুযোগ তৈরি হবে।
কক্সবাজারের পর্যটন সম্ভাবনার সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন সরাসরি সম্পর্কিত মন্তব্য করে একাধিক গ্রন্থের প্রণেতা ও গবেষক কালাম আজাদ জানান, এক সময় কেবল সড়ক পথেই ছিল কক্সবাজারের আসা-যাওয়ার মাধ্যম। বিমান ছিল; তবে তা হাতে-গোনা। সময় বদলে গেছে। ট্রেন আসছে নিয়মিত। এর সংখ্যাও বাড়ানো হচ্ছে। ইতিমধ্যে বিমান যোগাযোগের সম্প্রসারণ, কক্সবাজার বিমানবন্দরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং নতুন টার্মিনাল চালু হওয়ার ঘোষণার মধ্য দিয়ে পর্যটন খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দ্রুত কক্সবাজারে পৌঁছানোর সুযোগ বাড়লে পর্যটকের সংখ্যা বাড়তে পারে। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের সুযোগও তৈরি হবে।
তিনি বলেন, বিমানবন্দর সম্প্রসারণকে শুধু যাত্রী পরিবহনের অবকাঠামো হিসেবে দেখলে হবে না। আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে কক্সবাজারকে প্রস্তুত করতে হলে বিমানবন্দরের পাশাপাশি হোটেল, পরিবহন, পর্যটন তথ্যকেন্দ্র, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, বহুভাষিক সেবা, অনলাইন বুকিং, গাইড এবং পর্যটনবান্ধব নগর ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশি পর্যটক আসার আগে গন্তব্যকে আন্তর্জাতিক মানের সেবা দেওয়ার উপযোগী করা না গেলে শুধু বিমান যোগাযোগ বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কক্সবাজারের পর্যটনের অর্থনীতির সাথে স্থানীয় মানুষের জীবন জড়িত। কক্সবাজারের পর্যটন শুধু হোটেল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত নয়। এর সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছেন পরিবহন শ্রমিক, রেস্তোরাঁ কর্মী, ট্যুর অপারেটর, ফটোগ্রাফার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, সৈকত কেন্দ্রিক ব্যবসায়ী, জেলে, কারিগর, কৃষক এবং বিভিন্ন পেশার মানুষ।
নারী উদ্যোক্তা নয়ন সেলিনা জানান, কক্সবাজারে একজন পর্যটক এসে হোটেলে থাকার পাশাপাশি খাবার খান, যানবাহন ব্যবহার করেন, কেনাকাটা করেন, বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে যান। ফলে পর্যটনের অর্থ স্থানীয় অর্থনীতির বহু স্তরে ছড়িয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, বড় বিনিয়োগের সঙ্গে স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের সংযুক্ত করা না গেলে পর্যটনের অর্থনৈতিক সুফল একটি সীমিত গোষ্ঠীর মধ্যে কেন্দ্রীভূত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কক্সবাজারের পর্যটনের সাথে প্রকৃতি পরিবেশ জড়িত বলে মন্তব্য করেছেন কক্সবাজারের পরিবেশবাদি সংগঠন ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস) এর চেয়াম্যান অ্যাডভোকেট মুজিবুল হক।
তিনি বলেন, সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়ি, উপকূলীয় বন, পাহাড়, জলাভূমি, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, সবকিছু মিলে কক্সবাজারের প্রাকৃতিক পরিচয়। কিন্তু অপরিকল্পিত স্থাপনা, বালিয়াড়ি দখল, পাহাড় কাটা, প্লাস্টিক ও কঠিন বর্জ্য, অপর্যাপ্ত পয়োনিষ্কাশন এবং পর্যটকের অতিরিক্ত চাপ এই পরিবেশকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। উপকূলীয় বালিয়াড়ি কেবল সৌন্দর্যের অংশ নয়; ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও ঢেউয়ের অভিঘাত থেকে উপকূলকে রক্ষায় এগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অথচ বিভিন্ন এলাকায় বালিয়াড়ি সমতল করে স্থাপনা নির্মাণ বা ব্যবসায়িক ব্যবহার পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
একইভাবে পাহাড় কেটে স্থাপনা নির্মাণ করলে শুধু পাহাড়ের সৌন্দর্য নষ্ট হয় না, বরং ভূমিধস, পানিপ্রবাহের পরিবর্তন ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির ঝুঁকি আরও বেড়েছে মন্তব্য করে তিনি পরিবেশবান্ধব পর্যটন বিকাশে করণীয় নির্ধারণ করার দাবি জানান।
পর্যটনের সাথে বর্জ্যের শহর হওয়ার ঝুঁকিও দেখছেন তিনি। তিনি বলেন, পর্যটন মৌসুমে কক্সবাজার শহর ও সৈকতে মানুষের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। সঙ্গে বাড়ে প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন, খাবারের প্যাকেট, ওয়ান-টাইম প্লাস্টিকসহ নানা ধরনের বর্জ্য। পর্যটন কেন্দ্রে পর্যাপ্ত ডাস্টবিন থাকলেও শুধু ডাস্টবিন বসিয়ে বর্জ্য সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন উৎস পর্যায়ে বর্জ্য পৃথকীকরণ, নিয়মিত সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহার, নিরাপদ নিষ্পত্তি এবং পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের আচরণ পরিবর্তনের উদ্যোগ।
