কৃষি নির্ভর অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকার অন্যতম প্রাণ প্রবাহ মাতামুহুরী নদী এখন চরম অস্তিত্ব সংকটে। এক সময়ের পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোত, গভীর জলধারা, নৌ-চলাচল, সেচনির্ভর কৃষি এবং দেশীয় মাছের প্রাচুর্যে সমৃদ্ধ এই নদী এখন ধীরে ধীরে হারাচ্ছে তার স্বাভাবিক প্রবাহ, প্রাণ বৈচিত্র্য ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব।
দুই যুগের বেশি সময় ধরে প্রতিবছর বর্ষাকালে ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে নেমে আসা পলি মাটি জমে, অবৈধ দখল, মাছ চাষের জন্য অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ এবং নদী শাসন সংরক্ষণে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার বিস্তর ঘাটতি মিলিয়ে মাতামুহুরী নদী এখন কার্যত অস্তিত্ব সংকটে।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের বিশ্লেষণ মতে, বর্ষা মৌসুম ছাড়া বছরের অধিকাংশ সময় নদীর অনেক অংশে পানির প্রবাহ অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়। যেখানে একসময় নৌকা, সাম্পান চলাচল ছিল নিয়মিত, যাত্রী সাধারণ এবং পন্য সামগ্রি পরিবহন করা হতো এই নৌ-পথে। সেখানে এখন বিস্তীর্ণ নদীর বুকে জেগে উঠেছে অসংখ্য বালুচর, সংকোচিত হয়ে পড়েছে নদীর গতিপথ। পাশাপাশি নদীর তীরে বেড়েছে ভাঙ্গনের হোলিখেলা।
পরিবেশকর্মীরা জানান, মাতামুহুরী নদী এখন আর তার চিরচেনা রূপে নেই। নদীর বুকে পলি জমে জেগেছে অসংখ্য ভরাট চর। আলীকদম থেকে চকরিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলের বদরখালীস্থ শেষ মোহনা পর্যন্ত একাধিক স্থানে নদীর আয়তন এখন খালের মতো সরু হয়ে পড়েছে।
বর্ষার পরেই শুরু হয় ভাঙন : পাহাড়ি ঢলের বন্যা নেমে যাওয়ার পরপরই নদীর দুই তীর জুড়ে শুরু হয় ভয়াবহ ভাঙন। এতে বসতভিটা, ফসলি জমি, বেড়িবাঁধসহ বিভিন্ন স্থাপনা নদীতে বিলীন হচ্ছে। স্থানীয়রা বলছেন, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে মাতামুহুরী নদী তীরবর্তী জনপদের মানুষের জন্য অভিশাপে পরিণত হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে পরিবেশবিদ ও স্থানীয় সচেতন মহল মাতামুহুরী নদীর টেকসই শাসন ও সংরক্ষণে জরুরি ভিত্তিতে পরিকল্পিত প্রকল্প গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
নদীর ঐতিহ্য হারাচ্ছে : চকরিয়া উপজেলা পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মাহমুদ বলেন, একসময় মাতামুহুরী নদী ছিল কৃষি সেচ, মিঠাপানির মাছ ও নৌপরিবহনের প্রাণকেন্দ্র। বছরজুড়ে সেচ সুবিধা নিয়ে কৃষকরা অধিক ফসল উৎপাদন করতেন, নদীতে ছিল দেশীয় মাছের অভয়াশ্রম। তিনি আরও বলেন, কিন্তু গত এক দশকে নির্বিচারে পাহাড় কাটাসহ বিভিন্ন কারণে নদীটি কার্যত মৃত্যুপথযাত্রী। নদীর বুকে ডুবোচর জেগে ওঠায় ভয়াবহ নাব্যতা সংকট তৈরি হয়েছে। তিনি নদী পুনরুজ্জীবনে ড্রেজিংসহ দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই প্রকল্প গ্রহণের আহ্বান জানান।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে : পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বান্দরবানের লামা উপজেলার মাইভার পর্বত থেকে উৎপত্তি হওয়া প্রায় ১৪৬ কিলোমিটার দীর্ঘ মাতামুহুরী নদী বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, দুই দশক আগেও নদীর গভীরতা ছিল ৩০ থেকে ৪০ ফুট এবং প্রস্থ ছিল প্রায় ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ ফুট। বর্তমানে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় মাছের প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস হচ্ছে এবং দেশীয় মাছের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, উজানে পার্বত্য বান্দরবানের লামা ও আলীকদম উপজেলার পাহাড়ে ব্যাপক বৃক্ষনিধন, জুমচাষ, পাহাড় কাটা এবং ঝিরি খুঁড়ে অবাধ পাথর উত্তোলনের ফলে পাহাড়ি মাটি বর্ষাকালে অতিবৃষ্টির পানির সঙ্গে নদীতে এসে জমছে। এতে নদীর তলদেশ দ্রুত ভরাট হয়ে পড়ছে এবং সামান্য বৃষ্টিতে নদীভাঙ্গন তীব্র হচ্ছে।
