ঢাকা-কক্সবাজার রুটে অতিরিক্ত যাত্রীচাপ ও সীমিত ট্রেনের কারণে যাত্রী ভোগান্তি ছিল চরমে। এর পেছনে লোকোমোটিভ ও গ্যারেজ সংকটকে কারণ হিসেবে দেখছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। সব সংকটের অবসান ঘটিয়ে ঢাকা-কক্সবাজার রুটে যুক্ত হচ্ছে আরও একটি ট্রেন। মূলত ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চলাচলরত মহানগর এক্সপ্রেসকে পর্যটন শহর কক্সবাজার পর্যন্ত বর্ধিত করা হচ্ছে। আগামী অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ থেকে ট্রেনটি কক্সবাজার পর্যন্ত চলাচল শুরু করতে পারে বলে জানিয়েছেন, রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক সুজিত বিশ্বাস।
তিনি বলেছেন, 'শুরু থেকে ঢাকা- কক্সবাজার রুটে যাত্রীদের চাপ ছিল। চাহিদা অনুযায়ী ট্রেনের সংকট ছিল। সেই চাহিদা বিবেচনায় ঢাকা-চট্টগ্রাম চলাচলরত মহানগর এক্সপ্রেসকে কক্সবাজার পর্যন্ত বর্ধিত করা হচ্ছে। আগামী অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ থেকে ট্রেনটি চালুর সকল প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এতে করে যাত্রীরা যেমন স্বস্তিতে পর্যটন শহরে যাতায়াত করতে পারবেন তেমনি রেলওয়ের আয়ও বাড়বে।'
এদিকে গত ৯ সেপ্টেম্বর স্পিকার হাফিজ উদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংসদ অধিবেশনে কক্সবাজার -৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল রেলমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছিলেন, ঢাকা - কক্সবাজার রুটে যাত্রীদের চাহিদা বেশি, সেই তুলনায় ট্রেন সংকট রয়েছে। এই রুটে রেলের সংখ্যা বাড়ানোর ওপর জোর তাগিদ দেন এমপি কাজল। সেদিন তাঁর এই প্রশ্নের জবাব দিয়েছিলেন রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি বলেছিলেন, 'কক্সবাজার টু ঢাকা রেল লাইনে যাত্রীদের চাহিদা থাকলে-ও লোকোমোটিভ ও গ্যারেজের অভাবে ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। রেল পরিবহন ব্যবস্থায় এ দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইতিমধ্যেই দু'টি প্রকল্প হাতে নিয়েছি। শীঘ্রই এই সংকটের অবসান হবে।'
এরআগে গত ১ আগস্ট চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ পরিদর্শনে এসেছিলেন রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ। পরিদর্শনকালে তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের জানিয়েছিলেন, 'যাত্রী চাহিদা বিবেচনায় ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার রুটে ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে চার জোড়া ট্রেন কক্সবাজারে চলাচল করছে। যাত্রী চাহিদা বিবেচনায় এই সংখ্যা পাঁচ জোড়ায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।'
কক্সবাজার -৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল জানান, ট্রেন চলাচলের জন্য ঢাকা-কক্সবাজার রুট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই রুটে পর্যটকসহ স্থানীয়দের চাহিদা অনেক বেশি। সেই তুলনায় ট্রেনে সংকট রয়েছে। অফসিজনেও প্রচুর পর্যটক থাকে কক্সবাজারে। বিষয়টি নিয়ে রেল মন্ত্রণালয়ের সাথে বেশ কয়েকবার কথা বলেছি। সংসদেও ট্রেন বাড়ানোর বিষয়ে প্রস্তাবনা উত্থাপন করেছিলাম। মন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন শীঘ্রই ঢাকা-কক্সবাজার রুটে ট্রেন বাড়ানো হবে।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, 'বর্তমানে ঢাকা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত দুই জোড়া (চারটি) বিরতিহীন আন্তনগর এবং চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত দুই জোড়া (চারটি) আন্তনগর ট্রেন চলাচল করে। এই ট্রেন চলাচলে চট্টগ্রাম ছাড়া মাঝপথে আর কোথাও যাত্রাবিরতি দেয় না। একারনে স্থানীয়রা এই রুটের মধ্যবর্তী বিভিন্ন স্টেশনে যাত্রাবিরতি দেওয়ার জন্য দীর্ঘদিনের চাপ রয়েছে। মহানগর এক্সপ্রেসকে কক্সবাজার পর্যন্ত বর্ধিত করে ওই স্টেশনগুলোর যাত্রীদের কক্সবাজারে সরাসরি যাতায়াতের সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে রেলওয়ে।'
রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কক্সবাজার পর্যন্ত ট্রেন চলাচল শুরু হলে- মহানগর এক্সপ্রেসের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা হবে। তখন ঢাকার কমলাপুর থেকে রাত সাড়ে ৮ টায় ট্রেনটি ছাড়বে এবং কক্সবাজারে পৌঁছাবে সকাল ৬ টায়। কক্সবাজার থেকে ঢাকার উদ্দেশে ফিরতি ট্রেন ছাড়বে সকাল ৯টায়। একদিকে যাত্রায় সময় লাগবে প্রায় সাড়ে ৯ ঘণ্টা।
রেলওয়ের সময়সূচী অনুযায়ী, মহানগর এক্সপ্রেস বর্তমানে ঢাকার কমলাপুর স্টেশন থেকে রাত ৯টা ২০ মিনিটে চট্টগ্রামের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। চট্টগ্রামে পৌঁছায় দিবাগত রাত সাড়ে তিনটায়। কমলাপুর থেকে ছেড়ে আসার পর বিমানবন্দরসহ ১২টি স্টেশনে ট্রেনটির যাত্রাবিরতি রয়েছে। এসব স্টেশনে যাত্রী ওঠানামার সুযোগ রয়েছে।
বিমানবন্দর ছাড়া নরসিংদী জেলার নরসিংদী, কিশোরগঞ্জের ভৈরব বাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আখাউড়া ও কুমিল্লার কুমিল্লা, লাকসাম ও নাঙ্গলকোট, ফেনী এবং চট্টগ্রামের কুমিরা স্টেশনে মহানগর এক্সপ্রেস থামে।
এসব জেলা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন না থাকায় যাত্রীদের সড়কপথে আসতে হয়। মহানগর এক্সপ্রেস কক্সবাজার পর্যন্ত বর্ধিত হলে ওই এলাকার যাত্রীরা সরাসরি ট্রেনে কক্সবাজার যেতে পারবেন।
বর্তমানে ঢাকা-কক্সবাজার রুটে চলাচলরত কক্সবাজার এক্সপ্রেস ঢাকার কমলাপুর থেকে রাত ১১টায় ছেড়ে কক্সবাজারে পৌঁছায় সকাল ৭টা ২০ মিনিটে। আর পর্যটক এক্সপ্রেস ঢাকার কমলাপুর থেকে সকাল সোয়া ছয়টায় ছেড়ে কক্সবাজারে পৌঁছায় বেলা ২টা ৪০ মিনিটে।
রেলওয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ট্রেনটি কক্সবাজার পর্যন্ত বর্ধিত করা হলে, কোন প্রতিবন্ধকতা বা সমস্যা দেখা দেবে কি-না তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে এবং পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা কীভাবে করা হবে, সেটিও বিবেচনা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে চলাচলরত আন্তনগর ট্রেনে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত (এসি) বগি সংযোজনসহ উন্নত মানের কোচ যুক্ত করার প্রক্রিয়া থমকে আছে। এই রুটে একটি মাত্র রেক দিয়ে (ইঞ্জিন ও একাধিক কোচ মিলে একটি রেক) এই চারটি ট্রেন চালানো হয়। ফলে প্রায়ই সময়সূচি বিঘ্নিত হয়। ট্রেনের সময়সূচি ঠিক থাকলেও
দেরিতে ট্রেন ছাড়ায় যাত্রীদের পড়তে হয় চরম ভোগান্তিতে।
রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, 'বিদ্যমান ট্রেনের বগি পরিবর্তন করে এসি বগিসহ উন্নত মানের কোচ সংযোজনের আপাতত কোনো সম্ভাবনা নেই। নতুন কোচ আমদানি করা হলে তখন বগিগুলো পরিবর্তন করা হতে পারে।'
যাত্রীদের অভিযোগ, 'এই রুটে যাত্রী চাহিদা বাড়লেও ট্রেনগুলোর সব কটি বগিই পুরোনো ও মানসম্মত নয়। বিশেষ করে এসি বগি ও কেবিন সুবিধা না থাকায় অনেক যাত্রী এই রুটে ট্রেন ভ্রমণে আগ্রহ হারাচ্ছেন। পর্যটননির্ভর এই রুটে উন্নত মানের সেবা না থাকায় রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনাও পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।'
রেলওয়ের পরিবহন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১৬টি কোচ নিয়ে চলাচল করে সৈকত ও প্রবাল এক্সপ্রেস। পুরোনো বগিগুলো বাদ দিয়ে নতুন করে প্রতিটি ট্রেনে ১টি এসি কেবিন, ১টি নন-এসি কেবিন, ৩টি এসি চেয়ার (স্নিগ্ধা), ৮টি শোভন চেয়ার, ১টি পাওয়ার কার এবং ২টি গার্ড ব্রেক সংযোজনের পরিকল্পনা ছিল। প্রতিটি ট্রেনে প্রায় সাড়ে ৭০০ আসন রয়েছে।