কক্সবাজারের উপকূলীয় জনপদ মহেশখালী-কুতুবদিয়ার প্রান্তিক লবণচাষিদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত হাহাকার ও বঞ্চনার অবসান ঘটাতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কক্সবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদের ধারাবাহিক সংসদীয় দাবি, জোরালো বক্তব্য এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনার প্রেক্ষিতে লবণের ন্যায্যমূল্য ও চাষিদের জীবনমান উন্নয়ন ইস্যুটি এখন সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারে পরিণত হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল সোমবার (১১ মে) দুপুরে বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে লবণ খাতের সংকট নিরসনে এক উচ্চপর্যায়ের বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হওয়া সত্ত্বেও অবহেলিত থাকা লবণ শিল্পকে রক্ষা এবং প্রান্তিক চাষিদের অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এই বৈঠককে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও কক্সবাজারের কৃতিসন্তান সালাহউদ্দিন আহমদ, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, অর্থ সচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, শিল্প সচিব মো. ওবায়দুর রহমান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আব্দুর রহিম খান এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেন যে, লবণের প্রকৃত উৎপাদন ব্যয় নিরূপণ করে সেই ভিত্তিতে একটি টেকসই ও গ্রহণযোগ্য ‘ন্যূনতম ন্যায্যমূল্য’ নির্ধারণ করতে হবে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে কৃষি এবং শিল্প মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে কাজ করার নির্দেশনা প্রদানের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা সঠিকভাবে নিরূপণ করে অপ্রয়োজনীয় আমদানি স্থায়ীভাবে বন্ধের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে আলোচিত হয়।
বৈঠকের এই প্রেক্ষাপট মূলত তৈরি হয়েছে জাতীয় সংসদে এমপি আলমগীর ফরিদের বলিষ্ঠ ভূমিকার কারণে। সম্প্রতি সংসদ অধিবেশনে তিনি লবণচাষিদের করুণ বাস্তবতা তুলে ধরে বলেছিলেন যে, একদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে সিন্ডিকেট ও অসম আমদানির কারণে স্থানীয় লবণের বাজার ধসে পড়ছে। এর ফলে মহেশখালী-কুতুবদিয়াসহ উপকূলীয় হাজার হাজার লবণচাষি আজ দারিদ্র্য ও ঋণের আবর্তে দিশেহারা। সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি লবণের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ ও ‘হোয়াইট গোল্ড’ খ্যাত এই শিল্পকে রক্ষার জন্য যে আবেগময় বক্তব্যে তথ্যবহুল দাবি জানিয়েছিলেন, তার প্রেক্ষিতেই প্রধানমন্ত্রী এই জরুরি বৈঠকটি আহ্বান করেন।
বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের জানান, লবণচাষিদের রক্ষায় সরকার একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ গ্রহণ করছে। তিনি ইঙ্গিত দেন যে, লবণের স্টোরেজ ও মার্কেটিং অবকাঠামো উন্নয়ন, সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের পুনর্বাসনে বিশেষ তহবিল গঠনের বিষয়েও সরকার ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে।
নীতিনির্ধারক মহলের এই তৎপরতায় উপকূলীয় লবণচাষিদের মাঝে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। বৈঠকে বিসিক-নেতৃত্বাধীন আধুনিক রিফাইনিং প্রক্রিয়ায় স্থানীয় লবণকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং চোরাই পথে লবণ আমদানি রোধে সীমান্ত ও উপকূলীয় এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
সচেতনমহল মনে করছেন, সংসদ সদস্য আলমগীর ফরিদের সক্রিয় সংসদীয় ভূমিকা এবং প্রধানমন্ত্রীর দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপের ফলে লবণ শিল্প এখন একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পেতে যাচ্ছে। মহেশখালী ও কুতুবদিয়ার সাধারণ মানুষ এখন প্রত্যাশা করছেন, এই উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তের সুফল যেন দ্রুত মাঠ পর্যায়ে পৌঁছায় এবং যুগ যুগ ধরে চলে আসা সিন্ডিকেটের কারসাজি ভেঙে দিয়ে চাষিরা তাঁদের হকের ন্যায্যমূল্য ফিরে পান।