বিশেষ করে পলি নদীর তলদেশে জমে তৈরি করছে চর, যা ধীরে ধীরে নদীর গভীরতা ও প্রস্থ কমিয়ে দিচ্ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নদীর অভ্যন্তরে শুষ্ক মৌসুমে গড়ে ওঠা অসংখ্য কৃত্রিম বাঁধ ও মৎস্যঘের। এসব বাঁধ নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ আটকে যাচ্ছে, ফলে নদীর স্বাভাবিক স্ব-পরিশোধন প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে।
২০১৫ সালে বন্যা পরবর্তী সময়ে তৎকালীন পানি সম্পদমন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ মাতামুহুরী নদী পরিদর্শন করে ড্রেজিংয়ের নির্দেশ দেন। পরে ২০১৮ সালে ৬ কোটি টাকা বরাদ্দে পাইলট প্রকল্প হিসেবে চকরিয়া উপজেলার বেতুয়াবাজার এলাকায় তিন কিলোমিটার অংশে ড্রেজিংকাজ শুরু হলেও এক বছরের মাথায় তা বন্ধ হয়ে যায়। গত ৮ বছর ধরে প্রকল্পটি কার্যত অচল রয়েছে।
জানা গেছে, শুষ্ক মৌসুমে মাতামুহুরী নদীর পানি ব্যবহার করে চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলার প্রায় ৬০ হাজার কৃষক ইরি, বোরো ও রবি শস্যের চাষ করে আসছেন। নদীর নাব্যতা সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে এই কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্তমানে একযুগের বেশি সময় ধরে চকরিয়া অংশে প্রবাহিত মাতামুহুরি নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চলছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, উপজেলার অন্তত ২০টির বেশি নির্দিষ্ট স্থানে নিয়মিতভাবে ড্রেজার বসিয়ে নদীর তলদেশ থেকে বালু তোলা হচ্ছে।
বালু উত্তোলনের কারবার মূলতঃ উপজেলার ফাঁসিয়াখালী, কাকারা, বরইতলী, কোনাখালী, বদরখালী, কৈয়ারবিল, লক্ষ্যারচর ও চিরিঙ্গা ইউনিয়নে মাতামুহুরী নদীর বিভিন্ন অংশে বেশি দৃশ্যমান।
শুষ্ক মৌসুমে নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন আরও বেপরোয়া আকার ধারণ করে। নদীর মাঝখান ও তীরঘেঁষা এলাকায় ড্রেজার বসিয়ে গভীর গর্ত তৈরি করা হচ্ছে, যা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে ব্যাহত করছে এবং তলদেশে অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে রাতের আঁধারে বালু উত্তোলন করা হলেও দিনের বেলাতেও প্রকাশ্যে এ কার্যক্রম চলতে দেখা যায়।
অভিযোগ রয়েছে, একটি সংঘবদ্ধ প্রভাবশালী চক্র প্রশাসনিক নজরদারির সীমাবদ্ধতাকে কাজে লাগিয়ে এই অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হলেও তা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হচ্ছে না, ফলে কিছুদিন বন্ধ থাকার পর আবারও একই স্থানে বালু উত্তোলন শুরু হয়।
স্থানীয় পরিবেশ সচেতন মহলের মতে, অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তলদেশে গভীর খাদ সৃষ্টি হচ্ছে, যা পানিপ্রবাহের স্বাভাবিক গতিপথকে পরিবর্তন করছে এবং তীরভাঙনের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
নদীর নাব্যতা হ্রাসের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে মৎস্য সম্পদে। একসময় নদীর গভীর ‘কুম’ বা জলাশয়গুলো ছিল দেশীয় মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র। বর্তমানে অধিকাংশ কুম পলিতে ভরাট হয়ে যাওয়ায় প্রজননের উপযোগী পরিবেশ ধ্বংস হয়েছে। পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়ায় মাছের বংশবিস্তার মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
