জাপানে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এশিয়ান গেমসের সার্ফিং ইভেন্টে প্রথমবারের মতো লড়াই করবে বাংলাদেশি সার্ফাররা। কক্সবাজারের উত্তাল ঢেউয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছেন দুই সার্ফার মোহাম্মদ মান্নান ও ফাতিমা আক্তার। তবে, পদক জিততে আরো বেশি প্রস্তুতি প্রয়োজন বলে মনে করেন তাদের কোচ। জাপানের ঢেউয়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে প্রশিক্ষণের জন্য সার্ফারদের শ্রীলঙ্কা অথবা ইন্দোনেশিয়ায় পাঠাতে চায় বাংলাদেশ সার্ফিং অ্যাসোসিয়েশন। তবে প্রস্তুতির জন্য শ্রীলঙ্কা না ইন্দোনেশিয়া যাচ্ছে সার্ফার ‘মান্নান-ফাতেমা’ তা এখনো নির্ধারণ হয়নি।
দেশের বুকে জন্ম নিচ্ছে এক নতুন স্বপ্ন, যে স্বপ্ন সমুদ্রের ঢেউ পেরিয়ে পৌঁছে যেতে চায় বিশ্বমঞ্চে। কক্সবাজারের সৈকতে প্রতিদিন সূর্য ওঠার আগেই শুরু হয় লড়াই, ঘামের সঙ্গে মিশে যায় লবণাক্ত পানি, আর সেই লড়াইয়ের নাম সার্ফিং। এই লড়াইয়ের এক সাহসী যোদ্ধা-মান্নান। আজ জাতীয় পর্যায়ের চ্যাম্পিয়নদের একজন। কিন্তু তার গল্পের শুরুটা ছিল খুব সাধারণ।
শুরুটা ছিল কৌতূহল থেকে, তারপর সেই কৌতূহলই হয়ে ওঠে নেশা। কিন্তু স্বপ্নের পথে ছিল না কোনো বড় পৃষ্ঠপোষকতা। আজ সেই মান্নানের চোখে নতুন স্বপ্ন, এশিয়ান গেমস; আর তারও ওপারে-বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজের পতাকা।
সার্ফার মো. মান্নান বলেন, ছোটবেলা থেকেই ভিন্নধর্মী কিছু করার আগ্রহ ছিল তার। স্কুলে যাওয়ার সময় তার বন্ধু মুরাদকে স্কেটবোর্ড চালাতে দেখে বিষয়টি খুবই ইউনিক লাগে। এরপর মুরাদের কাছেই স্কেটবোর্ড চালানোর হাতেখড়ি। একদিন মুরাদ তাকে বলে, “এটা কিছুই না, পানিতে আরও মজার একটা খেলা আছে-তুই চাইলে আমার সাথে যেতে পারিস।” সেই সূত্র ধরেই তিনি বাহারছড়ায় যান এবং প্রথমবারের মতো সার্ফিং বোর্ড দেখেন। সেখান থেকেই শুরু হয় তার সার্ফিং শেখার যাত্রা।
মান্নান বলেন, সার্ফিংয়ে ভালো করার পথে সবচেয়ে বড় সমর্থন পেয়েছেন কোচ রাশেদ আলমের কাছ থেকে। তিনি শুধু প্রশিক্ষণই দেননি, নিজের ব্যক্তিগত সার্ফিং বোর্ডও ব্যবহার করতে দিয়েছেন। মান্নানের ভাষায়, “রাশেদ ভাই না থাকলে হয়তো এতদূর আসতে পারতাম না। তার অনেক অবদান আছে আমার এই পথচলায়।”
তিনি জানান, এই জার্নি মোটেও সহজ ছিল না। সার্ফিংয়ের পেছনে তেমন কোনো আর্থিক বা প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা নেই। নিজেদের আয় করে সেই অর্থ দিয়েই অনুশীলন চালিয়ে যেতে হয়। তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যেও নিয়মিত অনুশীলন আর কঠোর পরিশ্রমের কারণেই এগিয়ে যেতে পেরেছেন বলে বিশ্বাস করেন তিনি।
মান্নান বলেন, “আমার অনেক প্রতিদ্বন্দ্বী আছে-ইউনুস, সাগর, জাহিদ, জিয়া। তাদের পেছনে ফেলে সামনে আসা সহজ ছিল না। কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ, কঠোর পরিশ্রমের কারণেই সেটা সম্ভব হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, কঠোর পরিশ্রম করলে সবকিছুই সম্ভব।”
জাপানে অনুষ্ঠিতব্য এশিয়ান গেমস নিয়ে মান্নান বলেন, এটি তার জন্য স্বপ্নের মতো। কারণ, এশিয়ান গেমসের মতো বড় আসরে সবাই সুযোগ পায় না। বাংলাদেশের হয়ে নির্বাচিত হওয়াটাই অনেক বড় অর্জন। এই স্বপ্ন পূরণে প্রতিদিন ভোর ৬টায় ঘুম থেকে উঠে দৌড়, ফিটনেস ট্রেনিং ও সমুদ্রে অনুশীলন চালিয়ে যাচ্ছেন।
তার দৃঢ় প্রত্যয়, “ইনশাআল্লাহ, আমরা যদি জাপানে যেতে পারি, তাহলে লাল-সবুজের পতাকা শুধু এশিয়াতেই নয়, পুরো বিশ্বের সামনে উঁচু করে ধরার চেষ্টা করবো।”
এই ঢেউয়ের গল্পে আছে আরেকটি অনুপ্রেরণার নাম- ফাতেমা আক্তার। যে মেয়েটি একসময় সার্ফিং কী-সেটাই জানতো না। আজ সে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন। সেই প্রথম দাঁড়ানো, আজ তাকে দাঁড় করিয়েছে জাতীয় চ্যাম্পিয়নের মঞ্চে। কিন্তু তার আশা- ফুটবল কিংবা ক্রিকেটের মতো জনপ্রিয় হোক সার্ফিংও।
সার্ফার ফাতেমা আক্তার বলেন, শুরুতে তিনি সার্ফিং কী-সেটাই জানতেন না। একদিন বাসার পাশের কয়েকজন মেয়েকে প্রতিদিন কোথাও যেতে দেখে কৌতূহল হয়। তাদের জিজ্ঞেস করলে তারা জানায়, তারা সার্ফিং করতে যায়। পরে তাদের সঙ্গেই প্রথমবার সৈকতে আসেন ফাতেমা।
তিনি বলেন, প্রথম দিন খুব ভয় লাগছিল। কারণ তখনও তিনি জানতেন না সার্ফিং কী, এমনকি সার্ফিং বোর্ড সম্পর্কেও কোনো ধারণা ছিল না। ক্লাবের এক ট্রেইনার তাকে প্রথম পানিতে নামান। আর যখন প্রথম ঢেউয়ের ওপর বোর্ডে দাঁড়াতে সক্ষম হন, তখন সেই অনুভূতি তাকে ভীষণ আনন্দ দেয়। এরপর থেকেই প্রতিদিন সৈকতে ছুটে আসেন অনুশীলনের জন্য।
ফাতেমার ভাষায়, “সার্ফিংটা আমার রক্তের সঙ্গে মিশে গেছে। অন্য যেকোনো খেলার চেয়ে সার্ফিং আমার বেশি ভালো লাগে। আমি অনেক স্বপ্ন দেখি সার্ফিং নিয়ে। কেউ আসুক বা না আসুক, আমি প্রতিদিনই অনুশীলন করি। স্কুল ছুটির পর সরাসরি সৈকতে চলে আসি।”
তিনি চান, বাংলাদেশের অন্য জনপ্রিয় খেলা যেমন ফুটবল ও ক্রিকেটের মতো সার্ফিংও জনপ্রিয় হয়ে উঠুক। তিনি মনে করেন, সার্ফিংয়ে ভালো করতে পারলে দেশের জন্যও বড় অর্জন সম্ভব।
ফাতেমা জানান, আগের প্রতিযোগিতাগুলোর তুলনায় এবারের প্রতিযোগিতায় ঢেউ ভালো ছিল এবং তিনি নিজের সেরাটা দিতে পেরেছেন। কঠোর অনুশীলনের ফলেই চ্যাম্পিয়ন হতে পেরে তিনি ভীষণ খুশি। তিনি বলেন, “আমি অনেক পরিশ্রম করেছি, অনেক প্র্যাকটিস করেছি-চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে। আলহামদুলিল্লাহ, আমি প্রথম হয়েছি। এতে আমার আম্মু ও পরিবারও অনেক খুশি।”
এদিকে, এই স্বপ্নযাত্রার পেছনে আছেন এক কারিগর, বাংলাদেশ বয়েজ অ্যান্ড গার্লস সার্ফিং ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ও কোচ রাশেদ আলম। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সার্ফিংয়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি এখন গড়ে তুলছেন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।
বাংলাদেশ বয়েজ অ্যান্ড গার্লস সার্ফিং ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ও কোচ রাশেদ আলম বলেন, তার মূল লক্ষ্য আন্তর্জাতিক মানের সার্ফার তৈরি করা এবং একদিন বাংলাদেশকে অলিম্পিকের মঞ্চে তুলে ধরা।
তিনি জানান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সার্ফিং করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। আমেরিকার হাওয়াই এবং ক্যালিফোর্নিয়াতে দীর্ঘ সময় ছিলেন এবং সার্ফিং করেছেন। এছাড়া মালদ্বীপে এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিয়েছেন। বর্তমানে ভারতের চেন্নাইতে জাতীয় দলের কোচ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
রাশেদ আলম বলেন, বাংলাদেশ সার্ফিং অ্যাসোসিয়েশনের অষ্টম জাতীয় সার্ফিং প্রতিযোগিতায় তার ক্লাবের ফাতেমা আক্তার নারী বিভাগে এবং মো. মান্নান ওপেন বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। তাদের পাশাপাশি আরও অনেক প্রতিভাবান সার্ফার রয়েছে, যাদের সঠিক প্রশিক্ষণ ও সুযোগ দিলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভালো করা সম্ভব।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে সারা বছর মানসম্মত ঢেউ না থাকায় সার্ফারদের দক্ষতা আরও বাড়াতে বিদেশে প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। বিশেষ করে শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশে বিশ্বমানের ঢেউ থাকে, যেখানে প্রশিক্ষণ নিলে সার্ফাররা আরও মানসিক ও শারীরিকভাবে প্রস্তুত হতে পারবে।
সামনে এশিয়ান গেমস থাকায়, তিনি চান প্রতিযোগিতার আগে অন্তত ১০ দিন থেকে দুই সপ্তাহের একটি বিদেশি প্রশিক্ষণ ক্যাম্প আয়োজন করতে। তার বিশ্বাস, সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে এই সার্ফাররাই একদিন এশিয়ান গেমস থেকে অলিম্পিক পর্যন্ত বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা উড়াবে।
আর সার্ফারদের স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে কাজ করছে বাংলাদেশ সার্ফিং অ্যাসোসিয়েশন।
বাংলাদেশ সার্ফিং অ্যাসোসিয়েশনের মুখপাত্র সাইফুল্লাহ সিফাত বলেন, দেশের সার্ফিং এখন উন্নয়নের ধারায় রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ঘরোয়া প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ও বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে সার্ফারদের তৈরি করা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় ৮টি জাতীয় সার্ফিং প্রতিযোগিতা আয়োজনের মাধ্যমে অনেক প্রতিভাবান সার্ফার উঠে এসেছে।
তিনি জানান, সর্বশেষ জাতীয় প্রতিযোগিতার পুরুষ ও নারী বিভাগের চ্যাম্পিয়নদের মধ্য থেকে এশিয়ান গেমসের জন্য খেলোয়াড় বাছাইয়ের প্রক্রিয়া চলছে। বর্তমানে মান্নান আর ফাতেমা বাংলাদেশের সেরা সার্ফারদের মধ্যে অন্যতম।
সিফাত বলেন, এশিয়ান গেমসের আগে সার্ফারদের দক্ষতা আরও বাড়াতে আন্তর্জাতিক মানের ঢেউয়ে অনুশীলনের পরিকল্পনা রয়েছে। কারণ জাপানের প্রতিযোগিতার পরিবেশ ও ঢেউ বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। এজন্য শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশে প্রশিক্ষণ ক্যাম্প আয়োজনের চিন্তা করছে অ্যাসোসিয়েশন।
তার বিশ্বাস, বাংলাদেশের সার্ফারদের প্রতিভা ও সক্ষমতা রয়েছে বিশ্বের সেরা সার্ফারদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার। শুধু আন্তর্জাতিক মানের অনুশীলনের কিছু ঘাটতি রয়েছে, যা পূরণ করতে অ্যাসোসিয়েশন কাজ করছে।
ঢেউ কখনো শান্ত, কখনো উত্তাল-কিন্তু যে স্বপ্ন দেখে, তাকে থামানো যায় না। কক্সবাজারের এই সৈকত থেকেই একদিন বিশ্ব দেখবে-বাংলাদেশও পারে, বাংলাদেশও জেতে!