মাহবুব রোকন, মাতারবাড়ি থেকে ফিরে
মহেশখালীর মাতাবাড়িতে সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত একগুচ্ছ মেগা উন্নয়ন প্রকল্প সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল রবিবার (৯ আগস্ট) সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে হেলিকপ্টারযোগে মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্রে এসে পৌঁছান তিনি। দায়িত্ব গ্রহণের পর কক্সবাজারের এই মেগা হাব পরিদর্শনে এসে অঞ্চলটিকে ঘিরে সমন্বিত অর্থনৈতিক অঞ্চল, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের কড়া দিকনির্দেশনা দেন সরকারপ্রধান।
মাতারবাড়ি পৌঁছানোর পর প্রধানমন্ত্রী আল্ট্রা-সুপারক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রশাসনিক ভবনে যান। সেখানে সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১২টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত প্রকল্পের সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে উচ্চপর্যায়ের একটি বিস্তারিত ব্রিফিং সভায় অংশ নেন।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাঁকে ১২শ’ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্তমান অবস্থা, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিচালন দক্ষতা, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তার সার্বিক চিত্র তুলে ধরেন। পাশাপাশি তুলে ধরা হয় অদূর ভবিষ্যতের পরিকল্পনাও।
ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রী জানতে পারেন, সম্পূর্ণ আল্ট্রা-সুপারক্রিটিক্যাল প্রযুক্তিতে গড়া এবং জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) অর্থায়নে নির্মিত এই মেগা প্রকল্পটি শতভাগ দেশীয় প্রকৌশলী ও জনবল দিয়ে সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এ বিষয়ে গভীর সন্তোষ প্রকাশ করে দেশীয় প্রকৌশলীদের দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাসের প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী।
ব্রিফিং শেষে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রশাসনিক ভবন এলাকায় একটি স্মারক নিম গাছের চারা রোপণ করেন তিনি।
দুপুর সাড়ে ১২টায় প্রধানমন্ত্রী প্রস্তাবিত ৭০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের স্থান পরিদর্শনের উদ্দেশে যাত্রা করেন এবং ১২টা ২৯ মিনিটে সেখানে পৌঁছান। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাঁর সামনে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাব্য উৎপাদন সক্ষমতা ও পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করেন। একই এলাকায় প্রধানমন্ত্রীকে প্রস্তাবিত এলএনজি-ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পেট্রোকেমিক্যাল প্রকল্প এবং নতুন আধুনিক রিফাইনারির জন্য নির্ধারিত জমি ঘুরে দেখানো হয়।
পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী এলপিজি, এলএনজি ও কয়লা টার্মিনাল-সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো এবং নতুন প্রকল্পের প্রস্তাবিত জমি সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি কয়লা জেটি পরিদর্শনের সময় সেখান থেকে সরাসরি মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর, এলএনজি টার্মিনাল এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিশাল অবকাঠামোগুলো প্রত্যক্ষ করেন। কয়লা পরিবহন ও খালাসের সঙ্গে সমন্বয় করে বন্দরের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কেও অবহিত করা হয় তাঁকে।
পরিদর্শনের শেষ পর্বে তিনি প্রস্তাবিত নতুন অস্থায়ী এলপিজি জেটি এবং ভবিষ্যতে নির্মিতব্য ৩ ও ৪ নম্বর কোল পাওয়ার প্ল্যান্টের জন্য নির্ধারিত এলাকা ঘুরে দেখেন।
প্রকল্পের বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ শেষে প্রধানমন্ত্রী দেশের দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিদ্যমান মেগা অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার তাগিদ দেন কর্মকর্তাদের। তিনি বলেন, প্রকল্প পরিচালনায় শতভাগ স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদার পাশাপাশি জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা এখন সময়ের দাবি। তবে যেকোনো বড় অবকাঠামো পরিচালনার ক্ষেত্রে দেশের অর্থ ও পরিবেশগত প্রভাবের পাশাপাশি জনগণের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে সবার ওপরে রাখতে হবে।
মাতারবাড়িকে কেবল একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র হিসেবে না দেখে- বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর এবং সংশ্লিষ্ট ভারী শিল্প খাতের এক অভূতপূর্ব সমন্বিত অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার রূপরেখা ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।
পরিদর্শনসূচি সমাপ্ত করে দুপুর ১টা ৫ মিনিটে হেলিকপ্টারযোগে পরবর্তী কর্মসূচি বাঁশখালীর উদ্দেশে মহেশখালী ত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রীর এই গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রজেক্ট পরিদর্শনের সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
এছাড়াও স্থানীয় সংসদ সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনের সংসদ সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ, কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল, কক্সবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী এবং সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য শামিম আরা স্বপ্না।
প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা দলভুক্ত হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামছুল ইসলাম, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, বিশেষ রাজনৈতিক সম্পাদক বেলায়েত হোসেন মৃধা, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারসহ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ।