কক্সবাজারে গত এক সপ্তাহ থেকে চৈত্র-বৈশাখের দাবদাহে জনজীবন যেন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। বৃষ্টির আশংকায় গত শনিবার থেকে জেলার চার উপজেলায় আগাম ধান কর্তন শুরু হয়েছে। চকরিয়া, রামু, উখিয়া ও টেকনাফে ২০ শতাংশ ধান ঘরে তুলেছেন কৃষকেরা। আরও ৮০ শতাংশ পাকা ধান ক্ষেতেই রয়ে গেছে।। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে শুরু হওয়া বৃষ্টি চলে রাতভর।
কৃষকেরা জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ'র অভাবে ঠিকমত জমিতে পানি দেওয়া হয়নি। সেচ মেশিনও বন্ধ ছিল। অতিরিক্ত টাকা খরচ করে লম্বা বাঁধ দিয়ে আইল কেটে পানি সংগ্রহ করা হয়। কোনরকম ধানের থোর এসেছে। কোন কোন এলাকায় ৭০ শতাংশ ধান পেকেছে এবং ধান কাটা শুরু করেছে।
পিএমখালি ইউনিয়নের কৃষক, জয়নাল, আবদুর রহিম, নবাব আলীসহ আরও কয়েকজনের সাথে কথা হয় প্রতিবেদনকের। তারা জানিয়েছেন, ধান ঘরে তুলতে আর মাত্র কয়েকটা দিন বাকি। আসমানও মেঘ দেখলেই যেন বুক কেঁপে উঠে। বৃষ্টি হলে যদি পাহাড়ি ঢল নেমে আসে তাহলে জমিতে থেকে যাবে সোনালী স্বপ্ন। জমিতে এখনো এক তৃতীয়াংশ ধান রয়ে গেছে। আর কয়েকটা দিন পেলে হয়ে যেতো। মঙ্গলবার যে বৃষ্টি হয়েছে, এতে কোন সমস্যা হবেনা; বেশি বৃষ্টি হলে সব শেষ হয়ে যাবে। এভাবেই
পরিস্থিতি বর্ণনা করছিলেন কৃষকরা।
চাকমারকুল ৯ নং ওয়ার্ডের মাদ্রাসা গেইট এলাকার স্থানীয় কৃষক ছাবের আহমেদ দৈনিক কক্সবাজারকে বলেন, '৯ কানি (৩৬০ শতক) জমিতে বোরোধানের আবাদ করেছি। ১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আজ আজ দুপুর ২ টায় ধান কাটা শুরু করবো। শ্রমিকও ঠিক করেছি। এ অবস্থায় বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ভয় কাজ করছে; যদি রাতেও ঝড়ের সাথে বাতাস হয়, তাহলে ধান লুটিয়ে পড়ার সম্ভবনা আছে।'
তিনি বলেন, 'চাকমারকুল স্কুলের পেছনে ৫ কানি ( ২০০ শতক) এবং মাদ্রাসা গেইটের দক্ষিণে ৩ কানি ( ১২০ শতক) জমিতে আবাদ করেছি। এক সপ্তাহ সময় পেলে ৮০ শতাংশ ধান কাটতে পারবো। আল্লাহ ভরসা, দেখা যাক।
খরুলিয়া ৭ নং ওয়ার্ডের মকবুল সওদাগর বাড়ির স্থানীয় কৃষক ছুরুত আলম ১৫ কানি জমিতে এবারও বোরোর আবাদ করেছেন। সরকারের দেওয়া ইরি ১০২ জাতের ধান ও স্থানীয় জাতের ধান তিনি লাগিয়েছেন। ইতিমধ্যে ২৪০ শতক জমির ধান কেটেছেন এবং মাড়াই করে ঘরে তুলেছেন। কিন্তু, এখনো ৫০ শতাংশ ধান জমিতে রয়ে গেলেন। অনেকটা নরম সুর ও ভয় আতংক কাপা কন্ঠে তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, 'বৃষ্টি শুরু হয়েছে, আল্লাহ জানে কপালে কি আছে? যদি এক সপ্তাহ সময় পেতাম তাহলে সব ধান কাটতে পারতাম।'
তিনি বলেন, 'গত দুই মাসে তার এই সোনালী আয়োজনে প্রায় ৩ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে। এত টাকা খরচ করেও তিনি লাভের মুখ দেখছে না। মজুরি খরচ, সেচ খরচ, সারের মূল্য বৃদ্ধি ও জ্বালানি সংকটে লাভের চেয়ে লোকসান বেশি হবে বলে তিনি ধারণা করছেন। এরপরেও যদি বৃষ্টির আগে সব ধান ঘরে তুলতে পারে, তাহলে কোনরকম জীব বাঁচবে।'
চাকমার কুল ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ডের দক্ষিণ সমাদর পাড়া এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা হাফেজ আহমেদ। প্রতি বছরের ন্যায় এই বছরেও তিনি বোরোধানের আবাদ করেছেন। তিনি ১০০ শতক ( ২.৫ কানি) জমিতে আবাদ করেছেন। ধান পুরোপুরি পেকেছে। আগামী শুক্রবার ( ০১ মে ) ধান কাটার সকল প্রস্তুতি সেরে ফেলেছেন। এই মুহূর্তে গতকাল মঙ্গলবার বিকেল থেকে বৃষ্টি ও বাতাস শুরু হয়। সন্ধ্যা বেলায় ক্ষেতে গিয়ে দেখেন ২০ শতক মত জমির ধান হেলে পড়েছেন। আকাশটা যেন ভেঙ্গে পড়েছে। এরপরেও তিনি হতাশ হয়নি।'
হাফেজ আহমেদ জানান, 'অন্যজনের চেয়ে তার খরচ কিছুটা কম হয়েছে। তার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, 'শ্রমিকের সাথে তিনি নিজেও কৃষি কাজে সময় দিয়েছে। গত দুইমাসে তার ২৫ হাজার টাকার মত খরচ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে তিনি বেশ লাভবান হতেন। কিন্তু গতকাল মঙ্গলবার বৃষ্টি ও বাতাসে তার স্বপ্নের ফসলে আঘাত লেগেছে।
পেকুয়া, চকরিয়া, রামু, উখিয়া ও টেকনাফে এবারের বোরো আবাদের সাথে জড়িত প্রায় লক্ষাধিক কৃষক। বৈরী আবহাওয়া, আকস্মিক বন্যার শঙ্কাসহ নানা কারণে জেলার কৃষকেরা এখন চরম বিপাকে পড়েছেন। একদিকে বন্যার পূর্বাভাস, অন্যদিকে বৃষ্টির কারণে ধান কাটা ও মাড়াইয়ে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে তাঁদের। বন্যার ভয়, দুর্ভোগ নিয়েই কৃষকেরা ফসল তোলার প্রাণপণ চেষ্টায় আছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, জেলায় কৃষকের সংখ্যা ২ লক্ষ ৩৭ হাজার ৩১০ জন। তারমধ্যে বোরো আবাদের সাথে জড়িত প্রায় লক্ষাধিক কৃষক। চলতি বোরো মৌসুমে আবাদি জমির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৫ হাজার ৭০০ হেক্টর। গত বছর ছিল ৫৫ হাজার ৬৯০ হেক্টর। বোরো মৌসুমে হাইব্রিড, উফশী ও স্থানীয় তিন জাতের ফলনের আবাদ করেছেন কৃষকরা। ফলন আশা করা হচ্ছে, গড়ে ৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। যা গত বছর ছিল ৪ দশমিক ২২ শতাংশ। চাল উৎপাদনের লক্ষ্য মাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৩৫ হাজার ৭৫২ মেট্রিক টন। গত বছর ছিল ২ লাখ ৩৫ হাজার ২৬৫ মেট্রিক টন। আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় ও নিবিড় পরিচর্চায় এ বছর ধানের ফলন খুব ভালো হয়েছে। ফলে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে প্রত্যাশা করছে দপ্তরটি। কিন্তু ধান কাটার সময়ে বৃষ্টি ও বাতাসে লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে দেখা দিয়েছে ঘাটত। দপ্তরটি তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার ( ২৫ এপ্রিল ) থেকে জেলার কয়েকটি উপজেলায় আগাম ধান কাটা শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে ২০ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। বাকি ৮০ শতাংশ পাকা ধান ক্ষেতে রয়ে গেছে। এ অবস্থায় বৃষ্টি বাড়লে বন্যারও শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ফলে আতংকে দেখা দিয়েছেন ধান চাষীদের মঝে। শুধু ধান নয়, গীষ্ম-কালীন সবজির ক্ষেতের কৃষকরাও পড়তে পারেন মারাত্মক ক্ষতির মুখে।
খবর নিয়ে জানা যায়, চকিরায়া, পেকুয়া, রামু, ঈদগাঁও, উখিয়া ও টেকনাফের অধিকাংশ ফসলি জমির পাকা ধান জমিতে হেলে পড়েছে। কৃষকেরা ভয় উপেক্ষা করে ধান পাহারা দিচ্ছেন। কৃষকদের কথা বলে জানা যায়, প্রায় ২০ একর জমির ধান নষ্ট হয়েছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ আবুল হান্নান মঙ্গলবার রাত ৯টায় দৈনিক কক্সবাজারকে বলেন, মঙ্গলবার বিকেল ৩ টা পর্যন্ত ২ মিলিমিটার পর্যবেক্ষন নেয়া হয় টা ৪৫ মিনিটে। মূল বৃষ্টি হয়েছে তখন থেকেই। পরে সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত ২৪ ঘন্টায় কক্সবাজার অফিসে বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে ৩১ মিলিমিটার।
সংশ্লিষ্ট বলছেন, জমিতে থাকা ধানের মধ্যে অর্ধেক এখনো পাকেনি। এবার মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টি না হওয়ায় ধান পাকতে সময় নিচ্ছে বেশি। জেলায় ৫৯ টি কম্বাইন্ড হারভেস্টার আছে। সেগুলোর পাশাপাশ জেলার কৃষকেরা জমির পাকা ধান কেটে তোলার যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন। এছাড়া ধান কাটা শ্রমিকের সংকট থাকায় আরও বেশি বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিমল কুমার প্রামাণিক মঙ্গলবার রাত ৯ টায় দৈনিক কক্সবাজারকে জানান, 'যে বৃষ্টি হয়েছে ; এতে ধানের কোন ক্ষতি হওয়ার সম্ভবনা নেই। এই বৃষ্টি কৃষকের খরচ বাঁচিয়ে দিয়েছে। কারণ, গরমে মাটি পর্যন্ত ফেটে গিয়েছিল। এখন বৃষ্টি হওয়াতে মাটি সেই পানি চুষে নিয়েছে। এতে করে কৃষকেরা লাভবান হয়েছে।'
তিনি বলেন, 'লাগাতার বৃষ্টি থাকলে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হবে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে ধান কাটা, মাড়াই ও শুকাতে সমস্যা হবে। সঙ্গে বন্যার আশঙ্কা তো আছেই। আমরা কৃষকদের দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতার চেষ্টা করছি।’
তিনি আরও বলেন, গতকালের বৃষ্টি ও বাতাসে ১০ শতাংশ পাকা ধানে হেলে পড়েছে। বিশেষ করে পেকুয়া, চকরিয়া ও রামু উপজেলার কিছু এলাকার এ তথ্য পাওয়া গেছে।'