চকরিয়া জেলে সমিতির সভাপতি আশরাফ আলীর মতে, গত ১৫ থেকে ২০ বছরে নদীতে দেশীয় মাছের উৎপাদন ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। মৎস্য উৎপাদন হ্রাস পাওয়ায় নদীনির্ভর হাজারো জেলে পরিবার এখন চরম আর্থিক সংকটে। অনেকে পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হচ্ছেন, কেউ কেউ দিনমজুরি বা ক্ষুদ্র ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছেন। ঋণের চাপ ও অনিশ্চয়তা তাদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে।
নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় সেচ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হচ্ছে, ফলে ফসল উৎপাদনে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। পরিবেশবিদদের মতে, নদীর জীববৈচিত্র্যও মারাত্মক হুমকির মুখে জলজ উদ্ভিদ, দেশীয় মাছ, পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর জীবনচক্র ভেঙে পড়ছে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য পরিকল্পিত ও বৈজ্ঞানিক ড্রেজিং অপরিহার্য। তবে শুধুমাত্র ড্রেজিং যথেষ্ট নয়; একইসঙ্গে অবৈধ বাঁধ অপসারণ, নদী দখলমুক্ত করা, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা, উজানের পরিবেশ সংরক্ষণ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে।
মাতামুহুরি নদী শুধু একটি জলধারা নয়, এটি একটি জীবনব্যবস্থা। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনায় নদীটি ধ্বংসের পথে। এখনই সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে এই নদীকে পুনরুদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়বে। তিনি একইসঙ্গে ঢেমুশিয়া জলমহালের স্লুইস গেইট অপসারণসহ উজানের পরিবেশ রক্ষায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কক্সবাজার কার্যালয়ের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (চকরিয়া উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, উজান থেকে নেমে আসা পলি ও কৃত্রিম বাঁধের কারণে মাতামুহুরী নদীতে নাব্যতা সংকট তীব্র হয়েছে। ২০১৮ সালে কক্সবাজার পাউবো থেকে মাতামুহুরী নদী ড্রেজিং করতে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। ড্রেজিং করে দেখা গেছে, পরের বছর বর্ষাকালে উজান থেকে নেমে আসা পলিমাটি জমে সেগুলো ভরাট হয়ে গেছে। সেজন্য পাউবো প্রকল্পটি বাতিল করে।
তিনি বলেন, দুইবছর আগে থেকে জাপানের দাতা সংস্থা জাইকার অর্থায়নে মাতামুহুরী নদীর শাসন সংরক্ষণে নদীটির ওপর একটি গবেষণা চলছে, যা আগামী ছয় মাসের মধ্যে সম্পন্ন হবে। এরপর ড্রেজিংসহ নদী শাসন সংরক্ষণে করনীয় নির্ধারনে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা পাঠানো হবে। আমরা আশাবাদী জাইকার সুপারিশ অনুযায়ী পরিকল্পিত ও টেকসই উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন হলে নাব্য সংকট ও ভাঙন সমস্যা অনেকটাই কমে আসবে।
চকরিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভুমি) রুপায়ন দেব বলেন, মাতামুহুরী নদীতে অবৈধ দখলকাণ্ড, বাঁধ ও ঘের তৈরির বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। মাতামুহুরি নদীর সংকট এখন শুধু একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি পুরো অঞ্চলের জীবন-জীবিকার প্রশ্ন।
তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ারের সঙ্গে আলোচনা করে মাতামুহুরী নদী শাসন সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাবনা পাঠানো হবে। তিনি মনে করেন, দ্রুত ড্রেজিং কার্যক্রম শুরু করা গেলে নদী তার নাব্যতা ফিরে পাবে এবং বন্ধ হবে যত্রতত্র বালু উত্তোলন।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পরিবেশবিদদের মতে, মাতামুহুরী নদীকে বাঁচাতে হলে খণ্ডিত উদ্যোগ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত ও টেকসই নদীশাসন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। তা না হলে সামনে বর্ষা মৌসুমে আবারও চরম দুর্ভোগে পড়বে তীরবর্তী লাখো মানুষ।