পর্যটন বিকাশে প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন ঘিরে পর্যটন ও সংরক্ষণের দ্বন্দ্ব রয়েছে মন্তব্য করেছেন ওই দ্বীপেই ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি খোরশেদ আলম।
দ্বীপে ইউনিয়নের এই ইউপি সদস্য জানান, পর্যটন মানচিত্রে সেন্টমার্টিন একটি বিশেষ আকর্ষণ। প্রবালনির্ভর এই দ্বীপের পরিবেশগত গুরুত্বও অনন্য। কিন্তু পর্যটকের চাপ, প্লাস্টিক ও বর্জ্য, অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, অতিরিক্ত নির্মাণ এবং সামুদ্রিক পরিবেশের ওপর চাপ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। ফলে পর্যটন বন্ধ করে দেওয়া এবং অবাধ পর্যটন, এই দুই চরম অবস্থানের বাইরে পরিবেশগত সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে পর্যটন পরিচালনার প্রয়োজন রয়েছে। দৈনিক পর্যটক সংখ্যা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, নৌযান নিয়ন্ত্রণ, প্রবাল ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ সবকিছু একই ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে।
কক্সবাজারে পর্যটন মানে শুধু আনন্দ নয়; নিরাপত্তাও - এমনই বলেছেন সৈকতের পর্যটকদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত সি-সেফ প্রকল্পের ফিন্যান্স অ্যান্ড অ্যাডমিন কর্মকর্তা হাফেজ আহমেদ।
তিনি বলেন, '১২০ কিলোমিটার সৈকতে মাত্র ২৭ জন লাইফগার্ড দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ। এখানে অন্তত কয়েক’শ প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড প্রয়োজন।'
তাঁর মতে, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে প্রতি বছর পানিতে ডুবে পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। দীর্ঘ উপকূলরেখার তুলনায় লাইফগার্ডের সংখ্যা ও নজরদারি সীমিত। সৈকতের সব এলাকায় একই ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। লাল পতাকা, সতর্কীকরণ সাইন, পর্যটক নির্দেশনা, লাইফগার্ড, উদ্ধার নৌযান এবং দ্রুত চিকিৎসা, এসব ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও সমন্বিত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে পর্যটকেরা অনেক সময় জোয়ার-ভাটা, স্রোত কিংবা রিপ কারেন্ট সম্পর্কে জানেন না। ফলে সৈকতে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে পর্যটককে নিরাপত্তা নির্দেশনা দেওয়া এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
কক্সবাজার শহরের ওপর পর্যটনের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। পর্যটন মৌসুমে যানজট, পার্কিং সংকট, ফুটপাত দখল, অপরিকল্পিত দোকান, শব্দদূষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সব মিলিয়ে নগরজীবনে চাপ বেড়েছে বলে জানান, সামাজিক সংগঠন স্বপ্নের সিঁড়ির সাধারণ সম্পাদক রাজীব দাশ।
তিনি জানান, একই সময়ে হোটেল ও স্থাপনা নির্মাণের সঙ্গে পানি, পয়নিষ্কাশন, বিদ্যুৎ ও সড়ক ব্যবস্থার ওপরও বাড়ে চাপ। পর্যটন শহরের পরিকল্পনা তাই শুধু নতুন হোটেল নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। শহরের বহনক্ষমতা নির্ধারণ করে সেই অনুযায়ী স্থাপনা, সড়ক, পার্কিং, গণপরিবহন, ড্রেনেজ, বর্জ্য ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার পরিকল্পনা করতে হবে।
তিনি বলেন, কক্সবাজারের পর্যটন ব্যবস্থাপনায় বহু সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যুক্ত। জেলা প্রশাসন, পর্যটন করপোরেশন, পরিবেশ অধিদপ্তর, বন বিভাগ, পৌরসভা, পুলিশ, ট্যুরিস্ট পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, সিভিল সার্জন কার্যালয়, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সংস্থা তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে কাজ করে।
আর এর মধ্যে কক্সবাজারকে সার্বিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক মানের করার কথা বলেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল।
তিনি বলেন, কক্সবাজারকে সাজানোর জন্য সরকার নানা প্রক্রিয়া নিচ্ছে। এর মধ্যে বর্জ্য ও পয়নিষ্কাশন ব্যবস্থা, সড়ক তৈরি, সৈকতে নিরাপত্তা সবই আলোচনা হচ্ছে। ইতিমধ্যে সাবরাং বিশেষ ট্যুরিজম পার্ক নির্মাণ প্রকল্প এগিয়ে নেয়া, বিমানবন্দরের আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু করার উদ্যোগও নিয়েছে। সবাইকে সাথে নিয়ে পর্যটন শিল্পের বিকাশে করণীয় সকল কিছু করা হবে।
শনিবার কক্সবাজার সফরে আসা স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমও বলেছেন, কক্সবাজার ঐতিহ্যগত ও পরিচয় দেওয়ার মতো ঠিকানা। কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিকমানের পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তরের জন্য কক্সবাজার পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করার প্রক্রিয়া চলছে। একই সঙ্গে আরও অনেক প্রকল্প হাত নেয়া হয়েছে।